গণিতবিদ কালিপদ বসু। গনিত শাস্ত্রে কালিপদ বসুর অবদান। কালিপদ বসু, যিনি কে. পি. বসু নামেও পরিচিত, (১৮৬৫১৯১৪) একজন প্রখ্যাত বাঙালি গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানশিক্ষক। তিনি কে. পি. বসু পাবলিশিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা।


উপযুক্ত তথ্য ও উপাত্তের অভাবে কে. পি. বসুর জীবন ও সুকৃতির এমন যুক্তিসিদ্ধ পরিচয় তুলে ধরা যায় না যা বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন পাঠকের অনুসন্ধিৎসা নিবৃত্ত করতে পারে। তাঁর জীবন স্মৃতি আচছন্ন অন্ধকারে নিমজ্জমান এবং যতদূর জানা যায় গণিত শাস্ত্র বিশেষতঃ তাঁর ঐকান্তিক সাধনার বিষয় এ্যালজাবরা বিষয়ে তাঁর অবদানও সংরক্ষিত নয়। তাই ঐতিহ্য সন্ধানী গবেষক,পাঠককে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি বচনে আক্ষেপ করতে হয়:

 

“হে অতীত, তুমি ভূবনে ভূবনে
কাজ করে যাও গোপনে গোপনে।
মুখর দিনের চপলতা মাঝে
স্থির হয়ে কেন রও?
কথা কও, কথা কও।”


অতীতের পূঞ্জীভূত অন্ধকারে কে. পি. বসু আজ দূর আকাশের হৃত জ্যোতি
নক্ষত্রের মতই অনুজ্জল, নিষপ্রভ। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের ঐশ্বর্য ও
প্রতিভার ঔজ্বল্য একদিন সারা বাংলার আকাশকে করেছিল আলোকিত। বীজগণিতের
ক্রমোন্নয়নে তিনি এক নতুন অধ্যায় সংযোজন করেছেন।

বাংলাদেশের এই বিখ্যাত গণিত শাস্ত্রবিদ অধ্যাপক কালিপদ বসু ইংরেজী ১৮৬৫ খৃষ্টাব্দে মোতাবেক ১২৭২ বাংলা সনে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার অন্তর্গত পতিহারি শংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মহিমাচরণ বসু হরিশংকরপুর রেজিষ্ট্রি অফিসের (তৎকালীন ঝিনাইদহের রেজিষ্ট্রি অফিস হরিশংকরপুর গ্রামে অবস্থিত ছিল) একজন সামান্য ভেন্ডার ছিলেন। তাঁর একমাত্র পিতৃব্য চন্দ্র কুমার বসু গ্রাম্য কবিরাজ ছিলেন। জানা যায়, তাঁর পূর্ব পুরুষেরা বরিশাল থেকে হরিশংকরপুরে বসতি স্থাপন করেন।

 

কে. পি. বসুর দুই ভাই ছিলেন। প্রসন্ন কুমার বসু ও রাধিকা প্রসাদ বসু। কিন্তু তাঁর কোন বোন ছিল না। মেজ ভাই প্রসন্ন কুমার বসু (বিএ) তৎকালীন D.L.R- এর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। তাঁর প্রতিভা ও কর্মদক্ষতার গুণে তিনি ‘রায় বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত হন। ছোট ভাই রাধিকা প্রসাদ বসু (M.A.B.L) যশোর জজ কোর্টের একজন খ্যাতনামা আইনজীবি ছিলেন। যশোর সম্মিলনী হাই স্কুলের পূর্ব প্রান্তে আজও তাঁর বসতবাটি বিদ্যমান। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাঁর দুই পৌত্র দখলদার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হন।

 কে পি বসুর বাড়ি
কে পি বসুর বাড়ি

জন্ম ও বাল্যকাল

কে. পি. বসু বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলার হারিশংকরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মহিমাচরণ বসু, যিনি স্থানীয় হরিশংকরপুর রেজিষ্ট্রি অফিসের (তৎকালে ঝিনাইদহ রেজিষ্ট্রি অফিস হরিশংকরপুর গ্রামে অবস্থিত ছিল) একজন সামান্য ভেন্ডার ছিলেন।

শিক্ষাজীবন

গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা সমাপনান্তে তিনি লর্ড রিপন কলেজে ভর্তি হন এবং এখানে থেকে এন্ট্রান্স পাশ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে গণিত শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করেন।

 

কর্মজীবন

পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৮৯২ সালে ঢাকা কলেজে গণিত শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন এবং এখানেই আমৃত্যু কর্মরত ছিলেন।

 

গনিত শাস্ত্রে বসুর অবদান:
আরবীয় বীজগণিত ত্রয়োদশ শতকে ইউরোপে বিশেষতঃ ইটালীতে প্রবর্তিত (Introduced) হয়। আধুনিক এ্যালজাবরা ইউরোপীয় শাসনামলে ভারতবর্ষে আমদানী হয় এবং যতদূর জানা যায়, হান্টার কমিশন (১৮৮২) এর সুপারিশক্রমে তা ভারতীয় শিক্ষাসূচীর অনত্মর্ভূক্ত হয়। এ্যালজাবরা, এমনকি ইউরোপীয় সংস্কার সত্ত্বেও ভারতীয় শিক্ষার্থীদের কাছে ছিল অত্যন্ত দুর্বোধ্য। কে. পি. বসু এই দুরূহ শাস্ত্রের অধ্যয়ন ও অনুশীলনকে অনায়াস ও সহজসাধ্য করেছেন। এ প্রসংগে দীর্ঘদিনের শ্রমসাধ্য গবেষণায় তিনি এ্যালজাবরার বহু বিচিত্র ও জটিল নিয়মকে সহজ প্রণালীতে সূত্রবদ্ধ করেন। বর্তমানে প্রচলিত বহু সূত্র কে. পি. বসুর উদ্ভাবিত। শুধু সূত্র আবিষ্কারই নয় অসংখ্য নতুন অংক উদ্ভাবন করেও তিনি এই শাস্ত্রের কলেবর বৃদ্ধি ও উৎকর্ষ সাধন করেছেন।

 

এসবই কেবল কে. পি. বসুর অবদানের সাধারনী কৃতরূপ। বিজ্ঞ পাঠকের যুক্তিসিদ্ধ কৌতুহল এমন সরল সিদ্ধান্তে নিবৃত্ত হতে পারে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই যে গবেষণা কর্মে প্রয়োজনীয় তথ্য ও উপাত্ত বাংলাদেশে নিতান্তই বিরল। তাছাড়া সময়ের অপ্রতুলতা হেতু তাঁর আজন্মের কর্ম ও সাধনা ক্ষেত্র ঢাকা কলেজ ও তাঁর বর্তমান প্রজন্মের স্থায়ী বাসস্থান কলকাতায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। আবার কে. পি. বসুর এ্যালজাবরা এখন ইতিহাসের অনুষংগ। আধুনিক গণিতজ্ঞরা তাঁর সন্বন্ধে অজ্ঞ ও নিষ্পৃহ। তবে আশা করা যায় যে, কলকাতায় তাঁর যে বংশধর রয়েছেন, তাঁরা তাঁর স্মৃতি ও সুকৃতিতে কিছুটা হলেও সংরক্ষণ করেছেন। 
(পরবর্তীতে এ বিষয়ে বিশদ আলোচনার ইচ্ছে রইল)।

গণিতশাস্ত্রবিদ কালিপদ বসু
গণিতশাস্ত্রবিদ কালিপদ বসু

গনিত শাস্ত্রের ইতিহাস:
গণিত শাস্ত্রের ইতিহাস সুপ্রাচীন ব্যাবলনীয় সভ্যতার সাথে
সম্পর্কযুক্ত। এশিয়া মাইনর ও ব্যাবলনীয় সংস্কৃতি গ্রীক সভ্যতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং এটা নিশ্চিত যে গ্রীক জাতি এই উৎস থেকে বীজগণিতের অনেক মৌলিক জ্ঞান আহরণ করেছিল।

আয়োনীয় (প্রাচীন গ্রীস) বণিকগণ বাণিজ্য ব্যাপদেশে এই সুপ্রাচীন ও অত্যন্ত সম্মানিত ব্যাবলনীয় কৃষ্টির সাথে পরিচিত হয় ও সেখান থেকে গণিত, জ্যামিতি, জ্যোতিষ শাস্ত্র, প্রকৃতি বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান প্রভৃতি শিক্ষাগ্রহণ করে মেধাবী ছাত্রগণের মাধ্যমে তা বিশ্বময় প্রচারিত করেছিল।

 

এই ভাব বিনিময়ের দ্বিতীয় ফল হল গ্রীক দর্শনের সর্বপ্রাচীন শাখা আয়োনীয় সমপ্রদায় (আলেক্স, এ্যানাক্সিমিন, এ্যানাক্সিসেন্ডার প্রমুখ) এর আবির্ভাব। এই আয়োনীয় দার্শনিকগণই পাশ্চাত্য দর্শনকে বিকশিত করার প্রথম প্রয়াস করেছিলেন।

প্রাচ্যে- ভারত, চীন ও জাপানে বীজ গণিতের ক্রমন্নোয়ন বিষয়ে বহু বিসম্বাদ রয়েছে। এই বিসম্বাদ অংশও আবার জাতীয়তার গন্ধ মাখান। এসব দেশের বীজগণিত ব্যাবিলনীয় ও খ্রীস্টীয় পন্ডিতদের দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে হয়।

 

হিন্দু বীজ গাণিতিকদের মধ্যে দু’জনের নাম সর্বিশেষ উল্লেখযোগ্যঃ ব্রহ্মগুপ্ত (৬৩০ খৃঃ) ও ভাস্কর (১১৫০ খৃঃ) ব্রহ্ম গুপ্ত উদ্ভাবিত অনির্দিষ্ট সমীকরণ অনেকাংশে গ্রীক পন্ডিত দিয়া- ফ্যানটাস (Diaphantus) কে ছাড়িয়ে গেছে। ভাস্কর রচিত ‘লীলাবতী’ ও ‘বীজগণিত’ ভারতীয় বীজগণিতের ইতিহাসে দু’টি মাইল ফল। একটা সময়  আরব বিশ্ব গণিত শাস্ত্র অধ্যয়ন ও অনুশীলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। অনেক অংক শাস্ত্রবিদ গ্রীক জ্যামিতি শাস্ত্রের উপর টীকাভাষ্য রচনা করেন। বীজগণিতের তাদের মৌলিক অবদান অসামান্য।

কেপি বসুর বাড়ী ঝিনাইদহের
কে পি বসুর বাড়ী ঝিনাইদহের

আলমাহানী (৮৫০ খৃঃ), তাবিত ইবনে কোরা (৮৭০ খৃঃ), আলহাচ্ছেন (১০০০ খৃঃ) এবং
সর্বোপরি কবি ও গাণিতিক ওমর খৈয়াম (১১০০ খৃঃ) গভীরভাবে এই শাস্ত্র কর্ষণ করেছিলেন। ঘন ফলের সমীকরণ ছিল এ সকল লেখকের প্রিয় বিষয়। সুতরাং বীজগণিত
একটি বহুজাতিক সৃষ্টি।
 

সম্মাননা

ঝিনাইদহ শহরে তার নামে একটি সড়কের নাম ‘কে. পি.বসু সড়ক’ নামকরণ করা হয়েছে।

গ্রন্থাবলী

তিনি বেশ কিছু গণিতশাস্ত্রের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন:

  • এলজাবরা মেড ইজি
  • মডার্ণ জিওমেট্রি
  • ইন্টারমিডিয়েট সলিড জিওমেট্রি

আরও দেখুন