#দেবেন_ঠাকুর_ও_তৎকালীন_ব্রাহ্মসমাজ

দেবেন ঠাকুর সমাজ ত্যাগ করে নতুন সমাজ গঠন করলেন ।আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি সঙ্গে আলোচনা সেনকে কেশবচন্দ্র সেনকে। জনমত
গঠনের জন্য কেশব সেন দীর্ঘ বক্তৃতা দিলেন । সেই সভায় খ্রিস্টান পাদ্রীদের ও আমন্ত্রণ ছিল । কিন্তু পাদ্রীরা কেউ এলেন না ।কৃষ্ণমোহনও  এলেন না ।এলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন এর দিগম্বর মিত্র। তার আগে ৭ ই পৌষ সম্পর্কে কিছু বলা দরকার।

১৭৬৫ সনের 7 পৌষ  বৃহস্পতিবার বেলা তিনটে এর সময় দেবেন ঠাকুর 21 জনকে সঙ্গে নিয়ে ব্রাহ্ম মার্গে দীক্ষা নিলেন। রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত সমাজ ধর্ম সমাজের আকার পেল। এরমধ্যে রামতনু লাহিড়ী উপবীত ত্যাগ করলেন । দেবেন ঠাকুর অবশেষে রামতনু লাহিড়ী কে সমর্থন করলেন । প্রসঙ্গত রাজা রামমোহন রায় উপবিত আজীবন ধারণ করেছিলেন ।এই ভাবেই ব্রাহ্ম সমাজের বিবর্তন ঘটে ছিল ।

ব্যক্তি স্বাধীনতাকে সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেয় ব্রাহ্ম সমাজ।  আর এইখানেই ব্রাহ্মসমাজ হিন্দু থেকে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হবার যে প্রবাহ শুরু হয়েছিল তা খানিকটা রোধ করতে সক্ষম হন।

দেবেন ঠাকুরের ব্রাহ্মসমাজ 500 জন কে প্রতিজ্ঞা পূর্বক ব্রাহ্ম মার্গে দীক্ষিত করেন।

ততদিনে কেশব সেন কলকাতার ব্রাহ্মসমাজের যোগদান করেছেন
। সেদিন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে এলেন কেশব , দেবেন ঠাকুর সবে শিলাইদহ থেকে ফিরেছেন।

মহর্ষি খবর পেয়েছেন নব্য দীক্ষিত কেশব সেন এসেছে । কলকাতায় অনুপস্থিত থাকার সময় দেবেন ঠাকুর কেশব সম্পর্কে অনেক কিছু শুনে ছিলেন । খুব অল্প সময় কি অসাধারণ বাগমী হয়ে উঠেছেন কেশব।

রেভারেন্ড লালবিহারী দে যে ভাবে ধর্মান্তর ঘটাছিলেন , কেশব সেন সেই ধর্মান্তরের প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছেন।

স্নান সমাপ্ত করে উপনিষদ পাঠ করলেন দেবেন ঠাকুর। আজ হাতে সময় বড় কম ।তাই সংক্ষেপে করতে হলো।  তারপর তার রক্তিম লালাভ গায়ের ওপর আলোয়ান খানা জড়িয়ে এলেন কেশব এর কাছে ।

কেশব সেন প্রণাম করলেন মহর্ষি কে। দেবেন ঠাকুর আলোচনা শুরু করলেন। “আমি খুব শ্লাঘা অনুভব করছি, তুমি যেভাবে খ্রিস্টান মিশনারীদের তোমার যুক্তিপূর্ণ চমৎকার জবাব দিয়েছো ।”

হাসলেন কেশব সেন তিনি জানেন দেবেন ঠাকুর অন্তরের গভীর অস্থির হয়ে পড়েছেন। যদিও তিনি তা প্রকাশ করছেন না  । কেশব সেন মৃদুস্বরে বললেন, ” মহর্ষি আলেকজান্ডার ডাফ আমাদের ধর্ম সম্পর্কে কি বলেছেন আপনি জানেন ? ” দেবেন ঠাকুর সবই শুনেছেন তবুও তিনি কেশব সেনের মুখ থেকেই শুনতে চান ।বললেন ” বল যুবক তপস্বী।”

“The Bhrambho samaj is a power of no mean of order in the midst of us” কেশব বললেন।

মৃদু হেসে মহর্ষি বললেন , ” এতে আমি খুব আশ্চর্য হইনি … এ আমাদের উপাসনা শক্তির ফল।”
কেশব বললেন , ” কিন্তু মহর্ষি পৃথিবীতে যে ধর্ম প্লাবন চলছে তার সঙ্গে আমাদের ব্রাহ্মসমাজের কোনো যোগ নেই ….”

কোন কথা অপছন্দ হলে মহর্ষি দেবেন চোখ বুজে থাকতেন। কেশব সেন গতিশীলতা পছন্দ করেন । তিনি দেবেন ঠাকুরের মনোভাব গ্রাহ্যের মধ্যে আনলেন না । বরংবলে যেতে থাকলেন, ” থিওদর পারকার এবং নিওম্যানের দর্শন চিন্তা আমাদের সমাজে আলোচনা হওয়া উচিত ।”

ঠাকুর এবার স্পষ্ট বিরক্তি প্রকাশ করলেন , “এ ধরণের আলোচনা ধর্ম সাধনের একমুখীনতাকে বিনষ্ট করে ।আমি বিশ্বাস করি ধর্ম মতে একদেশদর্শাতে।

কেশব বললেন, ” আমরা খুব কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছি ….আমাদের মধ্যে কোথায় যেন  সংকীর্ণতাথেকে যাচ্ছে।”

মুখমন্ডলে বিরক্তির রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠলো দেবেন ঠাকুরের।” তুমি কি চাও কেশব ?”

কেশব চন্দ্র সেন বললেন , “বাংলা , বোম্বাই, মাদ্রাজে ধর্ম সমাজ গুলির মধ্যে আমি এক যোগসুত্র স্থাপন করতে চাই।”

বলে উঠলেন মহর্ষি, ” আমি এখনো আচার্য রয়েছি কেশব ।এই ধরনের সিদ্ধান্ত আমার অনুমতি ব্যতিরেকে হতে পারে না ।”

সংযত হলেন কেশবচন্দ্র সেন …..

এদিকে দেবেন ঠাকুর ও বুঝতে পারছেন
আচার্য এর  পদ থেকে তার সরে আসা আবশ্যক । তিনি হঠাৎ সেই মুহূর্তেই কেশবচন্দ্র সেন কে আচার্য রূপে অভিষিক্ত করবেন বলে অঙ্গীকার করলেন।

কেশব সেন কেঁপে উঠে তখন বললেন “আপনি আমাকে পৃথক করে দিতে চাইছেন ….আপনি থাকতে আমি আচার্য হতে পারিনা…..”

ম্লান হাসলেন দেবেন ঠাকুর । বাকি সময় চুপ করে রইলেন ।এর কিছুদিন পরে কেশব সেন ভারতবর্ষ ব্রাহ্মসমাজ তৈরি করলেন।

“একঙ সৎ বিপ্রা বহুদা বিদন্তি।” ঋগ বেদের এই কথাটি নিজের জীবনের সত্য করে গিয়েছিলেন রাজা রামমোহন রায় । পরমব্রহ্ম উপাষণাকারী, জাত পাত বিহীন হিন্দু সমাজ ।

নিজের জমিদারিতে গিয়েও দেবেন ঠাকুর ধর্মসভা করেন ।তিনি অনেক দিন আগেই মহর্ষি হয়েছেন । ফলে তিনি বস্তু চিন্তা থেকে মুক্ত হতে চাইছেন। প্রজারা তার দেখা পায় না। একমাত্র ব্রাহ্ম দীক্ষা নিলে মহর্ষির দেখা পাওয়া যায় ।তবে সেই ব্রাহ্ম মনে, চেতনায় না এলে দীক্ষা দেন না তিনি…….

তারপর? হিন্দু সমাজে রেনেসাঁ আসবে?……

তথ্যঃ

ধর্মান্তর