প্রিয়া সাহার কথা অনেকদিন মনে থাকবে কারণ সে বাংলাদেশের স্বঘোষিত ‘অসাম্প্রদায়িকদের’ লুঙ্গি খুলে দিয়েছেন…।

সারা পৃথিবীর মানুষ জানে বার্মাতে রোহিঙ্গা মুসলমানরা নির্যাতিত হয়ে দেশ ত্যাগ করেছে। ইউরোপে ধর্মীয় কারণে বিদ্বেষের মিথ্যা অভিযোগসহ রাস্তা আটকে নামাজ পড়ার কারণে পুলিশের হাতে ধরা খাওয়াকেও পুরো কমিউনিটি ইংরেজিতে হেডিং দিয়ে, হ্যাশ-ট্যাগ দিয়ে, প্লেকার্ড লিখে পুরো বিশ্বে ভাইরাল করে জানায়- মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ জুড়ে। সে তুলনায় মুসলিম দেশে বৌদ্ধরা, খ্রিস্টানরা, হিন্দুরা, বাহাইরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে তার কোন প্রমাণ চিহ্নই থাকছে না। ৯০-এর বাবরী মসজিদ ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে চলা ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হামলার পর সে বছর দুর্গাপুজায় লাগামহীন মূর্তি ভাংচুরের প্রতিবাদে ঘটপুজা করে কালো পতাকা উড়ানোর কর্মসূচী বাতিল হয়ে যায়। একসঙ্গে গোটা দেশে কালো পতাকা উড়লে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশের কুকীর্তি জেনে যাবে তাই সরকারের চাপে আর হিন্দু সুবিধাভোগী ক্রিমখোর নেতাদের কারণে সম্ভব হয়নি। ইরানের বাহাই সম্প্রদায়দের প্রতি ইরানী মুসলমানদের নিপীড়ন ও উশকানির অভিযোগ টুইটার এ্যাকাউন্ট বন্ধ করে না দিলে আমরা জানতেই পারতাম না ইরানের ইসলামী শাসনে বাহাই সম্প্রদায় কেমন আছে। যেমন কেউ জানে না আফগানস্থান দেশটা বৌদ্ধদের হওয়ার পরও একজন বৌদ্ধ সেখানে অবশিষ্ঠ থাকল না কেন? কেউ জানে না, ৩০ শতাংশ হিন্দু কেমন করে বাংলাদেশে কয়েক দশকে ৯ শতাংশে মেনে এলো? এবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালে বেলুচরা বিমান উড়িয়ে বিশ্ববাসীকে তাদের প্রতি পাকিস্তানের নির্যাতনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। সারা পৃথিবী জানে না বাংলাদেশের পাহাড়ে নিজেদের জমি কেমন করে হারিয়েছে পাহাড়ী জনগোষ্ঠি। কেমন করে সেখানে বছরের পর বছর সেনাশাসন চলে। কেমন করে আদিবাসী সাঁওতালরা তাদের জমি হারিয়ে বাংলাদেশে তাদের অস্তিত্ব বিলিন হবার পথে। প্রিয়া সাহার অপরাধ এখানেই মারাত্মক কারণ তিনিই প্রথম বাংলাদেশের কুকীর্তি বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন। ইয়াজিদি নারীরা বিশ্ববাসীকে তাদের উপর চলা ধর্ষণ জেনোসাইডের কথা বলে যদি কোন অপরাধ না করে থাকে তাহলে প্রিয়া সাহার কি অপরাধ?

বাংলাদেশের একটা টিভি চ্যানেলে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের একজন নেতাকে আলোচক তিন-চারজন মিলে ধরে জেরা করছে- কেন তারা এখনো প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি! কেন তারা তার বিচার করছে না…। যে লোকগুলো এমন আচরণ করছে তারা সবাই বাংলাদেশে ‘প্রগতিশীল জামাত-শিবির বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের অসাম্প্রদায়িক’ বলে নিজেদের পরিচয় দেন। ইনারা প্রিয়া সাহার বিচার চাওয়ার আগে কি খোঁজ-খবর নিয়েছে অতি সাম্প্রতিককালে ঘটা সাম্প্রদায়িক হামলাগুলোর বিচার বাংলাদেশ করেছে কিনা? ২০১৩ সালে সাথিয়ার বনগ্রামে বাবলু সাহার ছেলে রাজীব সাহার বিরুদ্ধে ইসলাম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ তুলে হাটের দিন শত শত লিফলেট বিলি করে মানুষজনকে উত্তেজিত করে হিন্দুদের উপর আক্রমন করানো হয়। তদন্তে জানা যায় রাজীব সাহা ইসলাম নিয়ে কোন কটুক্তি করেনি। বিএনপি-জামাতের সময় ঘটা এই হামলা নির্যাতনের বিচার পরবর্তীকালের চেতনাবাদী সরকার এসেও করেনি। পুরো সাহাপাড়ায় হামলা চালিয়ে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ধ্বংস করা হলেও কোন বিচার আজ অবদি হয়নি। রামু, মালোপাড়া, নাসিরনগর মত বড় বড় সাম্প্রদায়িক হামলার কোনটিরই বিচার সরকার করেনি। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাতের করা রাষ্ট্রীয সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের ঘটনা কেন পরবর্তীকালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার করেনি? কেন এদেশে হিন্দুদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কেন গ্রামগু্লো থেকে হিন্দুরা ভারতে পাড়ি দিচ্ছে সেই সহজ উত্তরটি না বুঝার কিছু নেই।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে মূলত হিন্দু বিরোধীতা থেকে। পাকিস্তান হবে মুসলমানদের দেশ, হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে থাকলে মুসলমানরা উন্নতি করতে পারবে না তাই পাকিস্তান বানাতে হবে। সেই পাকিস্তান থেকেই বাংলাদেশের জন্ম। বাংলাদেশ বা তখনকার পাকিস্তান আমলের প্রগতিশীল বা ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা হিন্দু বা অন্যান্য জাতি সম্প্রদায়ের কথা ভেবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলতেন না। হিন্দুরা পাকিস্তানে কোন ফ্যাক্টই ছিলো না। প্রগতিশীলদের লড়াই ছিলো পাঞ্জাবী মুসলমানদের সঙ্গে। বাঙালী মুসলমান পাঞ্জাবী মুসলমানের কাছে কেবল অথনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল না, সংস্কৃতিগতভাবে নিশ্চহ্ন হবার অশ্চিয়তায় পতিত হয়েছিলো। নিজের ভাষা ও কালচার রক্ষার জন্য ষাটের দশকে তাই আবার রবীন্দ্রনাথকে ধরে তার জন্মবার্ষিকী পালনের ঘটা লেগে যায়। হিন্দুরা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মত এটা দেখে লাফিয়েছে আর ভেবেছে, পাকিস্তান দর্শন ত্যাগ করে দেশভাগের আগে যেমন বাংলা ছিলো তেমন বাংলাই আবার প্রতিষ্ঠা হবে। মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু হলোকাস্ট হবার পরও, শত্রু সম্পত্তি হিসেবে জমিজমা দখল হবার পরও, ভারতের আশ্রয় শিবির থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ তারা ফিরে এসেছিলো নিজে নিজে ভাবা একটা ভ্রান্ত বিশ্বাসে থেকে…। নাসিরনগর হামলার পর কবি নির্মেলেন্দু গুণ ফেইসবুকে আক্ষেপ করে তাই লিখেছিলেন, আমাগো তো কেউ ডাকে নাই, দেশ স্বাধীন হবার পর দেশে ফিরেছি নতুন বাংলাদেশ পাবার জন্য। আওয়ামী লীগ কইল আয় আয়, আমাগো ভোট দিবি, তয় কোনদিন ক্ষমতার ভাগ চাবি না…। এরকমই ছিলো গুণের দু:খভরা ফেইসবুক পোস্টে। এগুলোই সত্যি কথা। বাকী সময় গুণ সাহেবরা একটা ভান করে থাকেন যে তারা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে মহাসুখে আছেন। পাছে তাদের মুসলিম অনুরাগী আর বন্ধুরা তাদের সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী ভেবে বসে তাই সর্বদা সতর্ক হয়ে কথা বলেন। প্রিয়া সাহার বক্তব্যের পর যেমন বহু সুশীল হিন্দু সতর্ক হয়ে কথা বলছেন যাতে মনে না হয় তিনি হিন্দু বলেই প্রিয়া সাহার পক্ষে কথা বলছেন। সুভাষ সিংহ বলে সাবেক একজন ছাত্রলীগ নেতা টকশোতে ভারতের আসানসোলের একজন ইমামের উদাহরণ দিয়ে বললেন, তিনি নিজের ছেলের হত্যার বিচার না চেয়ে শান্তি চেয়েছিলেন। মানে প্রিয়া সাহার বিচার চাওয়ার বদলে চুপ করে থাকা উচিত ছিলো…।

প্রিয়া সাহার কথা অনেকদিন মনে থাকবে কারণ সে এদেশের স্বঘোষিত ‘অসাম্প্রদায়িকদের’ লুঙ্গি খুলে দিয়েছেন…।