R.S.S. নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই , কেউ পক্ষে , কেউ বিপক্ষে । ‘বর্তমান’ পত্রিকায় প্রকাশিত “কারা এই ভয়ঙ্কর আরএসএস ” পুরোটা পড়ুন , ঠিকমতো জানুন । প্রেক্ষাপট আলাদা , প্রসঙ্গ একই । আঠেরো বছর আগে প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ নিবন্ধ :——–“গুজরাট সরকার সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের উপর থেকে আর এস এস এ যোগদান করার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ফলে তথাকথিত সেক্যুলার দলগুলি বিতর্ক তুলেছে । এরপর অটলবিহারী বাজপেয়ি এ ব্যাপারে একটি বিবৃতিতে বলেছেন , আর এস এস কোনও রাজনৈতিক দল নয , সমাজ – সংস্কার মূলক  একটি প্রতিষ্ঠান । এর ফলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হয়েছে । খবরে প্রকাশ রাষ্ট্রপতি এ ব্যাপারে সরকারের কাছে প্রকৃত ঘটনা জানতে চেয়েছেন ।


    স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে আর এস এস ( পুরো নাম : রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ) নামক প্রতিষ্ঠানটি সেকুলারদের  চক্ষুশূল । প্রশ্ন এসে যায়  এই ‘সেক্যুলার ‘কারা ? এ ব্যাপারে আগে একবার এই কলামে লিখেছিলাম । সেকুলার কথাটির সম‍্যক অর্থ ‘ধর্মনিরপেক্ষ ‘ নয় / ধর্মহীন — যেখানে ধর্ম বলতে ইংরেজি ‘রিলিজিয়ান’ বোঝায় , আমাদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সদাচার , সদ্ব্যবহার , সত্যবাদিতা ইত্যাদি বোঝায় না । যাইহোক , যে দল নিজেদের ‘রিলিজিয়ন’ হীন অর্থে ‘সেকুলার’ বলে তারা কিন্তু আদৌ ধর্মহীন নয় , তারা ব্যক্তিগত জীবনে পুরুত ডাকিয়ে বিয়ে দেয় , ‘মুহূর্তম্’ দেখে গৃহ প্রবেশ করে , পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে , রমজান মাসে রোজা রাখে । সংখ্যালঘু ভোট কব্জা করার জন্য এঁদেরই একজন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং জামা মসজিদের শাহী ইমামকে জাপ্টে ধরে ছবি তোলেন , এঁদেরই একজন রাজীব গান্ধী মিজোরামে গিয়ে ‘বাইবেলের অনুশাসন অনুযায়ী’ দেশ চালাবার প্রতিজ্ঞা রেখে আসেন । এঁদেরই একজন নাম্বুদিরিপাদ কেরলের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় বিভিন্ন জেলা থেকে মুসলমান -প্রধান অঞ্চল ভেঙ্গে মালাপ্পুরম নামক মিনি পাকিস্তান তৈরি করেন । এঁদেরই একজন চুরির মামলার আসামী লালু যাদব বুক ফুলিয়ে বলেন উচ্চবর্ণের লোকেরা চুরি করে ফাঁক করে দিল আর আমি গোয়ালা , তাই চুরি করলেই দোষ ? এঁদেরই একজন বঙ্গেশ্বর দাদুর ছেলে । কোথাও কিচ্ছু নেই , হঠাৎ কোটিপতি হয়ে গেল । দাদু কিচ্ছু জানেন না ।


    অর্থাৎ এই সেকুলাররা ভারতে দুটি স্বতঃসিদ্ধ কায়েম করার জন্য চেষ্টা করে গেছেন । তার মধ্যে প্রথম , সংখ্যালঘু ভোট ব্যাংকের জন্য ধর্মে সুড়সুড়ি দেওয়া পুণ্যকাজ , কিন্তু সংখ্যাগুরু হিন্দুর স্বপক্ষে কিছু বলা মহাপাপ । দ্বিতীয় , সেকুলার হলে সাত খুন মাপ , যেমন গো-খাদ্য , কামান সাবমেরিন , আয়ুর্বেদ , লটারি , ওয়াকফ , পি এল এ ইত্যাদি ।
   এবং সঙ্গে সঙ্গে এই সেকুলাররা স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে গোয়েবলসীয় প্রথায় একযোগে প্রচার চালিয়ে গেছেন একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যার নাম আর এস এস ( উল্লেখ্য যুদ্ধ পূর্ব জার্মানিতে গোয়েবলস হিটলারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন , তিনি বলতেন ডাহা মিথ্যা কথাও বারবার বললে লোকে বিশ্বাস করে নেবে ।)
   এই গোয়েবলসীয় প্রচারের  ফলে এমন ধারণা হওয়া অস্বাভাবিক নয় যে এই আর এস এস একটি ভয়ংকর গুপ্ত ঘাতকের দল , যারা নিশুতি রাতে ছোরা হাতে সংখ্যালঘু মারবার জন্য ওঁৎ পেতে থাকে । বহু লোককে বলতে শুনেছি , ওরা তো বিজেপির গুন্ডাবাহিনী , তাই না ? অনেকের ধারণা দেখেছি , বিজেপি- আর এস এস আসলে একই , ওরা ক্ষমতায় এলে নাকি সকলকে ধুতি পড়তে হবে , নিরামিষ খেতে হবে , ফোঁটা তিলক কাটতে হবে , ইত্যাদি। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া বা গির্জায় যাওয়ার উপর নাকি কড়া নিষেধাজ্ঞা  জারী হবে ।
   অথচ এই আরএসএস-এর সঙ্গে যাদের সামান্যতম পরিচয় আছে তারা এই প্রচারের মধ্যে তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সামান্যতম সামঞ্জস্যও খুঁজে পান না । তাঁরা যেসব আরএসএস সদস্য (এঁরা নিজেদের ‘স্বয়ংসেবক’ বলেন ) চেনেন তাঁদের দেখে আদৌ ঘাতক মনে হয় না । তারা ফোটা তিলকও কাটেন না , ধুতি ও সব সময় পারেন না ,সবাই যে নিরামিষ খান তাও নয় । তাঁরা শুধু ভোরবেলা বা সন্ধ্যেবেলা একটা পার্কে একটা গেরুয়া পতাকা খাড়া করে তার সামনে কুচকাওয়াজ করেন , ব্যায়াম করেন , বেদমন্ত্র পড়েন , বাংলা- হিন্দি -সংস্কৃত নানা ভাষায় গান করেন । সাদা শার্ট আর খাঁকি হাফপ্যান্ট পরে মাঝে মাঝে বড় ধরনের সমারোহও করেন । মাঝে মাঝে লাঠি খেলেন । কিন্তু তার মধ্যেও শারীরিক কলাকৌশলেরই প্রকাশ দেখা যায় , কোনওরকম  ‘লড়কে লেঙ্গে’ বা ‘ভেঙ্গে দাও’ , ‘গুড়িয়ে দাও’ গোছের পিলে-চমকানো রব শোনা যায় না । পুরো ব্যাপারটাই সমাহিত ,শান্ত , নিয়ন্ত্রিত , শৃংখলাবদ্ধভাবে হয় । তারপর যে যাঁর কাজে চলে যান ।
   তাহলে কারা এই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ , আর কি করেন এই স্বয়ংসেবকরা ? যা দেখতে পাওয়া যায় সেটা ঠিক , না সেকুলার প্রচারে যা শোনা যায় সেটা ঠিক ?    [वैद्यनाथ मण्डल]
    রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা নাগপুরের একজন ডাক্তার , ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার । তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন , এবং কলকাতায় থাকার সময় বিপ্লবীদের সংস্পর্শে এসেছিলেন ,এবং অনুশীলন সমিতিতে যোগ দিয়েছিলেন , এবং বিবেকানন্দের চিন্তাধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন । সে সময়টা এক যুগ সন্ধিক্ষণ । গান্ধীজী দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে এসেছেন এবং বিভিন্ন ব্রিটিশ -বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন । এই আন্দোলনের মূলস্রোতে ভারতীয় মুসলমানদের নিয়ে আসার  জন্য আর একটি আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন । যার নাম খিলাফত । এটি একটি অত্যন্ত গোঁড়া মৌলবাদী পশ্চাৎমুখী ইসলামী আন্দোলন , যার উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশের সঙ্গে যুদ্ধে পরাভূত তুর্কির খলিফাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা । ভারতীয় মুসলমানরা তাদের ধর্মীয় রীতি-নীতি নিশ্চয়ই মানতে পারেন , কিন্তু খিলাফত পুরোপুরি জাগতিক ব্যাপার । তার সঙ্গে ভারতীয় মুসলমানের কি সম্বন্ধ থাকতে পারে তার উত্তর ডাঃ হেডগেওয়ার অনেক ভেবেও পাননি । ইতিমধ্যে গন্ধিজি খিলাফতে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন । এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মৌলানা মহম্মদ আলী ও শওকত আলী নামক ভাতৃদ্বয় । পরবর্তীকালে শওকত আলী প্রকাশ্যে বলেছিলেন ভারতে হিন্দু -মুসলমান সদভাবের একমাত্র পথ হচ্ছে সব হিন্দুর পৌত্তলিকতা ছেড়ে ইসলাম কবুল করা ।
   যাইহোক , এই খিলাফত আন্দোলন টেকেনি । তার কারণ মুস্তফা কামাল পাশা তুর্কিতে ক্ষমতায় এসে তুর্কি জাতির মধ্যে নবযৌবনের সঞ্চার করলেন এবং খিলাফত তুলে দিলেন । সঙ্গে সঙ্গে তিনি মহিলাদের পর্দা প্রথা এবং পুরুষদের ফেজ টুপি পরাও নিষিদ্ধ করে দিলেন এবং তুর্কি ভাষাকে আরবি হরফ এর পরিবর্তে রোমান হরফে লেখা চালু করলেন । তুরস্কেই যখন খেলাফত উঠে গেল তখন আর এখানে আন্দোলন কি করে চলে ? খেলাফত আন্দোলন বন্ধ হয়ে গেল ।
    এইসব ঘটনা পরম্পরা ডাঃ হেডগেওয়ার কে ভাবিয়েছিল । এর সঙ্গে তখন আর একটি মাত্রা যোগ হয , হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা । ১৯২১ সালে বর্তমান কেরলের মালাবার অঞ্চলে( পূর্বতন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সি) মোপলা নামক মুসলমান সম্প্রদায় এক ভয়ানক হিন্দুবিরোধী বিরোধী দাঙ্গা লাগায় এবং কয়েক সপ্তাহের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার হিন্দুকে খুন করে । এর বছর দুয়েকের মধ্যে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের( বর্তমান পাকিস্তান) ও কোহাট শহরে একই রকম ভয়াবহ হিন্দুঘাতী দাঙ্গা হয় ।
    তখন দেশে প্রধান রাজনৈতিক সুর দেশকে স্বাধীন করা । কিন্তু ডাঃ হেডগেওয়ার এর মনে হয়েছিল আজ বাদে কাল স্বাধীনতা আসবেই— কিন্তু সে স্বাধীনতা নিয়ে আমরা কিছু করতে পারবো না যদি না আমরা দেশে মানুষ তৈরি করি । যে মানুষের মন্ত্র হবে স্বাদেশিকতা , স্বনির্ভরতা , সাম্য । তাঁর এও মনে হয়েছিল যে , দেশের পঁচাত্তর শতাংশ মানুষ যেখানে হিন্দু , এবং এই হিন্দু সমাজ জাতিভেদের ফলে এবং গত আট দশকের পরাধীনতার ফলে এমন এক আত্মবিশ্বাসহীন , পঙ্গু , কাপুরুষ জাতিতে পরিণত হয়েছে । এই জাতির পুনরুত্থান না ঘটাতে পারলে দেশেরও কিছু হবে না । এই চিন্তা থেকে ১৯২৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ । এর প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য— জাতি গঠনের জন্য মানুষ নির্মাণ । অন্যতম উদ্দেশ্য— হিন্দু সমাজকে জাগ্রত ও সংগঠিত করা ।
    গান্ধীজি নিজে একবার বলেছিলেন , এই দেশ ঘুরলে এবং দুটি প্রধান সম্প্রদায়ের দিকে তাকালে মনে হবে , হিন্দু হচ্ছে এক কাপুরুষ সম্প্রদায় , আর মুসলমান এক অত্যাচারী (বুলি) সম্প্রদায় । পরবর্তীকালে গান্ধীজির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের যোগাযোগ কমই ছিল , কিন্তু ডাঃ হেডগেওয়ারের কাজের মধ্যে গান্ধীজীর এই মতের আশ্চর্য প্রতিফলন দেখা যায়। বস্তুত ,  দেশের সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম কাজ ছিল মার খেয়ে কাঁদুনি গাওয়া , এবং জাতপাতের ভিত্তিতে নিজেদের সমাজকে বিভক্ত করে রাখা । এই দুই দুর্বলতা শোধরাবার জন্যই সঙ্ঘের উৎপত্তি ।
    অল্প কয়েকজন স্কুলের ছাত্র নিয়ে ডাঃ হেডগেওয়ার সঙ্ঘ স্থাপন করেন । অল্প দিনের মধ্যে তা বিশাল ব্যাপ্তি লাভ করে । এর মধ্যে একজন ভাবুক এসে সঙ্ঘে যোগদান করেন ।  ইনি প্রথমে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের জীব বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন , তারপর রামকৃষ্ণ মিশনের সারগাছি (মুর্শিদাবাদ) আশ্রমে স্বামী অখণ্ডানন্দের কাছে ব্রহ্মচর্য অভ্যাস করেছিলেন , কিন্তু গুরুর দেহত্যাগের পর বেরিয়ে ডাঃ হেডগেওয়ারের সঙ্গে যোগ দেন । এঁর নাম মাধব সদাশিব গোলওয়ালকার , এবং এঁরই চেষ্টায় প্রধানত পরবর্তীকালে আর এস এস- এর বিশেষ প্রসার ঘটে ।
   হেডগেওয়ার এবং পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরি গোলওয়ালকার  কখনও সঙ্ঘকে রাজনীতিতে ভিড়তে দেননি , কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল যে রাজনীতিতে মিশলে মনুষ্যনির্মাণ ও হিন্দু সমাজকে জাগ্রত ও সংগঠিত করার কাজ এগোবে না । কিন্তু ১৯৪৮ সালে গান্ধীহত্যার পর আর এস এস -এর ওপর সরকারি অত্যাচারের খড়্গ নেমে আসে । আর এস এস কে বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং সমস্ত স্বয়ংসেবককে কারারুদ্ধ করা হয় । পরবর্তীকালে সরকার আর এস এস এর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয় , কারণ শত চেষ্টাতেও গান্ধী হত্যার সঙ্গে আরএসএস-এর কোনও যোগ সরকার প্রমাণ করতে পারেনি ।
   এই অত্যাচারের সম্মুখীন হওয়ার পর গোলওয়ালকর সিদ্ধান্ত করেন যে যদিও সঙ্ঘ রাজনীতির বাইরে থাকবে , হিন্দু ভাবধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক দল থাকা উচিত । এই সময় গোলওয়ালকর ও ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এর মধ্যে আলোচনা হয় এবং তার ফলস্বরূপ গোলওয়ালকরের দেওয়া কয়েকজন বাছাই করা স্বয়ংসেবককে নিয়ে শ্যামাপ্রসাদ ভারতীয় জনসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করেন । এই স্বয়ংসেবকদের মধ্যে ছিলেন অটল বিহারি বাজপেয়ি , নানাজি দেশমুখ , দীনদয়াল উপাধ্যায় প্রমুখ । এই ছোট্ট  যে গাছটি পুঁতেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ এবং গোলওয়ালকর সেটিই আজ মহীরুহে পরিণত হয়ে , সামান্য পরিবর্তিত অবস্থায় ভারতীয় জনতা পার্টি নামে খ্যাত , এবং বর্তমানে ভারতের শাসক জোটের মধ্যে প্রধান দল ।
   আরএসএস বিশ্বাস করে , হিন্দু সমাজকে জাতি বর্ণ ভাষাভেদ যত দূর সম্ভব বাদ দিয়ে একীকৃত হতে হবে । যে বহুত্ব , প্লুরালিজম , সামাজিক ন‍্যায় ইত্যাদির নাম করে হিন্দু সমাজকে বহু ভাগে ভাগ করে রাখা হয়েছে তাতে আরএসএস বিশ্বাস করে না । এই প্রতিষ্ঠান  আরো বিশ্বাস করে যে প্রত্যেক স্বয়ংসেবককে নিজের ক্ষমতা অনুযায়ী ‘তন-মন-ধন’ দিয়ে দেশের সেবা করে যেতে হবে । সঙ্গে সঙ্গে শৃঙ্খলা , নিয়মানুবর্তিতা ও ভারতীয় ভাবাদর্শের প্রতি অটুট বিশ্বাস বজায় রাখতে হবে । কারণ এছাড়া মানুষ , মানুষ হয় না ।
    আরএসএস যদি রাজনীতি করতো তাহলে ভারতীয় জনসঙ্ঘ তৈরীর দরকার ছিল না । একটি রাজনৈতিক দলের সাধারণ কতগুলি লক্ষণ থাকে , যেমন রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার চেষ্টা , নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ইত্যাদি। এর কোনওটিই আরএসএস করে না । আর এস এস এর সঙ্গে বিজেপির যোগ টা নেহাতই আত্মিক । বিজেপির বহু সদস্য আছেন যাঁদের আরএসএসের কোনও সম্পর্ক নেই । বিজেপির আলাদা সংবিধান আছে , আলাদা কার্যপ্রণালী আছে , রাজনৈতিক দলের যা যা লক্ষণ থাকা উচিত , সব আছে । কিন্তু যোগ আত্মিক হলেও অত্যন্ত গভীর– কারণ, যেমনই ভারতীয় জনসঙ্ঘ জয়প্রকাশ নারায়ণের ডাকে জনতা পার্টিতে মিশে গিয়েছিল , তেমনই , যখন কিছু নেতা শর্ত আরোপ করলেন যে জনতা পার্টিতে থাকলে আরএসএস-এর সঙ্গে সম্পর্ক রাখা যাবে না , তখন অটল বিহারী বাজপেয়ি আদবানি প্রমূখ প্রাক্তন জনসঙ্ঘীরা এক বাক্যে জনতা পার্টি ছেড়ে বেরিয়ে এলেন , বিজেপির সৃষ্টি হল । আজ সেই বিজেপি দেশ শাসন করছে , জনতা পার্টি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে ।
   আজ পর্যন্ত তিনবার সরকার থেকে আর এস এস কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে । প্রথমবার ১৯৪৮ সালে গান্ধী হত্যার পর , দ্বিতীয় বার ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীকৃত জরুরি অবস্থার সময় , তৃতীয় বার ১৯৯২ সালে , যখন অযোধ্যার বিতর্কিত সৌধ ভাঙল । প্রতিবারই সরকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে , এবং আর এস এস- ই ঘাত-প্রতিঘাতের মাধ্যমে আরো শক্তি সঞ্চয় করেছে ।
    আর এস এস এ সরকারি কর্মীদের যোগদানে বাধা দেওয়া নতুন কিছু নয় । গুজরাটের পূর্বতন কংগ্রেস সরকারের আবিষ্কারও নয় । আরএসএস প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে ১৯৩২ সালে , মধ্যপ্রদেশ ও বেরার সরকার নোটিফিকেশন জারি করে সরকারি কর্মচারীদের আরএসএস এ যোগদান বন্ধ করে । অর্থাৎ আজকের সেকুলারদের গিলাপের কারণ ,   বৃটিশ আমলের এই নিষেধাজ্ঞা কেন আবার চালু হচ্ছে না ?
    আরএসএস -এর কার্যপ্রণালীর মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল , এদের স্বয়ংসেবকরা কোন মানুষকে গুরু বলে স্বীকার করেন না । সমস্ত স্বয়ংসেবক এর গুরু হচ্ছে তাঁদের গৈরিক পতাকা , ‘ভগোয়া ধ্বজ’ , যা গুরু রামদাস ছত্রপতি শিবাজী কে দিয়েছিলেন , যাকে উপলক্ষ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন , ‘বৎস , তবে এই লহো , মোর আশীর্বাদ সহ/ আমার গেরুয়া গাত্রবাস /বৈরাগীর উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিয়ো/  কহিলেন গুরু রামদাস’ । এই চিন্তাধারার সঙ্গে শিখদের খালসা পন্থের ও আশ্চর্য মিল আছে , কারণ শিখরাও কোনও মানুষকে গুরু বলে স্বীকার করেন না । দশম গুরু ‘দশমেশ’ গোবিন্দ সিংহের পর থেকে শিখদের গুরু তাঁদের মহাগ্রন্থ ‘গ্রন্থসাহেব’ , যাকে তাঁরা গুরুদ্বারে চৌকির উপর রেখে চামর দিয়ে বাতাস করেন । এই গুরুগ্রন্থই এই বীর জাতির বীরত্বের প্রেরণা । তেমনি স্বয়ংসেবকরা তাঁদের ধ্বজাকেই প্রণাম করেন , তার থেকে অনুপ্রেরণা লাভ করেন ।
   শেষ প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে :এই যদি আরএসএসের চেহারা হয় তবে তাকে এত ভয় কেন , তার বিরুদ্ধে এত বিষোদগার কেন ?
    এর উত্তর : যারা , সাদা বাংলায , ‘দু’নম্বর’ লোক তারা চিরকালই  ‘এক নম্বর’-দের ভয় করে । যাঁরা আজ ভারতবর্ষে ‘সেকুলার’ নেতা বলে সুপরিচিত তাদের রাজনৈতিক পাথেয় চিরকালই ছিল রাজনীতির মাধ্যমে বড়লোক হওয়া , দেশের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে নিজের পকেট ভারী করা । এঁরাই নিজের অপদার্থ ছেলে কে বড়লোক বানিয়েছেন , প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে অস্ত্র কিনে ঘুষ খেয়েছেন , ঝড়তিপড়তি হেলিকপ্টার কিনে মানুষ মেরেছেন , যখন মানুষের মুখের খাদ্য যথেষ্ট হয়নি তখন গরুর খাদ্যে হাত বাড়িয়েছেন । এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল এক নির্লজ্জ বেহায়া বল্গাহীন সংখ্যালঘু তোষণ । 
অপরপক্ষে এঁরা তথাকথিত ‘সাম্প্রদায়িক’দের দুবেলা গালাগালি দিলেও দুটো কথা কখনও বলতে পারেন নি । কোনও  আরএসএস নেতা কে কখনও কোনও তথাকথিত সেক্যুলার নেতা ‘চোর’ বলতে পারেননি , দেশদ্রোহীও বলতে পারেননি ।    এহেন সেকুলার নমুনারা কি কখনও কঠোর  শৃংখলাবদ্ধ , সৎ , নিয়মানুবর্তী , দেশপ্রেমিক আর এস এস কে সহ্য করতে পারেন ?

   যাঁরা হিন্দু সমাজকে জাত পাতের ভিত্তিতে ভাগ করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটছেন তাঁরা কি আরএসএসের জাতিভেদ- বিরোধীতা , ভাষাভেদ- বিরোধিতা সহ্য করতে পারেন ? তাই নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে , সংখ্যালঘু তোষণ ঢাকতে আর এস এস কে এত গালাগালি । কিন্তু এত গালাগালি সত্ত্বেও এই সব লেপ-তোষকরা এই দেশপ্রেমিকদের অগ্রগতি রুখতে পারেন নি । আরএসএস বেড়েছে , বাড়ছে , বাড়বে । “
———লেখক—–তথাগত রায় [বর্তমান পত্রিকা—-14.2.2000]