ছিন্নমূল বাঙালের সত্য সন্ধান: ৩

ছিন্নমূল বাঙালের সত্য সন্ধান: ৩
————————————–

১৯৪৬ সালে  বাংলায় মুসলমান ছিলো ৫৫%, হিন্দু ৪৫%।  কংগ্রেসকে সহজেই হারিয়ে বাংলার ক্ষমতা দখল করে মুসলিম লীগ। সোহরাওয়ার্দী হলো মুসলিম সরকারের মূখ্যমন্ত্রী; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তার হাতে ছিল। জিন্নার ডাইরেক্ট এ্যকশন ডের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিল এই জল্লাদ। ২৮ জুলাই থেকে ১৬ আগস্ট, সময়টা খুব কম।  দ্রুত পরিকল্পনামাফিক এগোতে থাকলো প্রস্তুতি । ১৯৪৬ সালের ৫ আগস্ট, স্টেটসম্যান পত্রিকায় সোহরাওয়ার্দী লিখল: “হিংসা এবং রক্তপাত অন্যায় নয়, যদি তা মহৎ উদ্দেশ্যে করা হয়। মুসলমানদের কাছে আজ পাকিস্তান আদায় ছাড়া অন্য কোনো প্রিয় কাজ নেই।”

সে দিনই খাজা নাজিমুদ্দিন, পরে যে পূর্ব বাংলার মূখ্যমন্ত্রী হয়, মুসলিম ইনস্টিউটে, মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সমাবেশে বললো : “মুসলিম লীগের এটা পরম সৌভাগ্য যে, এই রমজান মাসেই সংগ্রাম শুরু হবে। কারণ, এই রমজান মাসেই তো জিহাদের নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ।”

কলকাতার মেয়র, ওসমান খান, উর্দুতে একটা প্রচার পত্র বিলি করলো। তাতে লিখা ছিলো, “আশা ছেড়ো না, তরোয়াল তুলে নাও, ওহে কাফের, তোমাদের ধ্বংসের দিন বেশি দূরে নয়।” লিফলেটে ছিলো তরোয়াল হাতে জিন্নার ছবি। মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে, ২৩টা নির্দেশ দিয়ে একটা লিফলেট বিলি করা হয়। নির্দেশনাগুলো ছিল :

১. ভারতের সকল মুসলমান পাকিস্তানের দাবীতে প্রাণ দেবে।
২. পাকিস্তান জয়ের পর সারা ভারত জয় করতে হবে।
৩. ভারতের সব মানুষকেই ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে হবে।
৪. সমস্ত মুসলিম রাষ্ট্রকেই বৃটিশ-আমেরিকার পৃথিবী শোষণের সাথে হাত মেলাতে হবে।
৫. একজন মুসলমানকে ৫ জন হিন্দুর অধিকার পেতে হবে, অর্থাৎ একজন মুসলমান সমান ৫ জন হিন্দু।
৬. যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারত স্থাপিত না হয়, ততদিন পর্যন্ত নিম্নলিখিত কাজগুলি করে যেতে হবে:
ক) হিন্দুদের যত কারখানা ও দোকান আছে, তা ধ্বংস করতে হবে এবং লুঠ করতে হবে এবং লুঠের মাল মুসলিম লীগ অফিসে জমা দিতে হবে।
খ) মুসলিম লীগের সব সদস্যকে অস্ত্র বহন করতে হবে।
গ) সকল জাতীয়বাদী মুসলমান, যারা লীগের সাথে যুক্ত হবে না (অর্থাৎ কংগ্রেসী), তাদেরকে গুপ্তভাবে হত্যা করতে হবে।
ঘ) হিন্দুদেরকে ক্রমাগত খুন করে যেতে হবে এবং তাদের সংখ্যা কমাতে হবে।
ঙ) সমস্ত মন্দির ধ্বংস করতে হবে।
চ) কংগ্রেস নেতাদেরকে প্রতিমাসে ১ জন করে খুন করতে হবে।
ছ) কংগ্রেসের অফিসগুলি মুসলমানদের দিয়ে ধ্বংস করাতে হবে।
জ) করাচী, বোম্বাই, কলিকাতা, মাদ্রাজ, গোয়া বিশাখাপত্তনম ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই অচল করে দিতে হবে।
ঝ) কোনো মুসলমানকেই হিন্দুদের অধীনে সামরিক বাহিনী, নৌবাহিনী, সরকারী, বেসরকারী কোথাও কাজ করতে দেওয়া হবে না।
ঞ) মুসলমানদেরকে সমস্ত ভারত ও কংগ্রেসকে অন্তর্ঘাত করে যেতে হবে, মুসলমানদের দ্বারা শেষ ভারত আক্রমন পর্যন্ত।
ট) এসব ব্যাপারে অর্থ দেবে মুসলিম লীগ।
ঠ) সমস্ত অস্ত্রশস্ত্র বোম্বাই, দিল্লী, কলিকাতা, মাদ্রাজ, ব্যাঙ্গালোর, লাহোর, এবং করাচির মুসলমানদের হাতে ভাগ করে দেওয়া হবে।
ড) মুসলিম লীগের সব সদস্য অস্ত্র ব্যবহার করবে, এমনকি দরকার হলে পকেটে রাখার মতো ছোড়া ব্যবহার করবে, যাতে ভারতবর্ষ থেকে সমস্ত হিন্দুদেরকে তাড়িয়ে দেওয়া যায়।
ঢ) সমস্ত বাহন হিন্দুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহার করা হবে।
ণ) সমস্ত হিন্দু নারী ও মেয়েদেরকে ধর্ষণ করবে, লুঠ করবে, ইসলামে ধর্মান্তরিত করবে ১৬ আগস্ট, ১৯৪৬ সাল থেকে।
ত) হিন্দু সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করতে হবে।
থ) লীগের সমস্ত সদস্যরা হিন্দুদের প্রতি সব সময় নিষ্ঠুর ব্যবহার করবে এবং তাদেরকে সামাজিক অর্থনৈতিক সব ব্যাপারে পরিত্যাগ করবে।

কলকাতা ছাড়াও নোয়াখালি, ত্রিপুরা, চট্টগ্রাম, ঢাকা, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, নদীয়া, ২৪ পরগনা প্রভৃতি জেলায় মুসলিম লীগের আহ্বানে অনুষ্ঠিত জনসভায় আকার ইঙ্গিতে মুসলমানদের বুঝিয়ে দেওয়া হলো, দেশে মুসলিম লীগের সরকার আছে, সুতরাং পাকিস্তান আদায়ের জন্য ১৬ আগস্ট থেকে অগ্নি সংযোগ, লুঠ, নারী অপহরণ, ধর্ষণ, খুন এসবের জন্য কারো কোনো প্রকার শাস্তি হবে না।

প্রচারের সাথে সাথে বাইরে থেকে প্রচুর সংখ্যক মুসলমানকে কলকাতায় এনে বিভিন্ন মুসলমান অধ্যুষিত এলাকায় রাখা হয়।  এ্যাকশন শুরুর এক সপ্তাহ আগের খণ্ডিদৃশ্য:

বেলগাছিয়া, রাজাবাজার, কলাবাগান বস্তি, ক্যানাল ওয়েস্ট রোড, ধর্মতলা, পার্কসার্কাস, এন্টালি প্রভৃতি এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরেই মুসলমানরা বিভিন্নরকম অস্ত্রশস্ত্রে ধার দিচ্ছিলো। বেলগাছিয়া, বি.টি রোডে – লাঠি, ছোরা ও তরোয়াল ভর্তি লরি দেখা গিয়েছিলো। মানিকতলায় ক্যানাল ওয়েস্ট রোডে অস্ত্র ভর্তি ঠেলাগাড়ি দেখা গিয়েছিলো। মুসলমানদের দোকানগুলোতে পাকিস্তান লিখে চিহ্নিত করা হয়েছিলো।

এ্যাকশনে ট্রাক / লরির ব্যবহার :

কলকাতার মেয়র ওসমান খান, কর্পোরেশনের সব লরি মুসলিম লীগের নেতাদের ব্যবহারের জন্য দিয়ে দিয়েছিলো, যাতে করে ইচ্ছেমতো লুঠপাট করতে পারে আর  মারার জন্য অস্ত্র শস্ত্র বহন করে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতে পারে। লরিগুলো যাতে ঠিক মতো চলতে পারে, সেজন্য সুরাবর্দীর সরকার, পেট্রোলের যথেষ্ট অনটন থাকা সত্ত্বেও, ঢালাও ভাবে, পেট্রোলের কূপন ইস্যু করেছিলো। আজকের বাংলাদেশে ব্যবসারত ইস্পাহানি মির্জাপুর চা কোম্পানির মালিক ইস্পাহানি ছিলো সুরাবর্দী সরকারের চাল সরবরাহকারী। ইস্পাহানি নিজের সব লরি মুসলিম লীগের লোকজনদেরকে ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে এর সময় ব্যবহারের জন্য দিয়ে দিয়েছিলো। এসব লরিগুলোতে  মুসলিম লীগের পতাকা টানিয়ে সন্ত্রাসের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিলো। যাদের পেট্রোলের কূপন ছিলো না, তারা জোর করে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্প থেকে পেট্রোল আদায় করেছিলো।