(পর্ব – ৪)

বাইবেলেই যদি আপনারা জনের (John) চেহারার বিবরণ দেখেন দেখবেন তাঁর হাতে কমণ্ডলু, মাথায় জটা, গলায় মালা, তিনি বাঘের ছাল পরে আছেন এবং জর্ডন নদীর জল ব্যবহার করে যীশুকে দীক্ষা দিচ্ছেন। এই ধরণের দীক্ষা দেবার রীতি ইজরায়েল, প্যালেস্টাইন, ইউরোপ বা আমেরিকার কোথাও ছিল না, দীক্ষা দেবার এই পরম্পরা একমাত্র ভারতবর্ষেই আছে। মাথায় জটা রাখা ও হাতে কমণ্ডলু নেওয়ার রীতি ভারতবর্ষের সাধুদের রীতি, ব্যাঘ্রছাল পরার পরম্পরা শিবের পরম্পরা যা বহুকাল থেকেই আমাদের দেশে আছে। সুতরাং এগুলোই প্রমাণ করে যে যীশুর গুরুদেব জন ভারতবর্ষের সাধু। সাধু কাকে বলে, তাঁর চেহারা কেমন হয়, ত্যাগ কাকে বলে সেটা লোকেদের দেখানোর জন্য যীশু তাঁকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন। সুতরাং আমরা কি বলতে পারি না যে প্রত্যেক ধর্মমত সে বৌদ্ধ ধর্ম বা জৈন ধর্ম যাই হোক না কেন, আসলে তাদের জন্ম ভারতবর্ষ?

এবার যে ধর্ম যে স্থানের জন্য উপযুক্ত সেই ধর্ম সেই স্থানে ক্রিয়াশীল হয়েছে, যেমন বৌদ্ধধর্ম বেশি কাজ করেছে চিন, জাপান, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা দেশগুলোর মধ্যে। যেমন ইসলাম বেশি কাজ করেছে আরব দেশগুলোর জন্য। সুতরাং বড় বড় যত ধর্ম আন্দোলন হয়েছে তার জন্মস্থান ভারতবর্ষ। তাইজন্য উনি (স্বামীজী) বলছেন I thank you in the name of the mother of religion. অর্থাৎ আমি কোন ধর্ম প্রবক্তা নই, সমস্ত ধর্মের যেখান থেকে শুরু, যেখান থেকে হিমালয়ের বরফ গলেছে, যেখান থেকে এক একটা নদী ও উপধারা বয়ে এসেছে আমি সেখান থেকে এসেছি।

সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মের সবচেয়ে নবীন প্রতিনিধি – এ এক অদ্ভুত contrast. এটাই একটা ধর্ম আন্দোলনের সত্যতাকে প্রতিষ্ঠা করে। অন্যান্য বক্তারা বলছেন toleration বা সহিষ্ণুতার কথা। তাঁরা বলছিলেন যে সব ধর্মের প্রতি যেন আমাদের এক প্রকার সহিষ্ণুতা বা সহ্য করার ক্ষমতা থাকে। স্বামীজী বলছেন – We have taught toleration. আমরা সহিষ্ণু হতে বলিনা, আমরা সহিষ্ণু হতে শেখায়। এবং এই সহিষ্ণুতা অন্যরকম। আমি শৈব আর তুমি বৈষ্ণব, আমি তোমাকে সহ্য করতে পারিনা, তোমার হাবভাব আমার জঘন্য লাগার সত্ত্বেও কোনরকমে সহ্য করছি কারণ এখন গণতন্ত্র চলছে, এমন সহিষ্ণুতা নয়। ভারতবর্ষে সেকুলারিজম বলতে যে সহ্য করার নীতি চলে সেই সহিষ্ণুতা নয়, সহিষ্ণুতা মানে ভালোবাসা। সব ধর্মকে নিজের আপন মনে করা। আমি আমার নিজের ধর্মে ঠিক কিন্তু প্রত্যেকের ধর্ম, প্রত্যেকের ভাব, ভিন্ন ভিন্ন পথ আমার খুব আপন। যে যাতে শান্তিতে আছে আমার তাতেই আনন্দ। একই পরিবারে হয়ত একজন শাক্ত, একজন বৈষ্ণব, কেউবা হয়ত ব্রাহ্মণ, অপর কেউ হয়ত বৈশ্য, এরকম খুবই হয়েছে। মাত্র একশ দেড়শো বছর আগেই এটা আমাদের বাঙালি পরিবারে খুব হয়েছে। কোন অসুবিধা বা বিরোধ নেই, বরং আমরা একে অপরের কাছ থেকে শিখছি – হ্যাঁরে, তোদের সমাজে এই নিয়ে কি বলেরে, বা ঈশ্বরের কোনো রূপ নিয়ে কি বলেরে, সাকার ও নিরাকার নিয়ে কি বলে – আমরা শিখছি একে অপরের কাছ থেকে। স্বামীজী একথাই বলছেন যে এমন নয় যে ভারতবর্ষ সহ্য করে নিয়েছে, বরং উল্টোটা, ভারতবর্ষ আপন করে নিয়েছে। আর এই কথাটা একমাত্র স্বামীজীই বলতে পারেন কারণ তিনি এমন এক গুরুর (ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ) সন্তান যিনি সব সাধনা করেছেন, যিনি দেখেছেন যে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন এবং যীশুর মূর্তি থেকে যীশুর উজ্জ্বল এক রূপ এসে তাঁর বুকের মধ্যে মিশে যাচ্ছে। কোনদিন শুনবেন না যে কোন পোপ এই ধরণের কোন দর্শন দেখেছেন। কোনদিন শুনবেন না কোন মৌলবি এই ধরণের কোন দর্শন দেখেছেন যে মক্কার পাথরের সাথে শিবের মূর্তি মিশে যাচ্ছে। ভারতবর্ষেই একমাত্র এইরকম দর্শন হতে পারে। ঠাকুর রামকৃষ্ণের মত কেউ পারেন একইসঙ্গে রাধাভাব, ইসলাম ভাব ও ক্রীশ্চান ভাবের সাধনা করতে। কোনরকম বিরক্তি ছাড়াই শুধু ভালোবেসে তিনি সব রকমের সাধনা করতে পারেন।

২৭ শে সেপ্টেম্বরে শিকাগো ধর্মসভা অর্থাৎ World Parliament of Religions-এ শেষ বক্তৃতায় তিনি যে ছোট্ট বক্তব্য রেখেছিলেন সেখানে তিনি বলেছিলেন যে সব বক্তাই বলছেন সব ধর্ম এক হোক। এটা খুবই ভাল কথা, কিন্তু তার মানে যদি এই হয় যে একটাই ধর্ম শ্রেষ্ঠ, তারাই থাকবে এবং বাকিরা কেউ থাকবে না, তাহলে আমি তাদের বলব – মজা করে তিনি বলছেন, Dear brother – হে ভাই তোমার এই স্বপ্ন বিনাশ হবে। কোনদিনই এমন হবে না। সব ধর্মই থাকবে, নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য নিয়ে তাদের বিবর্তন হয়ে সনাতন সত্যের দিকে তারা যাবে। স্বামীজী একথা বলছেন কারণ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে একবার বলেছিলেন যে – জানিস নরেন সেইদিন এই পৃথিবী উন্নত হবে যেদিন প্রত্যেক মানুষের জন্য আলাদা আলাদা ধর্ম হবে। এখানে ধর্ম বলতে কি বলতে চাইছেন? আমরা প্রত্যেক মানুষ একে অপরের থেকে আলাদা। স্বভাবে, বিচারে, শরীরে ও মনে আমরা পরস্পরের থেকে পৃথক। তাই প্রত্যেকের পথও স্বতন্ত্র। কেন সবাই একই রকম করব, কেন একই মন্ত্র জপ করব, কেন একই স্লোগান সবাইকে দিতে হবে? প্রত্যেকে নিজের ভাব অনুযায়ী চলবে, স্বামীজী এই কথাই বলছেন। তাঁর এই কথা বলার কারণ কি? কেন এই ধর্মসভা আদৌ আয়োজন করা হয়েছিল? আমেরিকার এই সময় ১৮৮৫ থেকে ধরুন ১৮৯৫ সময়টাকে বলা হয় Gilded Age. আপনারা হয়ত জনেন সোনার জল বা আস্তরণ দেওয়া কোন একটা অলংকার সোনার মনে হলেও কয়েকদিন ব্যবহার করার পরে ভেঙে টেঙে গেলে সোনার আস্থরণ উঠে গেলেই বোঝা যাবে ওটা আসলে সোনার ছিল না। ঠিক তেমনই ঐ সময়ে লোকে ভেবেছিল আমেরিকা হচ্ছে golden age (স্বর্ণালী সময়), সেটা যদিও হল না। বাইরে থেকে দেখাচ্ছিল যেন দারুণ সময় যাচ্ছে কিন্তু ভেতরে ভেতরে একদম ধসা পচা অবস্থা ছিল বলে বলা হয় Gilded Age. তার কুড়ি তিরিশ বছর আগে ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ করা হলেও নিগ্রোদের প্রতি সাদাদের যে ঘৃণা তা কি অত সহজে মন থেকে চলে যায়? আমাদের জাত-পাত, ঘৃণা নিয়ে সবাই কত সমালোচনা করে, এবার যারা সমালোচনা করে তাদের একটু দেখা যাক। তাদের মধ্যে কি ঘৃণা! বেশ বহু বছরের সিভিল ওয়ার (civil war) অর্থাৎ গৃহযুদ্ধ চলেছে আমেরিকায়। তারপরে আবার শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে। অর্থাৎ কলকারখানা তৈরি হচ্ছে, প্রকৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে, নতুন নতুন রেললাইন পাতা হচ্ছে, প্রচুর টাকা লগ্নি করা হচ্ছে রেলের পেছনে এবং রেল মানেই তখন একটা ভাল profit, এছাড়াও জাহাজ বিল্ডিং কোম্পানি হচ্ছে। এবার যেটা হচ্ছে, ক্রীতদাসের সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে। যারা ধরুন আগে বিনা পয়সায় ক্রীতদাস ছিল এখন তাদের পয়সা দিয়ে ক্রীতদাস করা হচ্ছে। অর্থাৎ একজনকে সামান্য টাকায় সকাল থেকে রাত্রির পর্যন্ত লেবারের মত কাজ করে যেতে হবে। এরই প্রতিক্রিয়াতে trade union, labor law এসব আরম্ভ হল। আস্তে আস্তে মার্কসিজমের তত্ত্বগুলো খাড়া হতে আরম্ভ হল। এই এক অবক্ষয়ের ইতিহাস।

(ক্রমশ)

[জিয়াগঞ্জের রামকৃষ্ণ সংঘের উদ্যোগে আয়োজিত স্বামী বিবেকানন্দের ১২৫’তম শিকাগো ধর্মসভা পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জয়দীপ মহারাজের বক্তব্য]
তারিখ :- 11.09.2017