নাট্যকার এবং  কবি
দীনবন্ধু মিত্র (জন্মঃ- ১৮৩০ – মৃত্যুঃ- ১ নভেম্বর, ১৮৭৩)

উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নাটকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার তিনি। তাঁর প্রথম প্রকাশিত নাটক নীলদর্পণ প্রকাশিত হয় ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে। এর ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে দেশে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং প্রকাশক জেমস লঙের জরিমানা ও কারাদণ্ড হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটিই প্রথম বাংলা নাটক যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়। নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে প্রেরিত হয়। স্বদেশে ও বিদেশে নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ফলে সরকার ইন্ডিগো কমিশন বা নীল কমিশন বসাতে বাধ্য হন। আইন করে নীলকরদের বর্বরতা বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। এর পরে ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় নাটক নবীন তপস্বিনী। দীনবন্ধুর দুটি উৎকৃষ্ট প্রহসন হল ”সধবার একাদশী” ও বিয়ে পাগলা বুড়ো। ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর অপর এক প্রহসন জামাই বারিক প্রকাশিত হয়। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় তাঁর সর্বশেষ নাটক কমলে কামিনী। নাটক ছাড়াও দুখানি কাব্যগ্রন্থও দীনবন্ধু রচনা করেছিলেন – দ্বাদশ কবিতা (১৮৭২) ও সুরধুনী কাব্য (প্রথম ভাগ – ১৯৭১ ও দ্বিতীয় ভাগ – ১৮৭৬)। দীনবন্ধু মিত্র মাইকেল প্রবর্তিত পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক নাট্যরচনার পথে না গিয়ে বাস্তবধর্মী সামাজিক নাট্যরচনায় মনোনিবেশ করেন। এই ধারায় তিনিই হয়ে ওঠেন পরবর্তীকালের নাট্যকারদের আদর্শস্থানীয়।
জন্ম
দীনবন্ধু মিত্রের জন্ম নদিয়া জেলার চৌবেরিয়ায়। পিতা কালাচাঁদ মিত্র। দীনবন্ধুর পিতৃদত্ত নাম ছিল গন্ধর্ব নারায়ণ। দরিদ্র পরিবারে জাত দীনবন্ধুর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রাম্য পাঠশালায়। সেখানে কিছুদিন পাঠগ্রহণের পর তাঁর পিতা তাঁকে জমিদারের সেরেস্তার কাজে নিযুক্ত করে দেন। কিন্তু বিদ্যোৎসাহী দীনবন্ধু কলকাতায় পালিয়ে আসেন এবং পিতৃব্যের গৃহে বাসন মেজে লেখাপড়া চালিয়ে যান। এই সময়েই দীনবন্ধু নাম গ্রহণ করে জেমস লঙের অবৈতনিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুল (বর্তমানে হেয়ার স্কুল) থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে স্কুলের শেষ পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি লাভ করে হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি কলেজ) ভর্তি হন। ১৮৫১ সালে আবার উচ্চতর পরীক্ষায় বৃত্তিলাভ করেন এবং ১৮৫২ সালে তৃতীয় শ্রেণী থেকে সিনিয়র বৃত্তিলাভ করেন। প্রত্যেক পরীক্ষায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে তিনিই সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন। এরপর সম্ভবত কোথাও শিক্ষকতা করেছিলেন দীনবন্ধু, কারণ ১৮৫৩ সালে তিনি টিচারশিপ একজামিনেশনে কৃতকার্য হয়েছিলেন। কলেজের সব পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি পটনায় পোস্টমাস্টার নিযুক্ত হন। ক্রমে তাঁর পদোন্নতি হয় এবং তিনি ওড়িশা, নদিয়া ও ঢাকা বিভাগে এবং পরে কলকাতায় সুপারিনটেন্ডেন্ট পোস্টমাস্টার নিযুক্ত হন। লুসাই যুদ্ধের সময় ডাকবিভাগের কাজে তিনি কাছাড়ে প্রেরিত হন। এই সময় তাঁর তদারকি কর্মে সন্তুষ্ট হয়ে সরকার তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধি দান করেন। যদিও ডাকবিভাগের উচ্চস্তরের কর্মচারী হয়েও উপযুক্ত বেতন তিনি পাননি। বরং অতিরিক্ত পরিশ্রমে স্বাস্থ্যহানিজনিত কারণে মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়।

নাটক  নীলদর্পণ – স্বাদেশিকতা, নীল বিদ্রোহ ও সমসাময়িক বাংলার সমাজব্যবস্থার সঙ্গে এই নাটকের যোগাযোগ অত্যন্ত গভীর। এই নাটকটি তিনি রচনা করেছিলেন নীলকর-বিষধর-দংশন-কাতর-প্রজানিকর-ক্ষেমঙ্করেণ-কেনচিৎ-পথিক ছদ্মনামে। যদিও এই নাটকই তাঁকে খ্যাতি ও সম্মানের চূড়ান্ত শীর্ষে উন্নীত করে। অসিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘নীলদর্পণ’ নাটক প্রকাশিত হলে এবং এর ইংরেজি অনুবাদ প্রচারিত হলে একদিনেই এ নাটক বাঙালিমহলে যতটা প্রশংসিত হয়েছিল, শ্বেতাঙ্গমহলে ঠিক ততটাই ঘৃণিত হয়েছিল। এই নাটক অবলম্বন করে বাঙালির স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সূচনা, এই নাটক সম্বন্ধে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় ও রায়তদের মধ্যে মৈত্রীবন্ধন স্থাপিত হয়, এর মধ্যে দিয়েই শ্বেতাঙ্গ নীলকরদের বর্বর চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়। মনে করা হয়ে থাকে, নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তবে আধুনিক গবেষকগণ এই বিষয়ে একমত নন। এই অনুবাদ Nil Durpan, or The Indigo Planting Mirror নামে প্রকাশ করেছিলেন রেভারেন্ড জেমস লঙ। এই অনুবাদ প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে দেশে উত্তেজনার সৃষ্টি হয় এবং জেমস লঙের জরিমানা ও কারাদণ্ড হয়। জরিমানার টাকা আদালতেই দিয়ে দেন কালীপ্রসন্ন সিংহ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটিই প্রথম বাংলা নাটক যা ইংরেজিতে অনূদিত হয়।

নীলদর্পণ নাটকের মূল উপজীব্য বিষয় হল বাঙালি কৃষক ও ভদ্রলোক শ্রেণীর প্রতি নীলকর সাহেবদের অকথ্য অত্যাচারের কাহিনী। কিভাবে সম্পন্ন কৃষক গোলকমাধবের পরিবার নীলকর অত্যাচারে ধ্বংস হয়ে গেল এবং সাধুচরণের কন্যা ক্ষেত্রমণির মৃত্যু হল, তার এক মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে এই নাটকে। তোরাপ চরিত্রটি এই নাটকের অত্যন্ত শক্তিশালী এক চরিত্র; বাংলা সাহিত্যে এর তুলনা খুব কমই আছে। এই নাটকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য আঞ্চলিক ভাষার সাবলীল প্রয়োগ। কর্মসূত্রে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় যে দক্ষতা দীনবন্ধু আয়ত্ত করেছিলেন, তারই এক ঝলক দেখা মেলে এই নাটকের জীবন্ত চরিত্রচিত্রণে।

নীলদর্পণ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ ইংল্যান্ডের পার্লামেন্টে প্রেরিত হয়। স্বদেশে ও বিদেশে নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। ফলে সরকার ইন্ডিগো কমিশন বা নীল কমিশন বসাতে বাধ্য হন। আইন করে নীলকরদের বর্বরতা বন্ধের ব্যবস্থা করা হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পরবর্তীকালে এই নাটকের সঙ্গে স্টো-এর আঙ্কল টমস কেবিন গ্রন্থের তুলনা করেছিলেন। তা থেকেই বোঝা যায়, সেই সময়কার বাংলা সাহিত্য ও বাঙালির সমাজজীবনে এই নাটক কি গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছিল। সমাজের তৃণমূল স্তরের মানুষজনের জীবনকথা এমনই স্বার্থক ও গভীরভাবে নীলদর্পণ নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে যে অনেকেই এই নাটককে বাংলার প্রথম গণনাটক হিসাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। আবার বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কথা বলে এই নাটকই প্রথম জাতির জীবনে জাতীয়তাবোধের সঞ্চার ঘটিয়েছিল।

রোমান্টিক ও সামাজিক কমেডি
নবীন তপস্বিনী
দীনবন্ধু মিত্রের দ্বিতীয় নাটক নবীন তপস্বিনী। এই নাটকে তাঁর সমসাময়িক মধুসূদনের প্রভাব বহুলাংশে চোখে পড়ে। যদিও এই নাটকের নাট্যবস্তু নেহাতই মামুলি – কতকটা রূপকথার তুল্য। রাজা রমণীমোহন মাতা ও দ্বিতীয়া পত্নীর প্ররোচনায় জ্যেষ্ঠা মহিষীকে পরিত্যাগ করলে গর্ভবতী রানি গৃহত্যাগ করে সন্ন্যাসিনীর জীবন অবলম্বন করেন। যথাকালে তাঁর বিজয় নামে এক পুত্রসন্তান জন্মে। বয়ঃপ্রাপ্ত হলে বিজয় সভাপণ্ডিত বিদ্যাভূষণের কন্যা কামিনীর প্রেমে পড়ে। এদিকে কামিনীর সহিত রাজা রমণীমোহনের বিবাহের তোড়জোড় চলছিল। ঘটনাচক্রে বিজয়ের পিতৃপরিচয় উন্মোচিত হল। রাজা জ্যেষ্ঠা মহিষীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে তাঁকে ঘরে ফিরিয়ে আনলেন। বিজয় ও কামিনীর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হল। নবীন তপস্বিনী অত্যন্ত অপরিণত এক নাট্যরচনা। কাহিনির উপযুক্ত পরিবেশ রচনা করতে না পারায় সমগ্র বিষয়টিই এখানে কৃত্রিমতায় পর্যবসিত। এমনকি যার নামে এই নাটকের নামকরণ ‘নবীন তপস্বিনী’, সেই কামিনীর চরিত্রটি পর্যন্ত নাটকে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। দীর্ঘ ক্লান্তিকর বক্তৃতা ও মাঝে মাঝে পয়ার ও সংস্কৃত শ্লোকের ব্যবহার নাটকের গতি শ্লথ করেছে। একমাত্র জলধরের কৌতুকরস এই নাটকের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যদিও এটি শেক্সপিয়রের হলফাস্টের অনুকরণের রচিত।

কমলে-কামিনী
দীনবন্ধু মিত্রের দ্বিতীয় রোম্যান্টিক নাটক কমলে-কামিনী তাঁর জীবনের শেষ নাট্যকীর্তিও বটে। এই নাটক রচনার অব্যবহিত পূর্বে কর্মসূত্রে দীনবন্ধু কাছাড়-মণিপুর অঞ্চলে কিছুদিন অতিবাহিত করেন। সেই অঞ্চলের পটভূমিকায় এক কাল্পনিক কাহিনির আধারে কমলে-কামিনী রচিত। কাছাড়ের রাজসিংহাসনে ব্রহ্মরাজের শ্যালক অধিষ্ঠিত হলে মণিপুররাজের সহিত ব্রহ্মরাজের যুদ্ধ আরম্ভ হয়। এই সময়ে মণিপুররাজ শিখণ্ডীবাহনের প্রেমে পড়েন ব্রহ্মরাজকুমারী রণকল্যানী। এই প্রেমকাহিনিই মূল নাটকের উপজীব্য।

লীলাবতী একটি সামাজিক নাটক। এর কাহিনীজাল অত্যন্ত জটিল। কলকাতার সম্পন্ন গৃহস্থ হরিবিলাস চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সন্তানদের দ্বন্দ্ব জটিল জীবনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে এই কাহিনী। ললিত ও লীলাবতীর প্রণয় কথাই নাটকের মূল উপজীব্য। তবে সাধারণ নাগরিক জীবনের এমন রোম্যান্টিক উপস্থাপনায় নাটকের বাস্তবতা আদৌ রক্ষিত হয়নি। যদিও এই নাটকে বিষয়বস্তুর রহস্যঘনতা আছে, সংঘাত ও আকস্মিকতা আছে, এমনকি শেষের দিকে যথেষ্ট গতিও সঞ্চারিত হয়েছে।
প্রহসন
বিয়ে পাগলা বুড়ো
জামাই বারিক
সধবার একাদশী
সধবার একাদশী১৮৬৩ খ্রীস্টাব্দে প্রকাশিত একটি প্রহসন। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে সুরা পান ও বেশ্যা বৃত্তি যুবকদের জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল। এই সামজিক বিপর্যয়ের কাহিনী অবলম্বনে প্রহসনটি রচিত।
……….