বাংলাদেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্ররা আন্দোলন শুরু করেছে। তারা চাচ্ছে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে পড়তে ভারত সরকার যেন তাদের অবাধে ভিসা দেয়। দেওবন্দে যে জিনিস পড়ানো হয় সেই জিনিস চীন সরকার কিছুদিন আগে জিনজিয়াং প্রদেশে নিষিদ্ধ করেছে। চাইনিজ ভাষায় কুরআন অনুবাদ করার কারণে অনুবাদককে আদালত জেল জরিমানা করেছে। কুরআন যাতে চীনের কোন ভাষাতেই অনুবাদ না বের হয় সেদিকে চীন নজর দিচ্ছে। চীন বুঝেছে চাইনিজ মুসলমানদের আমেরিকা এসে নষ্ট করেনি। যে জিনিস মুসলমানদের নিজ দেশ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি বিমুখ করে তোলে একমাত্র চীন সেটা বুঝতে পেরেছে। সুবিশাল চীনে মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ মুসলিম বসবাস করে। আশ্চর্য যে এরা চাইনিজ হবার পরও এদের লেখার হরফ হচ্ছে আরবী! বিগত কয়েক দশকে এই মুসলমানরা জিহাদের মাধ্যমে সরকার উৎখাতের আওয়াজ দেয়ার পর চীন সরকার ইউঘুর মুসলমানদের পয়জনটা চিহিৃত করে ফেলেছে। পশ্চিমের লিবারালরা যেটাকে ‘ইসলাম বিদ্বেষ’ এবং বামাতীরা ‘মুসলিম বিদ্বেষ’ বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে চীন সে জায়গাতেই হাত দিয়েছে। ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম কেমন করে উৎপন্ন হয় সেটা চীন ধরতে পেরেছে বলেই তারা গোফহীন দাড়ি রাখার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। আঠারো বছরের আগে লম্বা দাড়ি রাখা নিষেধ, নারীদের হিজাব পরিধানে নিষেধাজ্ঞা, সন্তানদের আরবী নাম রাখার উপর এসেছে বাধা। ইসলামী প্রকাশনাকে চীনের কোন ভাষাতেই অনুবাদ করা যাবে না। গোটা চীনে আরো বহু ধর্ম সম্প্রদায় থাকার পরও কেন শুধু সেখানকার মুসলমানদের মধ্যে জঙ্গিবাদ দেখা দিলো, কেন ইউঘুর মুসলমানরা চাইনিজ ভাষা পরিত্যাগ করে, ইউঘুর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ত্যাগ করে আলাদা এক জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করল যার উত্তরাধিকার তারা নয়- সে উত্তর তোলা রইল যারা জিহাদের জন্য আমেরিকাকে দায়ী করে। চীনের জিনজিয়াংয়েও কি সাম্রাজ্যবাদীদের হাত আছে? চাইনিজ সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণে জনগণের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আছে। কখনো কখনো সেটা বর্হিপ্রকাশ ঘটতে আমরা দেখি। এশিয়া-ইউরোপে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা চাইনিজদের কথাও জানি যারা বর্তমান শাসকদের কট্টর সমালোচক। কিন্তু ইউঘুর প্রদেশের এই মুসলমানদের সমস্যা তো আজকের নয়। যেদিন আরব থেকে এই পয়েজন চীনে প্রবেশ করেছিলো প্রথম হিযরী সন থেকে সেদিনই চাইনিজ ভাষা সংস্কৃতি বিরোধী এক চেতনার প্রবেশ ঘটেছিলো। চাইনিজ মুসলমানদের নাম আবু বরক, উসমান, আলী, ফাতেমা, জমিলা…। কেমন করে এরা চীনের মূল কন্ঠস্বর হবে বলুন?

 

চীন যেটা করেছে একই কাজ ভারত বা অন্য কোন দেশে করা হলে ঢাকার রাস্তার জলকামান নামত তৌহদী জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে। বামাতী শিবিরে কান্নার রোল পড়ে যেতো। সমস্যাটা এখানেই। ‘জিহাদ’ দমন করার বিষয়ে সবাই একমত। এই জঙ্গিবাদ আমেরিকার সৃষ্টি তাই আমেরিকাকে দমন করলে জঙ্গিবাদও দমন হয়ে যাবে- এই বামাতী তত্ত্ব দ্রুত পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে…। হাটহাজারী, দেওবন্দ এরকম দুটো প্রতিষ্ঠানে লক্ষ লক্ষ ছাত্র ইসলামী শরীয়া, মাসালা, ফতোয়া, ইসলামের রাজনৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করে বড় হয়। তারা সেক্যুলারিজম বিরোধী এবং কট্টর মুসলিম জাতীয়তাবাদী হিসেবে শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়। এরকম কোন প্রতিষ্ঠান চীনে থাকলে কামান দাগিয়ে সেটা এখনি নিশ্চিহৃ করে দিতো চীন সরকার। ভারতে দেওবন্দ সেখানে ভারতীয় মুসলমানদেরই কেবল এইরকম জাতীয় ঐক্য বিরোধী শিক্ষা দিচ্ছে না, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকান মুসলমানদেরও নিজ দেশজ বিরোধী করে তুলছে। সাম্প্রতিককালে শ্রীলংকান মুসলমানরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় জড়িয়েছে। ছোট্ট এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে আগে কখনো ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা না থাকলেও বেছে বেছে কেন খালি মুসলমানদের সঙ্গেই সেটা ঘটল?

 

এমন দিন তো আসতে পারে যখন শ্রীলংকা সেদেশের কোন মুসলমানকে দেওবন্ধ, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতে অনুমতি দিবে না। আমরা কি দেখিনি তথাকথিত মুসলিম দেশে বোরখা নিষিদ্ধ হতে? ‘ঝুকিপূর্ণ’ মসজিদ বন্ধ করে দিতে? ভারত তার নিজের শরীরে রাখা ঘায়ের উপর অন্যদেশের বিষফোড়া নিতে ভবিষ্যতে নারাজ হতেই পারে। এটা কি তখনো ‘ইসলামফোবিয়া’ হিসেবে গোণ্য হবে?

 

‘ইসলামী শিক্ষা’ যে কোন দেশের বহু জাতি ধর্ম বর্ণের মিলিত সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক ভাইরাস। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে উগ্র জাতীয়তাবাদী শিক্ষা। তথাকথিত অমুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে আজ হোক কাল হোক চীনের মতই ব্যবস্থা নিতে হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে যদি শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ধরে রাখতে চায় তাহলে হাটহাজারী ও দেওবন্দ ফেরত মোল্লাদের কোথায় রাখবে সেটা তাদেরই ঠিক করতে হবে। ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ গঠনের এইসব এজেন্টরা ভারতকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ বলতে পছন্দ করেন। এখন প্রশ্ন এ কেমন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ যেখানে ইসলামী শিক্ষার জন্য উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় মাদ্রাসা থাকে? আমার বহু বন্ধু আছেন যারা তাদের পীরদের দরবারে যান যেটা ভারতে অবস্থিত! এ কেমন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ যেখানে মুসলমানদের বড় বড় পীর দরবেশ আউলিয়াদের দরবার শরীফ থাকে? পাকিস্তানে কোন হিন্দু বিদ্যাপিঠ আছে যেখানে উপমহাদেশের হিন্দুরা পড়তে যায়? নেই। কেউ সৌদি আরব কিংবা মিশরে ক্যাথলিক মিশনে পড়তে যায়? যায় না। ইসলামী রাষ্ট্র ও ‘অইসলামী রাষ্ট্রের’ এখানেই তফাত। পৃথিবীটাকে আমাদের সকলের বসবাসের জন্য ‘অইসলামিক’ বানাতে হবে।…