ছিন্নমূল বাঙালের সত্য সন্ধান: ২(খন্ড চিত্র)
————————————————-
১.১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬, মুসলিম লীগের ডাকে ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে পালন করা হয় । ১৯৩৯ সাল থেকেই ভারতে বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা পরিস্থিতি শুরু হয় । ১৯৪২ থেকে তা তীব্র আকার ধারণ করে । কংগ্রেসি নেতা প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, ১৪ই আগস্ট বালিগঞ্জে হিন্দুদের দোকানপাট খোলা রাখার আর্জি জানান জনসভা করে । ফলে উত্তেজনার আবহ তৈরী হয় ।
১৬ই আগস্ট কলকাতার রাস্তায় বিশাল সংখ্যক মুসলিমদের (সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে) মিছিল নামে, যার একটা অংশ সশস্ত্র ছিল । ওইদিন সকাল ১০টা থেকেই হিন্দু মহল্লাতে দোকানপাটের উপর আক্রমণের খবর লালবাজারে আসতে থাকে । সকাল ১১টা তে সুরাবর্দী এবং খাজা নিজামুদ্দিন উর্দুতে উত্তেজনামূলক বক্তব্য দেয় । ফ্রেডরিক বারোজ, তৎকালীন বাংলার গভর্নর এই উত্তেজনামূলক বক্তব্যের খবর পায় নি । সুরাবর্দী প্রশাসন কে নিষ্ক্রিয় করে রেখেছিল । পুলিসের কাছে আক্রমণ প্রতিরোধ করার কোনো অর্ডার পৌঁছায়নি । দুপুরের মধ্যে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় মুসলিমদের আক্রমণ শুরু হয়ে যায় । চলে ব্যাপক লুটতরাজ । এই সময় পুলিস কাঠের পুতুলের মত বসেছিল । সেসময় কলকাতাতে হিন্দু ছিল ৬৪% আর মুসলিম ৩২% । প্রথমার্ধে আক্রান্ত  হিন্দুরা পালটা প্রত্যাঘাত শুরু করে । ১৭ই আগস্ট, সৈয়দ আবদুল্লাহ ফারুকি আর এলান মিস্ত্রি’র নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র মুসলিম কেশোরাম কটন মিল আক্রমণ করে । পৈশাচিকভাবে ৭০০-৮০০ হিন্দু কর্মচারীকে খুন করা হয়, যার মধ্যে ৩০০ উড়িষ্যা বাসী  ।

এই গণহত্যার প্রাথমিক নিশানা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা এবং হত্যাকারীরা সুবিধে পেয়েছিল সুরাবর্দী’র নির্দেশে প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকায় । পরবর্তী পর্যায়ে যখন হিন্দুরা পাল্টা প্রত্যাঘাত শুরু করে, তখন সুরাবর্দী বাধ্য হয়ে ফ্রেডরিক বারোজ’কে আর্মি’র জন্য অনুরোধ করে। ঠিক কতজন নিহত হয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা পাওয়া মুশকিল, তবে সংখ্যাটা ৭০০০-১০০০০ এর কম হবে না ।

২.কলকাতার দাঙ্গায় মুজিবের ভুমিকা নিয়ে উইকির ভাষাভিত্তিক দ্বিচারনা:

#”…Mujib (Sheikh Mujibur Rahman) was one of the Muslim politicians working under Suhrawardy during the communal violence that broke out in Calcutta, in 1946, just before the partition of India.” [https://en.wikipedia.org/wiki/Sheikh_Mujibur_Rahman]

#”ভারত ও পাকিস্তান পৃথক হওয়ার সময়ে কলকাতায় ভয়ানক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা হয় । এসময় মুজিব মুসলিমদের রক্ষা এবং দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সোহরাওয়ার্দীর সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হন ।” [https://bn.wikipedia.org/wiki/শেখ_মুজিবুর_রহমান]

৩.”আর আমেরিকার দালাল সুরাবর্দী বা তার লেঠেল সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন আগা-গোড়া সমান । আমার ‘নানা’ সেই সময় কলকাতা থাকতেন । পুরো ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন । সেই দাঙ্গার ভয়াবহতা, নৃশংসতার বর্ণনা শুনেই আমাদের রক্ত হিম হয়ে যেত । উনারা কংগ্রেস সমর্থক ছিলেন (১৯৭৯ তে স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে চলে আসার আগ পর্যন্ত ঐ দলটিই সমর্থন করতেন) । ওই দাঙ্গায় মুসলিম লীগের একটা শয়তানও মরেনি (কারণ ওদের প্রস্তুতি ছিল) । খালি মেরেছে । মরেছে নিরীহ মানুষ । যে মুসলমানরা কংগ্রেস করতো তারা মরেছে সবচেয়ে বেশি । আর (মরেছে) যারা জানতো না কি ঘটবে বা ঘটতে যাচ্ছে । আজব লাগে যখন দেখি সেই দাঙ্গাবাজ সাম্প্রদায়িকরা হয়ে যায়, ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ আর ‘জাতির জনক’ ।” [এ্যাপোলো, 2-July-2011]

৪.”তখন ১৯৪৬ … রাস্তায় বের হওয়া তখন সম্ভব ছিল না । প্রায় সময়ই কারফিউ জারি করা থাকত । … আমাদের বাড়ির বারান্দাটা ছিল রাস্তার দিকে । তেতলার বারান্দায় দাঁড়ালে রাস্তা দোকানপাট অনেক দূর পর্যন্ত্ দেখা যেত । একদিন দেখলাম মুসলমানেরা হিন্দুদের দোকান লুঠ করতে লাগল । হিন্দুরাও মুসলমানদের উপর অত্যাচার শুরু করল ।
কোনদিন সন্ধ্যাবেলায় বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতাম নিকাশী পাড়ার আকাশ লালে লাল । হিন্দুরা মুসলমানদের পাড়ায় আগুন লাগিয়ে দিয়েছে । একসময় শুনলাম মুসলমানরা হিন্দু মেয়েদের গোপন অঙ্গে লোহার শিক ঢুকিয়ে পুড়িয়ে মারছিল । এতে হিন্দুরা প্রচন্ড খেপে যায় । তখন হিন্দুরা মুসলমানদের নি্র্বিচারে হত্যা করতে লাগল । সেইসব দিনের কথা মনে পড়লে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ।” [ছায়া দে, 4-August-2008]