১২০০ থেকে ১৫০০ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষ ও বাংলা অঞ্চলের পোশাক ও অলংকারে অনেক বেশি পরিবর্তন চলে আসে। এর কারণ ধর্ম পরিবর্তন, বহির্দেশ হতে বণিক- শাসকদের আগমন বাংলাকে এক মিশ্র সংস্কৃতি তে ভরিয়ে তোলে।
.
পাঞ্জাবী পাঞ্জাবের পোশাক। লাদাখ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ঘুরে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এটি ৫০০ বছরের অধিক সময় বাংলায় পরিধেয় হয়ে আসছে। তবে এর আকার আকৃতিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিবর্তন হয়েছে। পূর্বে পাঞ্জাবীর সাথে ধুতি পরা হতো। কারণ ধুতি ছাড়া পরিধেয় কোন পোশাক ছিলোনা।


পরবর্তিতে এদেশে পায়জামা আসার পর পায়জামা ধুতির স্থান দখল করে। বিশেষ করে মুসলিম সমাজে তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কবি কাজী নজরুল ইসলাম পাঞ্জাবীর সাথে সর্বদা ধুতি পরতে পছন্দ করতেন। উল্লেখ্য, পায়জামা একটি ইরানী পোশাক।
.
লুঙ্গি তামিল নাড়ুর পোশাক। শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া সব ঘুরে মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে ১০০ বছরের কিছু বেশিকাল লুঙ্গি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সে সময় রেঙ্গুন থেকে লুঙ্গি আমদানি হতো। একটু অবস্থাপন্ন সৌখিন ব্যক্তিদের কাছে ‘নয়ন সুখ’ নামের সাদা মিহি সুতার এক প্রকার লুঙ্গির খুব কদর ছিল। লুঙ্গির ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে বাঙালী মুসলমান সমাজ হিন্দুদের সাথে বেশভূষার পরিবর্তন ঘটাতে ধুতি পরিত্যাগ করে লুঙ্গীকে নিজেদের পরিধেয় হিসেবে গ্রহণ করে।
.
ভাবছেন তবে চার হাজারের বেশি সময় ধরে যে “বঙাল” বা “বাঙ্গালা” জনপদ গড়ে উঠেছিলো তাদের পোশাক কি ছিলো!
বঙালরা সেলাই বিহীন পোশাক পরতো।
এর কারণ তখনো সুঁই নামক বস্তু আবিষ্কৃত হয়নি। চরকায় বোনা সুতো আর তাঁতে বোনা সেলাইবিহীন মোটা কাপড় ছিলো তাদের পরিধেয়। পুরুষদের পোশাক ছিলো খাটো ধুতি, কাধে গামছা, কখনোবা চাদর, শাল, আর নারীদের শাড়ি।
পরবর্তীতে বাংলায় বিভিন্ন ধর্মের আগমন ও মিশ্রণ ঘটলেও সাধারণ মানুষদের পোশাকে পোশাকের কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এই ছিলো বাঙালী হিন্দু মুসলমানের পোষাক।
.
শাড়ি এখনো টিকে থাকলেও নিত্যকার পরিধেয় আর থাকছে না, পান্তাইলিশের মত আনুষ্ঠানিক পোশাকে এসে ঠেকেছে। ধুতি হারিয়ে গেছে বাংলাদেশ থেকেই। এদেশে লুঙ্গী আসার পর থেকে ধুতি হিন্দুয়ানী পোশাক আর লুঙ্গি মুসলমানদের পোশাক বলে মগজে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এখনও ধুতির নাম শুনলে বাংলাদেশের ৯২/৯৩/৯৪ ভাগ মুসলিমের শুধু দাদাবাবুদের কথা মনে পড়ে, নিজেদের পোশাক কল্পনাও করতে পারেনা। এতটাই মুঢ়তায় ডুবে গেছি আমরা। বাঙালী হিন্দুসমাজেও ধুতি হারিয়ে গেছে। শ্রাদ্ধ, বিয়ে, পূজা ছাড়া এখন আর কাউকে ধুতি পরতে দেখা যায়না, যেন এসব অনুষ্ঠানে ধুতি বাধ্যতামূলক। বাংলা সংস্কৃতির সবচেয়ে পুরোনো পোশাকটিই হারিয়ে গেছে ধর্মীয় বিভেদের জালে পড়ে।
.
পহেলা বৈশাখে যারা বাঙালীয়ানা দেখাতে পায়জামা, পাঞ্জাবী, ফতুয়া, লুঙি পরে বেরুবেন, তারা ঠিক কতবছরের ঐতিহ্য ধারণ করবেন? তাদের পোশাক কি আদৌ বাঙালী পোশাক? নাকি ধার করা সংস্কৃতি?
একইভাবে কোট-প্যান্ট, হাফপ্যান্টও দীর্ঘকাল ধরে বিদেশী বণিকরা এসে বাংলার মানুষকে পরতে শিখিয়ে গিয়েছে তবে সেগুলোকেই বা আজও বাঙালী পোশাক বলা হচ্ছেনা কেন? তারচেয়ে বরং বলুন পোশাকে কি আসে যায়, অন্তরে থাকুক বাঙালীত্ব।।
সূত্র- উকি, মুক্তমনা, আমার ব্লগ নেট।