একটা ক্যাপসুল-স্টেটাসে বাঙালির প্রাচীন ইতিহাসের টাইমলাইন ভরে দিলে কেমন হয়? ব্যস্ত মানুষদের জন্য?

১। আনুমানিক ২০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ। পাণ্ডু রাজার ঢিবি, বর্ধমান। হরপ্পা মহেঞ্জোদাড়োর সমসাময়িক, অর্থাৎ সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতার সমসাময়িক। টাউন প্ল্যানিং। প্রাসাদ। ড্রেইনেজ সিস্টেম। পাকা রাস্তা। প্রচুর মাতৃকামূর্তি পাওয়া গেছে। বহির্বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে, সামুদ্রিক বাণিজ্য করতেন ওঁরা। ভূমধ্যসাগরের ক্রীট দ্বীপের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ মিলেছে।

২। চন্দ্রকেতুগড়। আনুমানিক ৮০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ থেকে ২০০ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত এখানেই সম্ভবত গ্রীক ঐতিহাসিকদের গঙ্গারিডাই, যাদের রণহস্তীর বীরত্বের কথা শুনে ভয়ে আলেকজান্ডারের সেনাবাহিনী আর ভারতজয়ে উৎসাহী হয়নি। রোমান কবি ভার্জিল গঙ্গারিডি বীরত্বের কথা বলেছেন, প্লিনি উল্লেখ করছেন। রোমের সমস্ত সোনা চলে যেত গঙ্গারিডি দেশ থেকে পিপ্পলী কিনতে, এমন আক্ষেপ রোমান নথিতে মিলছে। পিপ্পলী সেযুগের সবথেকে দামী আন্তর্জাতিক মশলা। চাণক্য বলছেন বঙ্গ ও পৌণ্ড্র দেশের বিখ্যাত কৃষিজ পণ্যের কথা, মশলা ছাড়াও আরও অনেক কিছু রফতানি হত।

৩। তাম্রলিপ্ত। ভারতের অন্যতম, বাংলার সবথেকে উল্লেখযোগ্য সমুদ্রবন্দর। আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৬০০ থেকে পালযুগ পর্যন্ত টিঁকে ছিল। বিজয়সিংহ এই তাম্রলিপ্ত থেকেই ভেসে পড়েন, শ্রীলঙ্কায় পা রাখেন যেদিন বুদ্ধের দেহাবসান হয়, এমনটাই সিংহলী পুরাণ মহাবংশ ও দ্বীপবংশ জানাচ্ছে। বুদ্ধদেব গৌড়ীলিপি শিক্ষা করেছিলেন। গৌড়ের নিজস্ব লিপি ছিল। গৌড়ের নিজস্ব কাব্য এস্থেটিক্স ছিল, গৌড়ী রীতি বলা হয়।

৪। পুণ্ড্র। যে কয়েকটি জাতি একত্রে মিশে গিয়ে আজকের বাঙালি, তাদের মধ্যে পুণ্ড্র অন্যতম। আজকের পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়রা এঁদের বংশধর। মহাভারতের যুগেও পৌণ্ড্র ছিল। আশ্চর্য, কোনও পুরাণে পৌণ্ড্ররাজ্যের কাহিনী নেই, এরা ব্রাত্য ছিলেন বলেই। গঙ্গারিডি সভ্যতার সমসাময়িক তো বটেই, মহাভারতের যুদ্ধের সমসাময়িক হলে আরও প্রাচীন। সম্ভবত আজকের বাংলাদেশের মহাস্থানগড়ে ছিল পুণ্ড্রনগর, মৌর্যলিপিতে পুণডনগদল। এর ব্যাপ্তি উত্তর থেকে দক্ষিণ বাংলা অবধি। সম্ভবত পাণ্ডু রাজার ঢিবিও এই পুণ্ড্র সভ্যতার অন্তর্গত ছিল, হুগলী জেলার পাণ্ডুয়াও, বাংলাদেশের পাবনাও সম্ভবত এই পুণ্ড্র সভ্যতারই নাম বহন করে। চাঁদ সদাগরের সপ্তডিঙার যে বর্ণনা আমরা পড়ি, তা সম্ভবত খ্রীষ্টপূর্ব যুগে বাঙালির বাণিজ্যের প্রাচীন স্মৃতি, কারণ চাঁদের বাড়ি এই মহাস্থানগড়েই ছিল, বর্তমানে বাংলাদেশের বগুড়া জেলা।

৫। খ্রীষ্টপূর্ব যুগে (খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০) নন্দ এবং খ্রীষ্টপরবর্তী যুগে গুপ্ত (৩০০ খ্রীষ্টাব্দ), দুটি সাম্রাজ্যের স্থপতিই পুণ্ড্রের লোক ছিলেন। বাঙালি। মগধের সভ্যতা বাঙালির দ্বারাই বারবার নিয়ন্ত্রিত। শশাঙ্ক, পালযুগে, সেনযুগে।

৬। গৌড়ের উত্থান। সম্রাট শশাঙ্ক। কর্ণসুবর্ণ। ৬০০ খ্রীষ্টাব্দ। মগধ, কলিঙ্গ বাঙালির নেতৃত্বে শাসিত। শশাঙ্ক সদ্গোপ ছিলেন বলে একটা প্রবাদ চালু আছে সদ্গোপদের মধ্যে। নৃতাত্বিকেরা বলেন, বাংলার কায়স্থ এবং বাংলার সদ্গোপ, এরা আদি বঙ্গজনের (অ্যালপাইন/অবৈদিক আর্য) সবথেকে বেশি প্রতিনিধিত্ব করেন।

৭। মাৎস্যন্যায়। গোপালের উত্থান। পালযুগ। ৭৫০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দ। পৃথিবীর ইতিহাসে এত দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব খুব কম রাজবংশই করতে পেরেছে। ধর্মপাল ও দেবপালের সাম্রাজ্য পশ্চিমে যথাক্রমে রাজস্থান ও আফগানিস্তান, এবং দক্ষিণদিকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, পূর্বে কামরূপ পর্যন্ত। মহীপাল আরেকজন শক্তিশালী রাজা। শেষ শক্তিশালী পাল নৃপতি রামপাল, ইনি কৈবর্ত বিদ্রোহ দমন করেছিলেন। চর্যাপদ এই পালযুগের রচনা।

৮। পুণ্ড্রের নাম এই পালযুগ থেকেই বরেন্দ্রভূমি, এবং এখানে কৈবর্ত বিদ্রোহ হয় দিব্বোক এবং ভীমের নেতৃত্বে (আনুমানিক ১০৭৫ খ্রীষ্টাব্দ)। উত্তরবঙ্গে/উত্তর বাংলাদেশে ভীমের জাঙ্গাল, ভীমের পান্তি – এখনও কৈবর্ত রাষ্ট্রের স্মৃতি বহন করছে।

৯। সেনযুগ। রামপালের জীবনী রামচরিতে পালসাম্রাজ্যের সামন্ত শ্রীবিজয়ের উল্লেখ মেলে, ইনিই বিজয়সেন, বল্লালসেনের বাবা। বল্লালের পুত্র লক্ষ্মণসেনের সময়ে বখতিয়ার খিলজির অতর্কিত আক্রমণে পশ্চিমবঙ্গের আড়াইখানা জেলা তুর্ক-আফগান হানাদারদের দখলে চলে যায়। আনুমানিক ১২০০ খ্রীষ্টাব্দ। সেনসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল কামরূপ, উড়িষ্যা, মগধ। গয়া তো ছিলই, এমনকি প্রয়াগ পর্যন্ত লক্ষ্মণসেনের নৌসেনার অধিকার। কৈবর্তদের সঙ্গে সেনসাম্রাজ্যের সুসম্পর্ক এই নৌদক্ষতার কারণ। লক্ষ্মণসেনের দুই পুত্র, কেশব ও বিশ্বরূপ, এঁরা গর্গযবনান্বয়প্রলয়কালরুদ্র উপাধি নিয়েছিলেন। গর্গ মানে এখানে কি? বলা হয় গর্গ হল গারঝা নামে একটি তুর্কো-আফগান হানাদার ট্রাইবের সংস্কৃতকৃত নাম। পূর্ববঙ্গে সেনদের অধিকার আরও একশো বছর টিঁকে ছিল। মধুসেন নামে এক সেনরাজার উল্লেখ মেলে ১২৮৯ খ্রীষ্টাব্দে।

প্রাচীন যুগের ক্যাপসুল এই পর্যন্ত। এর পরে মধ্যযুগ আর আধুনিক যুগ, পরে কখনও দেওয়া যাবে।