আমরা ভূলে যেতে পারি, কিন্তু তার অবদান ইতিহাসে তাকে চিরসরনীয় করে রাখবে।।

Spread the love
গণিতবিদ এবং সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গের আবিস্কারক ও উচ্চতা নিরূপক
রাধানাথ শিকদার  (জন্মঃ- ১৮১৩ – মৃত্যুঃ- ১৭ মে, ১৮৭০)
১৮৫৩ সালের এক সকাল বেলা। কলকাতার সার্ভে ডিপার্টমেন্ট প্রচন্ড ব্যাস্ত। রাজ্যের ম্যাপ আর চার্ট নিয়ে ত্রিকোনমিতির জটিল সব হিসাব। ইস্ট ইন্ডীয়া কোম্পানীর শাষনামল। কর্নেল ওয়াহ নেতৃত্বে সবাই কাজ করে চলছে। কিছুদিন পর পর সরকারী খরচে অসীমসাহসী ট্রেকার আর মাউন্টেনিয়ারেরা হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে জরীপ করছেন। শোনা যাচ্ছে হিমালয়ে পেরিয়ে রুশরা নাকি আক্রমন করবে। অবশ্য স্থানীয়রা বলছে, হিমালয় দেবতার রাজ্য। তা নাকি অতিক্রম করা অসম্ভব। হিন্দুকুশ থেকে ব্রম্মপুত্র হিমালয়ের ৪টা রেঞ্জ। সর্বোচ্চ চুড়া কাঞ্চন জঙ্ঘা। কিন্তু হিমালয়ের কোন ম্যাপ নেই। সেটা নিয়েই গবেষনা।   ভারত জয়ের প্রায় ১০০ বছর পরে উইলিয়াম ল্যাম্বটন আর স্যার জর্জ এভারেস্ট (সার্ভেয়ার জেনারেল) শুরু করেন দি গ্রেট ট্রিগোনমেট্রিক সার্ভে।

তাতে ভারত বর্ষের খুটি নটি ম্যাপ তৈরি করতে হবে। স্যার এভারেস্টের অনেক প্রিয় পাত্র একজন বাঙ্গালী ক্লার্ক রাধানাথ শিকদার। ১৮১৩ সালে কলকাতার বিখ্যাত জোড়াসাকো তে জন্ম নেন। মাইকেল মধুসুদন দত্তের সমসাময়িক এই গনিত বীদ একই হেয়ার কলেজের ছাত্র। গনিত তার ধ্যান জ্ঞ্যান, গনিতের প্রেমে বিয়ে পর্যন্ত করে ওঠা হয়নি। 
প্রচুর সরকারী অর্থে অসম সাহসী মাউন্টেনিয়াররা এমন জায়গায় যাচ্ছেন যেটা মানুষের কল্পনারো বাইরে। সাথে নিতে হচ্ছে থীওডোলাইট যন্ত্র যেটা একটা ক্যারি করতে ১২ জন শেরপার দরকার হয়। অসম্ভব আবহাওয়ায় বছরে মাত্র কয়েকমাস হিমালয় অঞ্চলে কাজ করা সম্ভব। ১৮৪৯ সালে জেমস নিকলসন হিমালয়ের তেরাই ট্রেক করে ফিরলেন। তার প্রাপ্ত ডাটা গুলো কর্নেল ওয়াহ (স্যার এভারেস্ট রিটায়ার্ড করে লন্ডনে ফিরে গেছেন) হাতে দিয়ে গেলেন। এগুলো নিয়েই গবেষনা। প্রায় ৪ বছর পরে রাধানাথ একদিন অবাক হয়ে টের পেলেন উনি বড় কিছু একটা করেছেন। ৪ বছর ধরে অপ্রয়োজনীয় কিছু ডাটা পরে আছে, সামরিক বা ব্যাবসায়ীক গুরুত্ব নেই দেখে কেউ তেমন ভাবে ঘেটে দেখেনি। হিমালয়ের অনেকগুলো শিখর আছে যেগুলোর কোন নামই নেই। কৌতুহলী রাধানাথ নামহীন এই ৮৯টা শৃঙ্গ নিয়ে হিসাব করতে গিয়ে ১৫ নাম্বার পিকের ফাইনাল হিসাবটা বার বার দেখলেন। ২৯০০২ ফুট। ভুল হয়নি তো। কাঞ্চনজঙ্ঘাতো দুরের কথা পৃথীবীর বুকে এত উচু একটা জায়গা কারো কল্পনায় আসে নি। এত উচু হতে পারবে। রাধানাথ শিকদার ছুটে গেলেন রয়েল রয়েল জিওগ্রাফিক সোসাইটিতে তার বস কর্নেল এন্ড্রু ওয়াহর কাছে। স্যার, পিক নাম্বার ১৫ পৃথিবীর উচ্চতম স্থান। জেমস নিকলসন একবারো বুঝতে পারেনি নেপালের তেরাই (তৃন ছাওয়া একধরনের ভ্যালি) থেকে বাইনোকুলার দিয়ে উনি যেই চুড়াটা দেখেছেন সেটা পৃথিবীর সব রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের ভবিষ্যতে স্বপ্নের তীর্থ। রাতারাতি হৈ হুল্লুর লেগে গেল। কর্নেল ওয়াহ বিদগ্ধ এই গনিতবীদকে হিমালয় রাজের নামকরনের দায়িত্ব দিলেন। পুরো মিশনের মুল পরিশ্রম কারী স্যার এভারেস্টের নামে উনি এর নাম দিলেন মাউন্ট এভারেস্ট।  ১৮৭০ সালে নিখুত ভাবে এভারেস্টের উচ্চতা মাপা এবং পৃথীবীর সকল ট্রেকার, মাউন্টেনিয়ারদের তীর্থভুমী মাউন্ট এভারেস্টের নামকরন করা এই মহান বাঙ্গালী ত্রিকোনমিতিবীদ দেহত্যাগ করেন। 
নামকরনের আগে কর্নেল ওয়াহ রাধানাথকে জিজ্ঞেস করেছিলেন পিক নাম্বার ১৫ এর কোন স্থানীয় নাম আছে নাকি। বাংলায় না থাকলেও তিব্বতী ভাষায় এর নাম ছিল কমুলুংমা, যার অর্থ পৃথীবীর জননী। 
আবিষ্কারের ১০০ বছর পর ১৯৫৭ সালে স্যার হিলারী আর শেরপা তেনজিং এভারেস্ট জয় করেন। দুর্গমতা, চরম ভাবাপন্ন হাই অল্টিচিউড ওয়েদার এবং অনেক ব্যায়বহুলতা (অভিযানের জন্যে নেপাল সরকারকে প্রত্যেক অভিযাত্রি ২৫০০০ ইউ এস ডলার ট্যাক্স দিতে হয়)। এছাড়া প্রতি বছর অসংখ্য অভিযাত্রি প্রান হারায়। সাম্প্রতিক বছর গুলোতে আমাদের দেশের অনেক পটেনশিয়াল ট্রেকার হিমালয়ান ইন্সটিটিউট থেকে মাউন্টেনিয়ারিং এর কোর্স করছে। ইবিসি করা পুরুষ এবং মহিলা অভিযাত্রিকের সংখাও আশা ব্যাঞ্জক।
উনবিংশ শতাব্দীর ১ম ভাগে জরিপ কাজে ব্যবহৃত গণিত বিষয়ে চর্চা প্রয়োগ উদ্ভাবনে তিনি স্বকীয়তার সাক্ষ্য রেখেছেন। এইজন্য তিনি ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছিলেন। তিনি জার্মানির সুবিখ্যাত ফিলজফিক্যাল সোসাইটির ব্যাভেরিয়ান শাখার সম্মানীয় সদস্যপদ লাভ করেন ১৮৬২ সালে। গণিতে অসাধারণ পারদর্শিতার জন্য তাঁর এই সম্মান প্রাপ্তি।

কলকাতার জোড়াসাঁকোতে তাঁর জন্ম। তিনি হিন্দু কলেজে লেখাপড়া করেন এবং  ডিরোজিও র ছাত্র ছিলেন। সংস্কৃত, ইংরেজি, গ্রিক ও লাতিন ভাষা-সাহিত্যে তিনি বিশেষ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। গণিতজ্ঞ টাইটলারের নিকট তিনি উচ্চ গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। ভারতীয় হিসেবে তিনিই প্রথম ত্রিকোণমিতিভিত্তিক জরিপ বিভাগে কাজ করেন (১৮৩২)। জরিপের কাজে জড়িত থাকার সুবাদে ১৮৫২ সালে তিনি হিমালয়ের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আবিষ্কার করেন এবং সার্ভে অধিকর্তা কর্নেল এভারেস্টের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘মাউন্ট এভারেস্ট’। এটি পৃথিবীরও সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। রাধানাথ রচিত Auxiliary Table (১৮৫১) এবং The Manual of Surveying প্রবন্ধ দুটি ভারতীয় সার্ভের মূল্যবান সম্পদ। ১৮৬২ সালে তিনি জরিপ বিভাগের চাকরি থেকে অবসর নেন এবং পরবর্তীকালে জেনারেল অ্যাসেমবিজ ইনস্টিটিউশনের গণিতের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।
রাধানাথ ১৮৫৪ সালে কলকাতা আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট সোসাইটি স্থাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। প্যারীচাঁদ মিত্রের সহযোগিতায় তিনি মহিলাদের জন্য বাংলা ভাষায় মাসিক পত্রিকা প্রকাশ ও যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেন। এতেই প্যারীচাঁদের  আলালের ঘরের দুলাল  উপন্যাসটি প্রকাশিত হয়।
ডিরোজিওর ছাত্র হিসেবে রাধানাথ ছিলেন মুক্তবুদ্ধি ও প্রতিবাদী চেতনার অধিকারী। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধী ছিলেন; অপরদিকে তিনি বিধবাবিবাহ ও স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একজন ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট জনৈক ভারতীয় কুলিকে প্রহার করলে স্বাজাত্যবোধের প্রেরণায় রাধানাথ তার প্রতিবাদ করেন এবং এজন্য আদালত কর্তৃক অর্থদন্ডে দন্ডিত হন (১৮৪৩)। এ ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হলে বিপুল আলোড়নের সৃষ্টি হয়।
১৮৭০ সালের ১৭ মে তাঁর মৃত্যু হয়।
২০০৪ সালের ২৭শে জুন তারিখে ভারতের ডাক বিভাগ চেন্নাইয়ে ভারতের ত্রিকোণমিতিক জরীপের প্রতিষ্ঠার স্মরণে একটি ডাকটিকিট প্রকাশ করে, যাতে রাধানাথ শিকদার এর ছবি প্রদর্শিত হয়েছে।