প্রতারণার মধ্যে সৃষ্ট যে দেশ
১৯৪০ সালে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রদেশের নেতা হওয়ার কারণে জিন্নাহসহ কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দ শেরে বাংলাকে দিয়েই লাহাের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তারপর এমন অযৌক্তিক ও অপমানজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় যার ফলে 

শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক বাধ্য হন নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করতে। অনুরূপভাবে পাকিস্তানের জাতির পিতা মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ যখন দেখলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের লাহাের প্রস্তাবে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে তখন মতলব আঁটলেন এই দুই স্বাধীন ও সার্বভৌম মুসলিম রাষ্ট্রকে একীভূত করে ‘একটি পাকিস্তান’ করতে হবে।

তাই প্রয়ােজন পড়ল হােসেন শহীদ সােহরাওয়ার্দীকে। তখন বঙ্গীয় পরিষদে তার নেতৃত্বে ১১৯টি আসনের মধ্যে ১১৩টি আসনেই মুসলিম লীগ বিজয়ী হয়। সােহরাওয়ার্দী মুখ্যমন্ত্রী হন। সে জন্য তাকে দিয়েই জিন্নাহ শিল্পী কনসেশনে ‘এক পাকিস্তানের; প্রস্তাব পাশ করান। এ সময় ভারতে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল।
 ঐ সরকারে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কিংবা হােসেন শহীদ সােহরাওয়াদী কেউই ঠাই পাননি। মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতবাসী তথা বিশ্বকে দেখাতে চাইলেন পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র হলেও সেখানে সব ধর্মের লােক নিরাপদে বসবাস করতে পারবে সম-অধিকার নিয়ে। সেজন্য যােগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করার সুযােগ দেয়া হয়। এসবই ছিল পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের চতুরতা ও ভাওতাবাজি। 
পাকিস্তানী নেতারা বলতেন, বিশ্বে পাকিস্তান হবে ইসলামিক রাষ্ট্রের মডেল। পাকিস্তানের জাতির পিতা সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক বলেছেন, ‘মােহাম্মদ আলী জিন্নাহ নামাজ, রােজা ও ধর্মের ধার ধারতেন না। জীবনের শেষ ৩ বছর তিনি বেঁচে ছিলেন, ইচ্ছাশক্তি, হুইস্কি, সিগারেট এবং কখনাে কখনাে শূকরের মাংসও তিনি ভক্ষণ করতেন। এমনই ছিল নবসৃষ্ট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের ভন্ডামি ।
করাচী, ৪ মার্চ ১৯৪৯
সামনে কবর খোঁড়া হচ্ছে। যাকে কবরস্থ করা হবে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন কবরের সামনে কবরে শায়িত করার পূর্বে জীবন্ত মানুষটি কথা বলতে দাড়িয়ে গেলেন। উপস্থিত সবাই বিমূঢ়। বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। দেখছেন মানুষটির শান্ত, সমাহিত চেহারা। কোনাে হতাশা নেই। ক্রোধ নেই  সৌম্যকান্তি। গণপরিষদের স্পিকার তাকিয়ে আছেন তিনি বিস্মিত। 
যেন বিমূঢ়! তাকে বিনীত সম্বােধন করে সেই ব্যক্তিটি বলেন, “স্যার, এই জীবনে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় কেউ উপস্থিত থেকে বক্তব্য দেয়ার এবং শেষকৃত্যে অংশ নেয়ার সুযােগ পায় না। আমার জীবনে এ এক অপূর্ব সুযােগ এসেছে যেখানে আমি এই পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে সেই শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করছি। একটু পরেই যাকে এই পার্লামেন্টে কবরস্থ করা হবে। 
এরকম দাড়িয়ে কিছু বলার সৌভাগ্য আজও কারাে হয়নি। সম্ভবত এই পার্লামেন্টে এটাই আমার শেষ কথা হবে। মাননীয় স্পিকার মহােদয়, আজ যে আইন সংশোধন হতে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ সহজেই তার তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তান সরকার যে সংশােধনটি করতে যাচ্ছে তার মাধ্যমে প্রমাণ হয় তাদের শিক্ষা ও ইতিহাস-জ্ঞানের কত বড় অভাব রয়েছে এবং এটা করা হচ্ছে একজন মাত্র ব্যক্তিকে সামনে রেখে। 
তাঁকে যেভাবেই হােক এই পার্লামেন্ট থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য। আয়ােজন দেখে মনে হচ্ছে এই ব্যক্তিটিকে জ্যান্ত সমাহিত করার জন্য। গণপরিষদের সদস্য হিসেবে বিনীতভাবে আমি তা উপলব্ধি করছি, একজন ব্যক্তিকে পার্লামেন্ট থেকে অপসারিত করার যে আইনটি পেশ করা হয়েছে তা অর্থহীন। কেননা এখনাে ভারত বিভাগের পরে বহু নেতাই তাদের স্থায়ী অবস্থান নির্ধারণ করেননি।
 তবুও আইন হচ্ছে যে, গণপরিষদ সদস্যের পাকিস্তানে স্থায়ী নিবাস থাকবে না তিনি গণপরিষদ সদস্য থাকবেন না বা যার ঘর নেই, বাড়ি নেই, আবাস নেই। কিন্তু সেই ব্যক্তিই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব এনেছিল, পার্লামেন্টারি পার্টির দিল্পীর কাউন্সিলে পাকিস্তান নামক একটিমাত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে।
তথ্যসূত্রঃ মুক্তিযুদ্ধে সত্যের মুখোমুখি -অধ্যাপক আবু সায়ীদ