#জ্ঞানভানু_দীপ্ত_এক_অন্য_অপালা

ঋষি যুগ-সেই অতীতের কথা। জ্ঞানভানুর দীপ্ত প্রভায় উদ্ভাসিত ছিলেন তৎকালে অনেকেই। ঋষি ছিলেন ব্রাহ্মণে, ক্ষত্রিয়ে, বৈশ্যে এমন কি নারীকুলেও। সেই সব কথা স্মৃতিপথে আসতে মনে জাগে কতই না আনন্দ! অম্ভৃণ ঋষির কন্যা বাক্। তাঁর অনুভূতি দেবীসুক্ত। ব্রহ্মজ্ঞানী সুলভা ও রাণী চূড়ালা পরম যোগীনি।

বিশ্ববারা ও অপালা ইঁরা বেদের ঋষি। অত্রিপত্নী অনুসূয়া ও বশিষ্ঠ পত্নী অরুন্ধতী বিলক্ষণ প্রভাবসম্পন্না। ইঁহারা নারীকুলের গৌরব। ঋষি হিসাবে আমরা স্মরণ করতে পারি এতৎপ্রসঙ্গে বিদুষী নারী গার্গীকেও।

ধর্মজগতের কথা ছেড়ে দিলেও কর্মজগতে নারীগণ কি না করেছেন অথবা কি না রেখেছেন? কে না জানে সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তীর কথা, কে না জানে পতিপরায়ণা শৈব্যা, চিন্তা ও দ্রৌপদীর জীবন-কাহিনী? দুঃখের কষ্টিপাথরে উজ্জ্বল হতে উজ্জ্বলতররূপে প্রকাশ পাযেছিল তাঁহাদের চরিত্র মহিমা।

সাধ্বীনারী জাতির জননী। তাঁদের আদর্শে অনুপ্রাণিত সমাজ ছিল তৎকালে জ্ঞানবিজ্ঞানে ধর্মে-কর্মে কতই না সমুন্নত! সভা-সমাজে নারীরাও পাইতেন সুযোগ্য আসন।

ঋগ্বেদ-এ নারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করারও সাক্ষ্য আছে। তাই আমরা শুনি, মুদ্‌-গলিনীর যুদ্ধ জয়ের বৃত্তান্ত। বিশ্‌পলা যুদ্ধে একটি পা এবং বধ্রিমতী একটি হাত হারান। বধ্রিমতী এবং শশীয়সী তাঁদের বীরত্বের জন্যও উল্লিখিত হয়েছেন। এর থেকে প্রাচীন বৈদিক যুগে নারীর কিছুটা সাম্য ভোগ করার সাক্ষ্য মেলে।

দেবগণ ও পিতৃগণকে দৈনন্দিন জল দেওয়ার প্রসঙ্গে এমন তিন নারীর নাম পাই যাদের উদ্দেশ্যেও জল দেওয়া হত। তাঁরা হলেন গার্গী, বাচক্লবী, বাড়বা আত্ৰেয়ী এবং সুলভ মৈত্ৰেয়ী। তাছাড়া বেদের ছয় অধ্যয়নের অন্তে উৎসর্গ দিবসে একটি অনুষ্ঠান হত; অন্যান্য শ্রদ্ধার্হদের মধ্যে বিশিষ্ঠপত্নী অরুন্ধতীকে আসন দেওয়া হত।

ঋগ্বেদ সংহিতার অষ্টম মণ্ডলে উল্লেখ আছে অপালার কথা | এই বিদুষী ইচ্ছাশক্তির জোরে ফিরে পেয়েছিলেন স্বামী এবং সংসার | অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর তপস্যা অমরত্ব দিয়েছে অত্রি মুণির কন্যা অপালাকে |

যাজন-যজন-অধ্যয়ন-তপস্যা নিয়ে নিজের তপোবনে শান্তিতেই ছিলেন সপ্তর্ষির অন্যতম ঋষি অত্রি | কিন্তু তাঁর স্ত্রী অনুসূয়ার মনে শান্তি ছিল না | কারণ তিনি সন্তানসুখে বঞ্চিত ছিলেন | বহু তপস্যার পরে অবশেষে সন্তানলাভ করলেন ঋষি অত্রি এবং তাঁর অর্ধাঙ্গিনী অনুসূয়া | কন্যার নাম রাখা হল অপালা |

তপোবন আশ্রমে ঋষিকন্যা হয়ে বড় হচ্ছিলেন অপালা | শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অত্যাশ্চর্য মেধাবী | কিন্তু বাধ সাধল অত্রি-কন্যার শারীরিক সুস্থতা | শিশু অপালা দুরারোগ্য চর্মরোগে আক্রান্ত হলেন | সারা দেহ ভরে গেল সাদা দাগে | বহু চিকিৎসক দেখিয়েও ফল পাওয়া গেল না |

মেয়েকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়লেন ঋষি অত্রি | খুঁত ঢাকতে অপালাকে তাঁর পিতা বললেন‚ শাস্ত্র অধ্যয়নে মনোনিবেশ করতে | অত্রির দুশ্চিন্তা দূর করে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়ে গেল অপালার দেহের দাগ | পিতা ভাবলেন‚ এ বার অপালার বিয়ে দিতে অসুবিধে হবে না |

এমন সময়ে অত্রির তপোবনে শিক্ষা গ্রহণে এলেন কৃষশ্ব | এই তরুণ মুগ্ধ হলেন অপালার রূপে | তিনি তাঁর পাণিপ্রার্থনা করলেন ঋষির কাছে | খুশি হয়ে সম্মত হলেন অত্রি-অনসূয়া | যথা সময়ে বিয়ের পরে স্বামীগৃহে চলে গেলেন অপালা |

শ্বশুরবাড়িতেও নিজ গুণে সবার মন জয় করে নিলেন অপালা | কিন্তু তাঁর দাম্পত্যে ঘনিয়ে এল কালো মেঘ | বিবাহিত নারী অপালার দেহে আবার দেখা দিল সাদা দাগ | উঠে গেল মাথার চুল | ঘৃণায় তাঁকে পরিত্যাগ করলেন স্বামী |

স্বামী পরিত্যক্তা অপালা মনোকষ্টে চলে এলেন পিতাগৃহে | দুঃখ ভুলতে মন দিলেন অধ্যয়নে | এই সময়ে ঋগ্বেদের স্তোত্র রচনা করেন তিনি | সেইসঙ্গে পিতার পরামর্শে শুরু করলেন কঠোর তপস্যা | তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হলেন ইন্দ্রদেব |

একদিন তপস্যারত অপালা নদীর ধারে পেলেন সোমলতা | তিনি সামান্য সোমলতা মুখে দেন | তখন তাঁর সামনে আবির্ভূত হন ইন্দ্রদেব | যেহেতু সোমরস ইন্দ্রের প্রিয়‚ পুরোটাই দেবরাজকে উৎসর্গ করলেন অপালা | ভক্তের এই আচরণে তুষ্ট হলেন দেবরাজ |

তিনি অপালাকে সুস্থ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিলেন | অথর্ব বেদে আছে‚ ইন্দ্রদেব মোট তিনবার অপালার দেহের ত্বক পরিবর্তন করেন | তিনবার নতুন ত্বকে ঢেকে যায় অপালার দেহ |

ইন্দ্রের আশীর্বাদে অসীম রূপের অধিকারিণী হলেন অপালা | চর্মরোগে যে মাথা কেশহীন হয়ে গিয়েছিল‚ তা ঢেকে গেল আলুলায়িত কেশে | উজ্জ্বল ত্বক এবং বর্ণের অপালা গিয়ে দাঁড়ালেন স্বামীর সামনে | স্ত্রীকে দেখে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলেন না কৃষশ্ব | অনুতাপে তাঁর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল | অনুরোধ করলেন‚ স্ত্রী যেন তাঁকে ক্ষমা করে ফিরে আসেন সংসারে |

উদারমনা অপালা ক্ষমা করলেন স্বামীকে | সসম্মানে ফিরে এলেন স্বামীগৃহে | নিজের তপস্যাবলে স্বমহিমায় আবার জ্বলজ্বল করে উঠলেন বিদুষী অপালা |

‘‘যেনাহং নামৃতাস্যাং কিমহং তেনকুর্য্যাম্’’।

ঈশাবাস্যমিদং সর্বং যৎকিঞ্চ জগত্যাং জগৎ।
তেন ত্যক্তেন ভুঞ্জীথা মা গৃধঃ কস্যস্বিদ্ধনম্। 

তথ্যঃ

ঋগ্বেদ সংহিতা