“গান্ধার রাজ্য”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

মহাভারত আগে না ‘ঋকবেদ’ আগে এ নিয়ে বিচার করতে বসে লাভ নেই। কারন এক দল পন্ডিত তো মহাভারতকে গাজাখুরি গল্প বলে ঊড়িয়েই দেন। তাদের সংগে এই তর্ক যুদ্ধে যাবার কোনো প্রয়োজন দেখিনা,কারন কোনো প্রমান আমার কাছে নেই। আমি জানি মহাভারতের সময় ৫০০০ বছর আগে। পন্ডিতেরা বলেন, বেদের সংকলন হয়েছে ৩০০০ বছর আগে, অর্থ্যাত আলেকজান্ডারের ভারতে আসার মাত্র ৬০০ বছর আগে। তাহলে দন্ধ তো লেগেই গেলো।
মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্র গুপ্ত এবং কৌটীল্য আকেকজান্ডারের সমসাময়িক। তাহলে কি এটাই ধরে নিতে হবে যে ঋকবেদের সুক্ত গুলো যারা লিখেছিলেন তারা চন্দ্রগুপ্তের মাত্র ৬০০ কি ৭০০ বছর আগেই সেই ভোলগা নদীর তীর থেকে এতো দূরে এসে যাযাবর জীবন থেকে বেরিয়ে,ঘোড়াদের ঘাস খাওয়ানো বন্ধ করে, ক্ষত্রিয় সেজে, বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বিগ্রহ করে, ভারতে বসবাস কারী সমস্ত আদিবাসীকে মেরে “আর্যাবর্ত” প্রতিষ্ঠা করেন ? (স্কুলের ইতিহাসে আর্য্যদের ভারত আক্রমন পড়ে বড়ো হয়েছি তাই এখন এই সব ভাবতে বড়ো অদ্ভুত লাগে। মনে হয় গাজা খেয়ে কারা লিখছেন, সনাতনিরা না হিন্দু বিদ্বেষীরা )।

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্য যদি আলেকজান্ডারের সমসাময়িক হন, তাহলে মৌর্য্য বংশের আগে “নন্দ বংশ” ভারতে (মগধ) রাজত্ব করেছে বহুদিন ধরেই। তা সেই ‘নন্দ বংশ’ র ইতিহাসে তো এমন টা লেখা থাকবে যে ওদের বাপ ঠাকুরদারা ঘোড়া চরাতে চরাতে ভারতে এসে পড়েছিলো এবং সেই যাযাবর জীবন ছেড়ে ক্ষত্রিয় শৌর্য বীর্য পেয়ে সারা ভারত জয় করে “আর্য্য” সেজে বসে গিয়েছিলো।

মুশকিল কি জানেন??? মিথ্যা বলা বা লেখা যাদের ব্যাবসা, তারা নানা সময়ে নানা কথা বলে এবং লেখে। একের সংগে অন্যের , আগের সংগে পরের দন্ধ লাগবেই ,আর সব মিত্যা প্রমানিত হবে। শুধু সময়ের অপেক্ষা।

ঋক বেদেই প্রশংষা করা আছে “গান্ধার রাজ্য” এর পশম শিল্পের কথা। তাহলে গান্ধার রাজ্য ঋক বেদ লেখার আগেই বর্তমান ছিলো। যযাতির বংশধর, ‘অরুদ্ধ’ র পুত্র ‘গান্ধার’ এই রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। এই বংশের রাজা দ্রুহু, ঋকবেদের সমসাময়িক এক বিখ্যাত রাজা ছিলেন। তাহলে এই দাঁড়ায় যে, গান্ধার রাজ্য ঋকবেদের থেকেও পুরানো। তক্ষশিলা এবং পুষ্কলাবতী এই দুটি শহরের নামকরন অযোধ্যার রাজপুত্র ‘ভরত’ এর (শ্রীরাম চন্দ্রের ভাই) দুই ছেলে ‘তক্ষক এবং পুষ্কল এর নামে। তক্ষক হিন্দুকুশ পার হয়ে উত্তরাপথ অঞ্চলে (পামীরের উত্তরে) তার রাজ্য স্থাপন করেন, তার নামেই ছিলো ‘তক্ষক খন্ড’ বা বর্তমান “তাসখন্দ’ (তক্ষক খন্ড=তকসক খন্ড=তাসখন্দ) উজবেকিস্তানের রাজধানী। পুষ্কল বর্তমান রাজস্থানের ‘পুষ্কর হ্রদ/তীর্থ’র আশ পাশ অঞ্চলে তার রাজধানী স্থাপন করেন। কিন্তু তিনিও হিন্দুকুশ পার হয়ে পশ্চিমে, বর্তমান ব্যাক্ট্রিয়া অঞ্চল (অক্সাস বা আমুদরিয়া নদীর তীর অঞ্চল) দখল করেন। সেখানে কেওটি রাজধানী স্থাপন করেন, যার নাম ‘পুষ্কলাবতী’। আলেকজান্ডার যখন ভারত আক্রমন করেন,তখন এই পুষ্কলাবতীর শাসিকা (এই রাজ্য তখন অস্তিনয়না নামে এক জাতির রাজ্য ছিলো। অস্তিনয়না রা স্ত্রী শাসিত হিসাবে পরিচিত ছিলো। আলেকজান্ডারকে সেই স্ত্রী শাসিত অস্তিনয়নাদের সংগে যুদ্ধ করতে হয়। তারা বিনা যুদ্ধে আত্ম সমর্পন করেনি, যদিও পরাজিত হয়।

এই রাজ্য সিন্ধু নদী বিধৌত ছিলো। তক্ষশিলা বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন সময়ের অতি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো। পানিনি এবং কৌটীল্য (চানক্য) দুজনেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যা লাভ করেছিলেন। একথাও আজ জানা যাচ্ছে যে যীশু ও এই তক্ষশীলা তে বেশ কিছুদিন বিদ্যা লাভ করেছিলেন। বর্তমান কাশ্মীর (পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীর সহ), পাকিস্তানের পেশোয়ার (পুরুষ পুর), রাওয়ালপিন্ডি জেলা এবং আফগানিস্তানের কান্দাহার প্রদেশ নিয়ে এই বিশাল রাজ্যের বিস্তৃতি ছিলো। মগধের রাজা বিম্বিসার, খ্রীষ্টপুর্ব ষষ্ট শতব্দীতে রাজত্ব করেছেন। পানিনি তার অষ্টাধ্যায়ী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে,গান্ধারের এক রাজা ‘পূক্ষসতী’ তার সমসাময়িক ছিলেন । পৌরানিক প্রশস্ত রাস্তা যা কিনা হিন্দুকুশের ওপর দিয়ে ছিলো, তার নাম পুরানে আছে ‘উত্তরাপথ’ নামে। সেই রাস্তা গান্ধার রাজ্যের মধ্য দিয়েই গিয়েছিলো। সেই জন্য ব্যাবসা বানিজ্যের এক বিখ্যাত কেন্দ্র হিসাবে গান্ধার অতিবিখ্যাত ছিলো। গান্ধার রাজ্য তাই বৈদিক, সনাতনী, এক সুপ্রাচীন হিন্দু রাজ্য ।।

যারা বলেন, রামায়ন, মহাভারত বা পুরান (পুরানো দিনের ইতিহাস= সনাতনি ইতিহাস) সব মিথ্যা, তাদের কাছে একটাই প্রশ্ন। সেটা হলো, এতোগুলো মিথ্যা কথা ,বেশ বহু হাজার বছর ধরে কি করে চলে আসছে ???? সনাতনি হিন্দু দের ইতিহাস তো লেখাই আছে ,পড়ে আছে আমাদের সামনে। একটু পড়ে দেখলে, বিচার করলে ক্ষতি কি???? নাকি, ভারতবর্ষ থেকে হিন্দু নাম টাই মুছে দেবার চক্রান্তের এটাই ধরন যে, শুধু তাদের ধর্ম পরিবর্তন করলেই চলবে না, ওদের উন্নত সভ্যতার ইতিহাস টাও মুছে দিতে হবে??????

কিন্তু পারবেন কি?????? সনাতনি ইতিহাস সত্যের ইতিহাস। অনেকটা সময় চলে গেছে, হয়তো কিছু অদল বদল ঘটেছে। তাই বলে সব টাই অস্বীকার করে তাকে একেবারে মুছে দেওয়া যাবে না। মিথ্যার ঝুড়ি দিয়ে সত্যকে চাপা দেওয়া যায় কিছু দিনের জন্য, চিরদিনের জন্য নয়।।