আইএসের কাছে যে দেশটি সবচেয়ে বেশি গোলাবারুদ ক্যামিকেল সরবরাহ করে থাকে তার নাম তুরস্ক, কিন্তু বাংলাদেশের মিডিয়াগুলিতে এই সংক্রান্ত নিউজের শিরোনাম হয়েছে, ‘আইএসকে অস্ত্র দেয় ভারত’! সোজা হিসাব, শ্রীলংকায় ইসলামিক গ্রুপ ও মুসলমানরা ম্যাসাকারে জড়িত ছিলো এটি আর কোন তত্ত্ব দিয়ে আড়াল করা যাচ্ছিল না, শুরুতে ভারতের র’ জড়িত ধোঁয়া তুলে ইসলাম ও মুসলমানদের পরিচয় আড়াল করতে সব রকম চেষ্টা যখন ব্যর্থ তখন ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের (সিএআর)’ করা এক সমীক্ষা রিপোর্টকে লুফে নিয়েছে মডারেট বাংলাদেশী মুসলিম মিডিয়া। শিরোনাম যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তাতে সবার মনে হবে, আইএসকে অস্ত্র দিয়ে ভারতই সারাবিশ্বে সন্ত্রাস করাচ্ছে। এতে প্রমাণিত হবে আইএসে কোন ইসলামিক শক্তি না। ভারতের গোপন একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন যারা মুসলিম বিশ্বে সন্ত্রাসের ষড়যন্ত্রে ভূমিকা রাখছে। আইএসকে পূর্বে ইহুদীদের সংগঠন, আইএস সদস্যরা কুরআন নামাজ পড়তে জানে না- অর্থ্যাৎ তারা মুসলমানই না- এরকম রঙ চড়ানো নিউজ ছড়িয়ে আইএস থেকে ইসলামী পরিচয় খসানোর চেষ্টাও মুখ থুবড়ে পড়েছে কারণ সারা বিশ্ব থেকে হাজার হাজার মুসলিম তরুণ তরুণী আইএসে যোগ দিয়েছিলো। সেই জিহাদ ফেরত মুজাহিদদের অনুপ্রবেশে ঠেকাতে এখন সেই দেশগুলিই দ্বিধান্বিত যারা আইএস সদ্যসদের ইহুদী বলে প্রচার করেছিলো। আইএসের যোদ্ধারা যদি ইহুদী, অমুসলিম হবে তাহলে এরা কারা? সব থিউরী যখন ব্যর্থ তখন শেষ ও একমাত্র সম্বল কারা আইএসকে অস্ত্র দেয়? বলা আসলে উচিত কারা আইএসের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে?

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে, আইএসের ‘ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইসেস’ (আইইডিএস) তৈরিতে ব্যবহৃত সাতশরও বেশি উপাদান তুরস্ক, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রসহ ২০টি দেশের ৫১টি কোম্পানি  বিক্রি করছে। সোজা হিসাব, কেউ মদ বেচে দুধ খায়। বাংলাদেশের জঙ্গিরা বারুদ কিনেছিলো এমন কিছু বাংলাদেশী ম্যাচ কোম্পানির কাছ থেকে যাদের বিদেশ থেকে বারুদ কেনার লাইসেন্স ছিলো। চোরাই পথে বারুদ যারা বিক্রি করেছিলো তারা মোটেই ভাবেনি সেই বারুদ কোথায় ব্যবহার হবে। এতে মানুষ মারা হবে কিনা না- এসব তাদের ধাতব্যের বাইরে। আইএসের কাছে চীনের তৈরি অস্ত্র গ্রেনেট পাওয়া মানেই সেটা চীন আইএস চালায় না। এমনকি কেউ সত্যি সত্যি আইএসকে অর্থ অস্ত্র বিনামূল্যে সরবরাহ করলেও আইএসের আইডোওলজি অপ্রাসঙ্গিক হয় না। বাংলাদেশের রাজশাহীর বাঘমারা গ্রামে জেএমবির উত্থান ঘটেছিলো। এই জেএমবিকে তখন বিএনপির একজন মন্ত্রী সীমান্তের নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির চমরপন্থি নিধনে ব্যবহার করতে জেএমবি নেতা বাংলাভাইকে ব্যবহার করতে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করেছিলো। জেএমবি গঠন করা হয়েছে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে বাংলাদেশকে ইসলামিক খিলাফতে পরিণত করা। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান সৌদি আরবের মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সশস্ত্র জিহাদী কার্যক্রমের অনুপ্রেরণা পান বিভিন্ন তাত্ত্বিক ইসলামিক স্কলারদের সংস্পর্শে এসে। কে এই আবদুর রহমান? শায়খ আবদুর রহমান জামালপুরের কামাল খান হাট সিনিয়র মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৮ সালে ফাজিল (স্নাতক সমমান) পাস করেন। রাজশাহীর সুলতানগঞ্জ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় তিনি কামিল পড়েন। ১৯৮০ সালে বৃত্তি নিয়ে চলে যান মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে তিনি লিসান্স (ইসলামের মূলনীতি ও ধর্ম প্রচার বিষয়ে স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি লাভ করেন। অর্থ্যাৎ একজন ইসলামি পন্ডিত স্কলার এই আবদুর রহমান। তিনি ইসলামের মূল তত্ত্ব জিহাদ করতে সংগঠিত হয়েছেন তখন তাকে বিএনপির একজন নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ পূ্রণে ব্যবহার করা হয়েছিলো। আফগানিস্থানে সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে মার্কিনরা তালেবানদের অর্থায়ন করেছে মানেই তালেবানদের আইডিওলোজি মার্কিনরা তৈরি করে দেয়নি। আইএসের কাছে যে ২০টি দেশ রসদ বিক্রি করে ক্রাইম করেছে তার বিচার হওয়া উচিত কিন্তু আইএস গঠিত হয়েছে সম্পূর্ণ ইসলামিক আদর্শকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদের সূচনা ঘটেছে দুইধারার ইসলামিক মাজহাব থেকে। হরকাতুল জিহাদ গঠন করেছিলো হানাফি মাজহাব এবং দেওবন্ধ ধারার কওমি মাদ্রাসা থেকে। অপরদিকে জেএমবি এসেছে আহলে হাদিস মাদ্রাসা থেকে। এদেরকে ‘লা মাজহাবি’ও বলা হয়ে থাকে। অথচ আমরাই কত সুন্দর গান গাই রোজ- মাদ্রাসায় জঙ্গি তৈরি হয় না!

সর্বপ্রথম বামপন্থিরা আফগানিস্থানে, ইরাকে সংগঠিত ইসলামিক দলগুলোকে মার্কিনদের তৈরি বলে প্রচারণা চালায়। বামদের কিতাবী শত্রু মার্কিনদের জঙ্গিবাদ সৃষ্টির জন্য দায়ী করতে গিয়ে তারা জঙ্গিবাদের নেপথ্যে ইসলামের অনুশাসন নির্দেশ সম্পূর্ণ এড়িয়ে যায়। নানা রকম প্রশ্ন তোলা শুরু করে তারা। আফগান যুদ্ধের আগে কেন জিহাদ ছিলো না? কেন জঙ্গিরা ইজরাইলের উপর আক্রমন চালায় না? কেন তারা ফিলিস্তিনিদের হয়ে যুদ্ধ করে না? ছোট্ট করে নিচে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়ে লেখাটি শেষ করছি।

ইসলামিক খেলাফত আনুষ্ঠানিকভাবে বা চূড়ান্তভাবে বিলিন হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে তুরস্কে। সুদীর্ঘকাল ইসলাম এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকায় তাদের সাম্রাজ্য প্রসারিত করে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছিলো। এই সময়কালে জিহাদ কার্যত স্থবীর হয়ে পড়ে কারণ শাসন ক্ষমতায় তখন মুসলমানরা। জিহাদের হিংস্র রূপ তখনই দেখা যাবে যখন তারা দারুল হার্বে আক্রমন চালাবে। উপরন্তু বাগদাদের শাসকদের অনেকেই উদার এমন কি সেক্যুলার ঘেষা ছিলেন। তুরস্কে খিলাফতের পতন মুসলিম বিশ্বে ছিলো বড় রকমের একটা ম্যাসেজ। ওদিকে সৌদি আরবের আবদুল ওহাব মুসলিমদের সাম্রাজ্য হারানো জন্য দায়ী করেন মুসলমানদের কুরআন হাদিস থেকে সরে আসাকে। তিনি এক বিশাল আন্দোলনের সূচনা করেন যার নাম ‘পূর্বপুরুষদের ইসলাম’ আরবীতে যাকে ‘সালাফি’ বলা হয়। তিনি বলেন আমাদের অবশ্যই আমাদের পূর্ব পুরুষ নবী মুহাম্মদের জমানার ইসলামে ফিরে যেতে হবে। আবদুল ওহাবী যেহেতু ইসলামের এই নতুন জাগরণের সূচনা করেছে তাই সেই আন্দোলনকে কেউ কেউ ‘ওহাবীবাদ’ বলে থাকে। কিন্তু এটি মোটেই নতুন কোন তত্ত্ব নয়। এটি হচ্ছে সহি হাদিস ও কুরআনকে ভিত্তিকে মুসলমানদের জিহাদের উপর তাগাদা দেয়ার এক ইসলামিক আন্দোলন। অপরদিকে ভারতে ইংরেজদের হাতে মুসলিম সাম্রাজ্যের পতনের পর ইসলামিক মোল্লারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো এখন জিহাদ করা হবে নিছক শক্তি ক্ষয়। তাই এখন নিজেদের শক্তি সঞ্চয় ও ইসলামিক আদর্শ নিভৃতে চর্চা করাই হবে মুসলমানদের আশু করণীয়। সেই লক্ষে সূচনা হয় দেওবন্ধ শিক্ষাক্রম। যে কারণে আমাদের সাদা চোখে একটা শতাব্দী সে অর্থে জিহাদের দেখা পায়নি। কিন্তু জিহাদ নতুন কোন তত্ত্ব নয় যা আমেরিকা চাপিয়ে দিয়েছে। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়, আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় পড়া শায়খ মুফতিদের আমেরিকা জিহাদ ডেলিভারী দিলেই তারা সেটা লুফে নিবে? আর তালেবান আইএস কেন ফিলিস্তিনীদের পক্ষে ইজরাইলকে আক্রমন করে না? বামঘেষা পিএলওকে হটিয়ে ইসলামিক জিহাদবাদী হামাস তার মাটি ছেড়ে দিবে আইএস বা তালেবানদের হাতে? পাগল নাকি? বামপন্থিরা নিজেরাই চীনপন্থি মাওপন্থি লেলিনপন্থিতে বিভক্ত। এরা কি একজন আরেকজনকে জায়গা ছেড়ে দিবে? হামাস ফিলিস্তিন কেন্দ্রিক জিহাদী দল যারা ফিলিস্তিনকে ইসলামিক স্টেট বানাতে বদ্ধপরিকর। তাদের মাথা ঘামানোর টাইম নেই উইঘুর মুসলমানদের জন্য। কাস্মির কিংবা অন্য কোথাও। সিরিয়া ইরাকে আইএস তালেবানদের বিন্দু পরিমাণ জায়গা দিবে না। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই এই ইসলামিক গ্রুপরা একেকটা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে ফেলে তখন দেখা যাবে এরা নিজেরা নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য একে অপরের বিরুদ্ধে লড়বে। এসব কারণেই ফিলিস্তিন নিয়ে আইএসের মাথা ব্যথা নেই। বাই দ্য ওয়ে, বামপন্থিরা এখন নিজেরাই গর্ব করে বলা শুরু করছে তাদের কর্মীরা নাকি ফিলিস্তিনীদের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়েছিলো! খোদ বাংলাদেশী বামপন্থি তরুণরাই নাকি গিয়েছিলো সেখানে যুদ্ধ করতে। তা সেই কমরেডরা কি সেখানে কমরেড হিসেবেই পরিচিত হয়েছিলেন নাকি ‘মুজাহিদ’ হিসেবে? তাদের কমান্ড ছিলেন শায়খ মুফতি এরকম পদবীর কেউ? তারা কি হামাসের অধিনে যুদ্ধ করে এসেছেন? শ্রীলংকায় গির্জায় হামলাকারী সদস্যরাও নাকি পারিবারিকভাবে বামপন্থি পার্টির পৃষ্ঠপোষক ছিলেন!…

যাই হোক, বামপন্থিরা জিহাদের জন্য একতরফা মার্কিনদের উপর দোষ খাড়া করে অবাস্তব তত্ত্ব প্রচার করেছিলো। এখন আইএসের কাছে ভারত সহ যে বিশটি দেশ অস্ত্র বিক্রি করেছে চোরাই তেল পাবার আশায় তাদের উপর আইএসের দায় চাপিয়ে হয়ত মাঠ গরম করা যাবে কিছুদিন। কিন্তু থলের বিড়াল বেশিদিন লুকিয়ে রাখা যায় না। বিড়াল লাফ দিয়ে ভরা আসরে বেইজ্জতি করে ছাড়বেই!