কোথায় গেল হিন্দু হোটেল ?

অতীতের আনন্দ-বেদনার বিষয়গুলো হয়তো সব সংবেদনশীল মানুষকেই স্মৃতি কাতর করে তোলে এবং এ নিয়েই মানুষ ভীষণ নস্টালজিয়ায় ভূগে । আমিও ভুগি এবং প্রচন্ড মাত্রায় ।

প্রায়ই ভাবি, বাংলাদেশে আগে সবখানেই দেখা যেত বড় আকারের হিন্দু হোটেল এর সাইনবোর্ড । এটা দেখা যেত  রাজপথের বিশেষ স্থান ছাড়াও প্রায় প্রতিটি রেল স্টেশনের সাথে ।

এতে পেটুক  মুসলিম যাত্রীরা জাত-পাত বিচার না করে ঢুকে পড়তো তৃপ্তিদায়ক রান্নায় হিন্দু স্টাইলের বিশেষত্বের জন্যে । পাশাপাশি থাকতো মুসলিম হোটেল এর সাইনবোর্ড । তবে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া মুসলিম পেটুকদের কাছে হিন্দু হোটেলই ছিল বেশি জনপ্রিয় ।

ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমরা উত্তরবঙ্গের বন্ধুরা ছুটিতে যখন দল বেঁধে ট্রেনে ঢাকা/উত্তরবঙ্গ যাওয়া আসা করতাম, তখন বাহাদুরাবাদ, ফুলছড়ি, জগন্নাথগঞ্জ, নগরবাড়ি ঘাট পার হওয়ার আগে কিংবা পরে ঘাটের দু পাশে সারিবদ্ধ অস্থায়ী ছাপড়া হোটেলগুলেতে নদী থেকে তুলে আনা বড় বড় জ্যান্ত মাছের রান্না করা পেটি আর মাথা খাওয়ার লোভটা কেউ সংবরন করে যেতে পারতাম না গন্তব্যে ।

গঙ্গা জলের মত পাতলা ঝোল সহ বাড়তি মসলাপাতি ছাড়া সাদামাটাভাবে রান্না করা তাজা মাছের স্বাদটাই ছিল অনন্য । সে এক অবিস্মরনীয় স্মৃতি ।

তবে জংশনে পৌঁছে ট্রেন বদলের জন্যে স্টেশনে  বসে যে দীর্ঘক্ষণ
বিরক্তিকর  অপেক্ষা করতে হতো, তার উপশম ঘটাতো এই হিন্দু হোটেল ছিল পরম নির্ভরযোগ্য , স্বস্তি ও আরামদায়ক ।

যাত্রীদের জন্যে রাতভর খোলা এই হোটেলে যে আদর যত্ন করে তারা  কাঁসার থালিতে জামাই আদরের মত করে খাবার নিজ হাতে তুলে দিয়ে খাওয়াতো , সে অনির্বচনীয় সুখস্মৃতি গুলো এখন ভাবতে গেলেই বেদনা আর হারানো স্মৃতির  হাহাকারবোধে চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়ে ।

এত দ্রুত কোথায় হারিয়ে গেল আমাদের সেই সোনালী দিনগুলো ?
এই নস্টালজিয়া কী সবাইকে এভাবে কষ্ট দেয় ?

স্টকহোল্ম,২০১৭,০৭,১২