একটি সাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট। কলেজের দাদাদের থেকে শুনে এসেছে, এনআরসি সম্পর্কে। এসে খুব ক্ষিপ্ত। মানবতা, বাঙালী ফাঙালি এসব খুব বুঝে এসেছে।
যথারীতি আমাকে বলল, তুমি এসব কি লিখছ?
বললাম, কি লিখছি আবার?
সে বলল, এই যে তুমি বিজেপির দালালী করছ। 40 লাখ বাঙালি…
আমি বললাম, 40 লাখ বাঙালি কই পেলি। বাংলাদেশী তো…
দাদারা তাকে কঠিন শিক্ষা দিয়েছে।
সে বলল, বাংলাদেশী তো কি? বাঙালি নয়?
আমি বললাম, মানে বাঙালি তো একটা ভাষা-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী। শুধু ভাষা ধরলে কি আর বাঙালি…
বলতেই দিল না। গর্জন করে বলল, না না শুধু ভাষা। শুধু ভাষাই হল বাঙালীর মাপকাঠি।
আমার কিছুটা রাগই হল। এই কমি শুয়োরদের ব্রেনওয়াশের কেসটা জানি বলে ভাগিয়ে দিলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, শুধু ভাষার হিসাবে বাঙালি?
বলল, হ্যাঁ।
বললাম, দ্যাখ, পরে পাল্টি খাবি না তো?
বলল, না তুমি বল।
আমি বললাম, তা তোদের বাঙলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম কি?
বলল, শেখ হাসিনা।
আমি বললাম, বেশ। তাহলে এবার বল তোর ঐ বাংলাদেশের সংবিধান শুরু হয় কি দিয়ে?
বলল, জানি না।
আমি বললাম, আমি জানি। বলব?
সে বলল, বলো।
আমি বললাম, বিসমিল্লাহির রহমানুর রহিম।
এইবার সে কিছুটা থতমত খেল। তার দাদারা তাকে এটা বলেনি।
আমতা আমতা করে বলল, সে তো ওরা মানে ওদের ধর্ম….
আমি বললাম, ধর্ম ফর্ম গুলি মার। তুই তো আর ফেসবুকে নয়, আমাকে জ্যান্ত চিনিস। পুজো ফুজো দিতে দেখেছিস? বরং ডেকেও পাস না তোদের ঐ পুজো নামক উৎপাতের সময়। ফলে ধর্মকে গুলি মার। ভাষায় আয়। তা এই “বাঙালি”দের যে উদাহরণ পাওয়া গেল এতে বাঙলা কোথায়? শেখ, হাসিনা, আওয়ামী, বিসমিল্লাহির, রহিম এর কোন কোনটা বাংলা?
এইবার স্যার বেশ ঘেঁটে গেলেন। দাদারা হয়তো নেরুদা থেকে কিছু আসুদা বক্তব্য শিখিয়েছিলেন কিন্তু মুখোমুখি তর্কের সময় ওসব গোলগাপ্পা চলে না। বাস্তব সর্বদাই ভয়ঙ্কর। আমার মায়া হল। বললাম, বাদ দে। অন্য কথা বলি।
অপ্রস্তুতভাবে মাথা নাড়ল। বুঝলাম, দাদাদের সিলেবাস থেকে কমন পড়েনি।
বললাম, বি টেক পড়ছিস তো?
বলল, তুমি তো জানোই।
বললাম, কোন কলেজে?
একটি সাধারণ বেসরকারি কলেজের নাম বলল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ভাবলাম জিজ্ঞাসা করি যে, যে ভাই তোর দাদারা কি এই কলেজেরই, না এলিট কলেজের কেউ? অথবা নিজের আখের গুছিয়ে রাজ্যের বাইরে থেকে জ্ঞান দিচ্ছে?
করলাম না। বাচ্চারা যাদের সাথে কানেক্ট করে তাদের সাথে ইমোশনালি কানেক্ট করে। আমি জানি আমার সম্পর্কেও কেউ ওকে বাজে কিছু বললে ও সেখানে কিছু বলতে পারুক না পারুক খারাপ লাগবে ওর। ইভেন হয়তো কেউ বলেছে। উত্তর দিতে পারেনি। রাগ চেপে এসে আমায় অ্যাটাক। তাই আমি আর সেই দাদাদের আক্রমণ করতে গেলাম না। দরকারই বা কি!
বললাম, তোকে একটা প্রশ্ন করব। ভেবে ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিবি। তার আগে বল, পাশ করে কি করবি। তোদের কলেজের ক্যাম্পাসিংএর যা হাল…
বলল, ভেবেছি দুবছর কিছু কম্পিটিটিভ এক্সাম দেব। সরকারি চাকরির পরীক্ষা।
বললাম, বেশ বেশ। এবার প্রশ্নটা মন দিয়ে শোন। ধর তোর কাছে দুটোর মধ্যে একটা কম্পিটিটিভ এক্সামে বসার অপশন আছে। একটা দিলে, আরেকটা দিতে পারবি না। দুটো পরীক্ষাতেই ভ্যাকেন্সী ১০০ টা। প্রথমটায় প্রতিযোগী 1000 জন। দ্বিতীয়টায় 500 জন। তুই কোনটা অ্যাটেন্ড করবি।
বেশ কিছুক্ষণ ভেবেচিন্তে বলল, 500 জনেরটা।
বললাম, কেন?
বলল, মানে ভ্যাকেন্সী যদি ১০০ টা দুক্ষেত্রেই থাকে তার মানে যেটায় প্রতিযোগী কম সেটায় প্রোবাবলিটি বেশী হয়… মানে হাজার জনের মধ্যে আমাকে নশো জনের থেকে এগোতে হবে, এখানে চারশো জনের…
আমি বললাম, এটা বুঝিস তো?
চুপ করে তাকিয়ে রইল। মনে হল ধরতে পারেনি।
আমি বললাম, তুই নিশ্চয় জানিস কিভাবে ওপার থেকে আসছে আর এপাশে এসে কাগজ বানাচ্ছে এদিক ওদিকের ডকুমেন্টস বানিয়ে, জোচ্চুরি করে? তারপর একইভাবে তোদের সাথে প্রতিযোগিতায় ঢুকে যাচ্ছে। এবং পাঁচশোটা ক্রমশঃ হাজারের দিকে যাচ্ছে?
এইবার চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। দাদারা এসব বলেনি।
বললাম, প্রতিযোগিতা কঠিন হচ্ছে কার?
বলল, আ… মানে আমাদের।
বললাম, চাকরিটা দরকার তো? প্রেমটা টেঁকানো?
এতক্ষণে বাবু হেসে ফেলল। বলল, সিরিয়াস দা। চাকরি একটা না পেলে…
আমি বললাম, একসাথে বসে মদটাও খেতে পারছি না। কারণ তুই বাচ্চা রয়ে যাচ্ছিস পাবলিক ওপিনিয়নে। এবার আরেকটু ভাব।
তাকিয়ে বলল, কি?
আমি বললাম, তোর যা পড়াশোনা, তাতে তুই যে স্তরে জীবিকা খুঁজবি, তাতে কাগজপত্র ইত্যাদি লাগে। ওপার থেকছ যারা বিনা কারণে এপারে স্রেফ শুষতে আসছে আলাদা দেশ ভাগ করে নিয়েও, তোর জায়গাটা মারতে তবু তাদের কাগজপত্র কিছু গুপিচুপি করতে হবে। কিন্তু ভাব দেখি চরকাদার কথা। কাঠের কাজ করে খেত। মোটামুটি চলে যেত। এরপর একজন দুজন করে ওপার থেকে এসে বসে গেল সেম জিনিসে। ওপারেও টাকা আছে। দিল মজুরী কমিয়ে। চরকাদার ওপারের টাকা নেই। কিন্তু মার্কেটের প্রয়োজনে হয় তাকে নিজের মজুরি কমাতে হবে, অথবা তার কাছে কাজ আসবে না। তখন তোর ঐ “বাঙালি”রা তাদের সোনার বাংলার টাকা এনে বাঁচাবে এপারের চরকাদাকে? দেবে তাদের “সোনার বাঙালি” টাকার ভাগ?
বাবু টোটাল চুপ।
বললাম, এবং দেখ, চরকাদার ভাত মারতে কিন্তু কাগজটাগজও তেমন জোচ্চুরি করতে লাগে না। বাড়ির উঠোনের মত যেমন খুশী এসে পড়লেই হল। তোর অন্ততঃ সেটুকু সান্ত্বনা।
হঠাৎ ছেলেটা বলে উঠল, তা যদি এভাবেই আসবে, তাহলে আর ভারত থেকে ভেঙে আলাদা হল কেন? ভারতে জুড়ে যাক বরং। নিজেদের স্বাধীন দেশ বলে এসব জালিগিরির অর্থ হয় না।
আমি চোখ টিপলাম।
ও বলল, কিন্তু দা, ওখানে সবাই কি বাংলাদেশী?
আমি বললাম, সম্ভবতঃ নয়। তাই তাদের অ্যাপীলের অপশন রাখা আছে। ডকুমেন্টস ভুল দিয়ে থাকতে পারে বা এরকম অনেক হ্যাজার্ডস হয়ে থাকতেই পারে। সেগুলো মেটানোর অপশন রাখা আছে। সেভাবে কাজ চলবে। সেই কাজ নিয়ে খোঁজখবর রাখতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশীকে বাঙালি বানিয়ে যারা সেন্টু দিচ্ছে, তাদের টার্গেট কিন্তু তোদের পেট। লক্ষ্য করে দেখিস এইসব সেন্টুতত্ত্ব যারা ঝাড়ছে  তাদের ম্যাক্সিমামই এলিট এবং তাদের তোর মত সিচুয়েশন নেই। তোদের স্রেফ কাউক্যাচিং করছে।
উঠে চলে আসছিলাম ওকে একখানা সিগারেট কিনে দিয়ে। আমার আপাতত সিগারেট বারণ, নিউমোনিয়া পরবর্তী দশা। ফের কাশতে থাকলে চাপ। তারপরও ভাবলাম একটা জায়গা জানিয়ে যাওয়া ভাল। আমার মুখ থেকে জানুক। নাহলে আগে যেসব বালছাল ন্যারেটিভ শুনে আসবে স্বভাবতই সেটার প্রভাব বেশী পড়বে। উক্ত দাদারা তো ব্রেনওয়াশে পেশাদার। যদিও আজকালকার ছেলেপিলে অতটাও সোনামুখ করে সব গেলে না… তবুও….
বললাম, ও হ্যাঁ একুশে ফেব্রুয়ারি শুনেছিস তো?
তাড়াতাড়ি বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, সেটাও তো বাংলাদেশেই….
থামালাম। বললাম, না বাংলাদেশে নয়। পুর্ব পাকিস্তানে। কেন হয়েছিল বলতো?
বলল, বাংলা ভাষার জন্য।
আমি বললাম, বাংলা ভাষার কি হয়েছিল? নিষিদ্ধ করেছিল বাংলা বলা?
এবার ভ্যাবাচ্যাকা খেল একটু, বলল, “না মানে সরকারি সব কাজে, উর্দু আনছিল।”
বললাম, তো তাতে সমস্যা কি হত?
চুপ করে রইল। আমার মনে হল উত্তর কি দেবে নিশ্চিত হতে পারছে না।
বললাম, চাকরিবাকরির সব পরীক্ষা উর্দুতে দিতে হত।
এবার বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ।
আমি বললাম, অর্থাৎ চাকরিতে বাংলাভাষীরা চান্স পাবার বারোটা বাজছিল। পাকিস্তানি সরকার পুর্ব পাকিস্তানিদের পেটে লাথি মারছিল। আর তারা সেটা বুঝেছিল বলেই একুশে ফেব্রুয়ারি। এখন কথা হচ্ছে, তারা তাদের পেটের সিকিউরিটি বুঝেছিল পাক সরকারের হুজুগে না মেতে, তোরা কি তোদের পেটের সিকিউরিটি নিয়ে ভাববি বামৈস্লামিকদের হুজুগে না মেতে? অহমীয়ারা কিন্তু নিজেদের লাইন গুছিয়ে নিচ্ছে।
.
– লিখেছেন গজানন নস্কর।

দীপ্তরূপদা!