Home Bangla Blog ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার (৫)

ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার (৫)

253
(পঞ্চম কিস্তি) ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম সুপারস্টার (৫)
KANAN DEVI: THE FIRST SUPERSTAR OF INDIAN CINEMA
তেইশ বছরের তরুণী কানন দেবী চেয়েছিলেন, জীবনটাকে শুদ্ধ ও সুন্দর  ভাবে গড়ে তুলতে। তখনকার সমাজ নিদারুণ আঘাত করেছিল কাননের প্রথম প্রেমকে। সেই পরম পাওয়ার আনন্দসুধা অঞ্জলি ভরে পান করার সৌভাগ্য ছিল না তার। 

১৯৪০ সালে কানন দেবী বিবাহ করেন প্রখ্যাত ব্রাহ্মসমাজী শিক্ষাবিদ ও জ্ঞানী ব‍্যক্তিত্ব হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের পুত্র অশোক মৈত্রকে। ভিক্টোরীয় শুচিতার প্রতীক হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের পুত্রের সঙ্গে বিয়ে নিয়ে সখেদে কানন দেবী লিখেছেন ‘সমাজ আমাদের মিলনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সম্ভ্রমের বরণডালা দিয়ে বরণ করেনি। … আমাদের দুঃসাহসের সাক্ষী হয়েছে, কিন্তু উৎসবের আলো জ্বালিয়ে একে অভিনন্দিত করেনি …। আজও মনে পড়ে, বারান্দায় দাঁড়াতে সাহস করতাম না, পাছে কারো কোন বিরূপ মন্তব্য কানে আসে। নানান কুরুচিপূর্ণ কদর্য ভাষার প্যামফ্লেট ছাপিয়ে উঁচু স্বরে হেঁকে বিক্রি হ’ত আমারই বাড়ির সামনে …।
নিঃসম্বল অসহায় একটা মেয়ে। কত ঝড় তুফান পেরিয়ে ছুটছে আর ছুটছে। কিন্তু তার সেই বিরামহীন চলা, গ্রন্থিহীন তপস্যার এতটুকু মূল্য কেউ কোনদিন দেয়নি। চেয়েছে তাকে ব্যর্থতার সমাধিতে নিশ্চিহ্ন করে দিতে” (‘সবারে আমি নমি’)। সে বিবাহ স্থায়ী হয়নি, বেশিদিন টেকেনি। 
তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজ প্রবল নিন্দাবাদ জানিয়ে ছিল বংশগৌরবহীন একজন চিত্রাভিনেত্রীর সঙ্গে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের বিবাহে। স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাদের বিবাহে আশীর্বাদ-বাণী ও প্রীতি উপহারস্বরূপ একটি ছবি পাঠিয়ে নিদারুণ সমালোচিত হয়েছিলেন। এক চিত্রভিনেত্রী রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষর করা ছবি পাবে কেন! বিয়ের সময় কাননের  সাথে শর্ত ছিল, বিবাহের পর চিত্রাভিনয় ত্যাগ করতে হবে। ব্যক্তিত্বময়ী কানন দেবী সম্মত হননি। 
১৯৪৫ সালে কানন দেবী তার প্রথম স্বামীর অশোক মৈত্রের সঙ্গে বিবাহ-বিচ্ছেদ নেন। বিবাহ-বিচ্ছেদের যন্ত্রণা সত্ত্বেও প্রথম স্বামীকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন, অন্ধকার থেকে  আলোয় ফিরিয়ে এনে তাকে প্রথম সামাজিক মর্যাদা দেওয়ার জন্য।
পরবর্তীকালে, অশোক মৈত্রের দিদি রানী মহলানবিশ এবং তার স্বামী প্রখ্যাত পরিসংখ্যাতত্ত্ববিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ কিংবা অশোকের মা প্রাক্তন শাশুড়ি কুসুমকুমারী দেবীর সঙ্গে কাননের অন্তরঙ্গতা ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিন্দুমাত্র ঘাটতি ছিল না ।
কানন দেবীর জীবন সংগ্রাম, প্রেম ও বিবাহিত জীবন নিয়ে অনেক কাহিনি জানতে পারা যায় শঙ্করলাল ভট্টাচার্যের রচনায়। তিনি লিখছেন, ‘কানন দেবী তাঁর আত্মজীবনীতে একটিবার নামই উচ্চারণ করলেন না – তার প্রথম স্বামী অশোক মৈত্রের! এক অতীব অকিঞ্চিৎকর পরিস্থিতি থেকে এই বিয়ে হয়েছিল আভিজাত্যে ওঠার এক স্বর্গীয় সিঁড়ি। কারণ শ্বশুরবাড়ি মৈত্র পরিবার ছিল বাঙালি সমাজের ক্রেম দ্য ল্য ক্রেম। মান্যতার ফিরিস্তিটা একবার শুনুন।’… কানন দেবীর স্বামী অশোক মৈত্র অক্সফোর্ড ফেরত। দেশে ফিরে বিখ্যাত বিশ্বভারতীতে অধ‍্যাপনা শুরু করেছেন। তার পাশাপাশি তখন সেখানে পড়াচ্ছেন বলরাজ সাহনি। অশোকের বোন রানীর বিয়ে হয়েছিল প্রখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশের সঙ্গে। আর অশোকের বাবা? তিনি এক মহৎ পরিচয় ও বৃহৎ সমস্যা। তিনি ব্রাহ্ম সমাজের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা ও সিটি কলেজের অধ্যক্ষ হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। হেরম্বচন্দ্র সম্পর্কে চমৎকার গল্প আছে শিক্ষিত মহলে। তার একটা হল, তিনি শ্যামবাজারের রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। এক ছোকরা ওঁকে সামনে পেয়ে জিজ্ঞেস করল, “স্যার, স্টার থিয়েটারটা কোন দিকে?’’ থিয়েটার হলের খোঁজ চাওয়ায় রাগে গজগজ করে হেরম্বচন্দ্র বললেন, ‘জানি না!’ বলেই তিনি হেঁটে চললেন। খানিক গিয়েই দোটানায় পড়লেন, নীতিবাদী অধ্যাপক। সে কী, একটা নির্দেশ দেবেন না বলে মিথ্যে বললেন! সঙ্গে সঙ্গে পিছনে ফিরে ছোকরাকে গিয়ে ধরলেন আর বললেন, সেই নীতিবাদী টোনে, ‘‘জানি, কিন্তু বলব না!’’ 
হেরম্বচন্দ্র মৈত্রের অন্য গল্পটাও অদ্ভুত। কলেজে অপূর্ব নিষ্ঠা ও আবেগে ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ান অধ্যাপক। হঠাৎ এক দিন কবির জীবনীতে হোঁচট খেলেন একটি তথ্যে – ওয়ার্ডসওয়ার্থ তার সৎবোন অগাস্টার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত ছিলেন! 
ব্যস, সে দিন থেকেই তিনি তার প্রিয় কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতা পড়ানো বন্ধ করে দিলেন।
বলা বাহুল্য, জীবনের শেষ দিন অবধি কানন দেবীর সঙ্গে পুত্রের বিবাহ মেনে নেননি হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। তাই ওঁর জীবিতকালে অশোক, কাননের সম্পর্ক থাকলেও বিয়ে হয়নি। অশোক ও কাননের প্রথম আলাপও যেন বায়োস্কোপ থেকে তোলা।
অশোক মৈত্র শান্তিনিকেতনে পড়ান। আর ফুরসত পেলেই কলকাতা চলে আসেন ফুর্তির খোঁজে। সাহেবি আমলের কলকাতা বলে কথা! অশোক রাইফেল হাতে পাকা শিকারি। এক সময় তার মন চলে গেল প্রণয়ের শিকারে। তার কল্পনা ও আবেগ জুড়ে তখন একটাই মুখ, একটাই মানুষ – তিনি কানন দেবী! তো একবার কলকাতা সফরে অঢেল পান-হল্লার পর নেশায় চুর অশোক বলেই দিলেন, ‘‘এখন এই সন্ধ্যায় চাওয়া-পাওয়ার কী-ই বা বাকি রইল, শুধু কাননকে পাশে পাওয়া ছাড়া।’’ 
সঙ্গীসাথীরা বন্ধুর এই বাসনাটুকুও বাকি রাখতে চায়নি। তাই তাকে প্রায় বেহুঁশ অবস্থায় বৌবাজার পল্লীর কাপালিতলায় রেখে চম্পট দেয়। সেই সুদর্শন, সুবেশ, মদিরা-নেশায় অচেতন পুরুষটিকে বাড়ির বাইরে ভোরবেলা আবিষ্কার করেন কাননই। ওঁর মাথাটা তুলে নিয়েছিলেন নিজের কোলে। আধো ঘুম ও খোঁয়ারির মধ্যে চোখ মেলে নায়িকাকে দেখে অশোকের মনে হয়েছিল তিনি স্বপ্নেই আছেন। কানন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘‘আপনি কে? কেমন করে এখানে আসা হলো?’’ 
অশোক তখন নাকি চোখ মুদে বলেছিলেন, ‘‘চলে যান, স্বপ্ন ভাঙবেন না। আমি এখন কানন দেবীর সঙ্গে আছি।’’ 
বলা বাহুল্য, এর পর অশোক-কাননের প্রেম দানা বাঁধতে সময় নেয়নি। কিন্তু বিয়ে করা যাচ্ছে না, চিনের প্রাচীরের মতো সম্মুখে নীতিবাগীশ হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। 
অশোক ও কানন রাজভবনে হাতার মধ্যে এজরা ম্যানসনে মিলিত হতে লাগলেন। এ ছাড়া সিনেমা দেখা ছিল। আর সময় হলেই গাড়ি হাঁকিয়ে লং ড্রাইভ। কত যে ট্রিপ হয়েছে এ ভাবে! শুধুই ফলতা বন্দর! যাওয়া হয়েছে কাশিমবাজার, মুর্শিদাবাদ। হাঁটা হয়েছে নিজামত ইমামবাড়াচত্বরে। 
কানন দেবী লিখেছেন, ‘‘আমি সামাজিক স্বীকৃতিকেই আমার প্রেমের মুকুট করতে চেয়েছিলাম। সেটা পেলামও। কারণ ও-ও বিয়ে চেয়েছিল।’’
কাননকে সাদরে গ্রহণ করেছিলেন অশোকের মা কুসুমকুমারী দেবী। সুন্দর সম্পর্ক হয়েছিল ননদ রানী ও তার স্বামী প্রশান্তচন্দ্রের সঙ্গে, তবু অপেক্ষা করতে হয়েছিল হেরম্বচন্দ্রের মৃত্যু অবধি। সে-বিয়ে হলো ১৯৪০- সালের ডিসেম্বরে। অশোকের বয়স যখন ছত্রিশ, কাননের পঁচিশ। অনুরাগীদের আশঙ্কা ছিল ১৯৩৯-এ গায়িকা-নায়িকা উমাশশী যেমন বিয়ে করে গান ও অভিনয় ছেড়েছেন, কাননও হয়তো তাই করবেন। আর কানন সেটা করলেন না বলেই – কালো মেঘ জমল সম্পর্কের আকাশে। কানন দেবী স্বীকার করে গেছেন, যে-অশোককে তিনি দেবতার মতো পুজো করেছেন, ওঁর সংস্পর্শে এসে জীবনের রূপরসগন্ধের স্পর্শ পেয়েছেন, পাশ্চাত্য উচ্চাঙ্গে দীক্ষা পেয়েছেন, জেনেছেন ভালবাসা কারে কয়, সেই ঘরের মানুষটিই বিবাগী হয়ে গেল – স্ত্রী যে কাজটা ভালোবাসে, সেটা করে বলে!
তখনকার অভিনেত্রীদের বিবাহিত জীবনে অবিরত যেটা হতো, তাই হলো কাননের জীবনে। পাঁচ বছরের মধ্যে বিয়ে ভাঙল। অশোকের বরাবর ধারণা ছিল, কানন যে শেষ অবধি ডিভোর্স ফাইল করেছিলেন, সেটা রানী ও প্রশান্তচন্দ্রের পরামর্শে। অশোক মামলা কন্টেন্ট করেননি। এত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা যে অশোক মৈত্রর প্রতি, সেই ব‍্যক্তির নামটুকুও কেন উচ্চারণ করলেন না – কানন দেবী তার জীবনীতে? বলা মুশকিল এবং উত্তরও নেই।’
(ক্রমশ)
Posted by Admin  গোপাল কবিরাজ from Russia
%d bloggers like this: