জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ড: ব্রিটিশ রাজত্বের ইতিহাসের নৃশংসতম ট্রাজেডি

জালিয়ানওয়ালাবাগের নৃশংস গনহত্যা ছিল ভারতে বৃটিশ শাসনের অন্যতম বৈশিষ্টগত
ঘটনা,যা ভারত থেকে বৃটিশদের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। পাঞ্জাবের হাজারো
অহিংস প্রতিবাদী জনতা তাদের দুই শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯১৯
খ্রিস্টাব্দের ১৩ই এপ্রিল পাঞ্জাবের হাজার হাজার মানুষ অমৃতসরের কাছে
জালিয়ানওয়ালাবাগের এক সংরক্ষিত উদ্যানে এক প্রতিবাদ সভায় মিলিত হন যদিও
ইতোপূর্বে সভাস্থলে কারফিউ জারী করা হয়েছিল।

সভা চলাকালে অমৃতসরের
সামরিক শাসনকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার ও তার সশস্ত্র
বাহিনী সভাস্থলটি ঘিরে ফেলে কোনোরূপ সতর্কবার্তা ছাড়াই নিরস্ত্র জনতার ওপর
নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করেন। আবালবৃদ্ধবনিতার উপর এই বর্বরোচিত গুলি
চালানোর ঘটনায় বহু অসহায় শিশু, নারী, বৃদ্ধ ও যুবা হতাহত হন। সরকারি হিসেবে
নিহতের সংখ্যা ৩৭৯ জন এবং আহত হন ১২০০ জন। অন্যান্য সূত্রগুলো মৃতের
সংখ্যা ১০০০ বলে বর্ননা করে। সারাদেশ পুলিশের এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডে
স্তম্ভিত হয়ে যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী বৃটিশ
সাম্রাজ্যের পক্ষে সৈন্য ও সম্পত্তি দিয়ে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। প্রায় ১.২৫
মিলিয়ন যোদ্ধা ইউরোপ আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বৃটিশদের স্বার্থ রক্ষায়
পরিচালিত হয়। প্রায় ৪৩,০০০ ভারতীয় যোদ্ধা এই যুদ্ধে নিহত হন। যুদ্ধ শেষে
কলোনী বিরোধী একধরণের সাধারণ মনোভাব সারাদেশব্যাপী তৈরী হলে বিভিন্ন স্থানে
বৃটিশবিরোধী প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়। ১৯১৫ থেকে ১৫১৭ সালের মধ্যে যতগুলো
ছোটখাট বিদ্রোহ সঙ্ঘটিত হয়েছে তার মাঝে ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের
বিদ্রোহ, যা ঘাদার বিদ্রোহ নামে পরিচিত, তা ছিল সবচাইতে সঙ্ঘটিত ও বিস্তৃত।
এই বিদ্রোহ ভারতীয় জাতীয়তাবাদী, রাশিয়ান সোসালিস্ট, আমেরিকান এবং
জার্মানির সমর্থন নিয়ে সঙ্ঘটিত হলেও বৃটিশ ইন্টেলিজেন্সের তৎপরতায় দমন করা
সম্ভব হয়।
বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব হিসেবে বিশাল সংখ্যক হতাহত জনসংখ্যা,
টাক্স বৃদ্ধির মাধ্যমে অসামান্য অর্থনৈতিক চাপ সামাল দেয়ার চেষ্টার ফলে
সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি, বিশ্বব্যাপী মহামারী, এবং ব্যাবসা বানিজ্যে সীমাহীন
ক্ষতি ভারতের অর্থনীতিসহ সকল সামাজিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়সমুহকে
অসামান্য ভারসাম্যহীনতায় ফেলে। অপরদিকে বৃটিশ সামাজ্যের মুকুট ভারত
স্বাধীনতার জন্য ছিল তৃষ্ণার্ত। আনুমানিক ৪৩০০ ভারতীয় সেনা বৃটিশদের জন্য
যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়। যুদ্ধের সময় অনেক ভারতীয় সৈন্যই যুদ্ধের ময়দান
থেকে ভারতে চোরাচালানের মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ে এসেছিল। যুদ্ধের পূর্বে যে
ধরণের ভারতীয় জাতীয়তাবাদী মনোভাব দেখা গিয়েছিল কংগ্রেসের কট্টরপন্থী ও
আধুনিক গ্রুপগুলো ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পরে তখন তা আবার পূনর্জাগরিত হয়।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পরে ভারতের বৃটিশরা সবসময়েই আরেকটি বিদ্রোহের শঙ্কায়
ভুগত। যদিও অমৃতসরের ঘটনায় অনুসন্ধানকারীরা এধরনের ষড়যন্ত্রের কোন সন্ধান
পাননি, কিন্তু জেনারেল দায়ার মনে করতেন নেটিভদের যদি একটা আচ্ছা মার দেয়া
যায় তাহলে তাদের আকাঙ্খা খর্ব হয়ে যাবে, যদিও তিনি বৃটেনে ফিরে যেতে বাধ্য
হন এবং সন্ত্রাসী হামলার জন্যে অভিযুক্ত হন। ১৯১৫ সালের বিদ্রোহের চেষ্টা,
লাহোর পরিকল্পনা তখোনো বৃটিশদের তাড়িয়ে বেড়াত। ঠিক তখনই রাশিয়ায় বলশেভিক
বিপ্লবের বার্তা ভারতেও ছড়িয়ে পড়ায় বৃটিশদের ভয় আরো বেড়ে যায়।
১৩
এপ্রিল, শিখদের বৈশাখী উৎসবের দিন অসংখ্য মুসলিম ও হিন্দু জনতা অমৃতসরের
জালিয়ানওয়ালাবাগ পার্কে সমবেত হয়। সভা শুরু হবার ১ ঘন্টা পরে অর্থাৎ সাড়ে
পাঁচটার দিকে অমৃতসরের সামরিক কমান্ডার জেনারেল দায়ারের নেতৃত্বে ৬৫
সদস্যের এক গুর্খা ও ২৫ বেলুচী যোদ্ধা সভাস্থলে প্রবেশ করে। এদের মাঝে ৫০
জন লী-এনফিল্ড ৩০৩ বহন করছিল। অপরদিকে দায়ার দুইটি মেশিন গান সংযুক্ত
আর্মার্ড কার নিয়ে আসেন। গাড়িগুলো পার্কের প্রবেশপথে এমনভাবে রাখা হয় যাতে
ভিতরের কেহ বাইরে বের হতে না পারেন। পার্কটি ছিল সকল দিক থেকে বাড়ি ও সরু
প্রবেশপথ দিয়ে ঘিরে রাখা।
মূল প্রবেশপথটি প্রশস থাকলেও সেখানে
অস্ত্রে-শস্ত্রে সজ্জিত অসংখ্য সেনা কড়া পাহারায় নিযুক্ত ছিল। দায়ার কোন
ধরনের সতর্কতা ছাড়াই গুলি ও হামলা চালানোর আদেশ দিলেন, পরবর্তীতে দায়ার
বলেছিলেন, তখন কোন সঙ্কেত দেয়ার সময় ছিলনা, তখন ছিল ভারতীয়দের শাস্তি দেবার
সময়। গুলিবর্ষন প্রায় দশমিনিট ধরে চলছিল। গুলি তখনই বন্ধ হয়েছিল যখন
এমিনিউশন সাপ্লাই প্রায় শেষ হইয়ে এসেছিল। এসময় প্রায় ১৬৫০ রাউন্ড গুলি খরচ
করা হয়। এ ঘটনায় তাৎক্ষনাৎ বৃটিশবিরোধী আন্দোলন সারাদেশ ব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ সকল জাতীয় নেতৃবৃন্দ এই পৈশাচিক ঘটনার
কড়া সমালোচনা করেন।
দেশজুড়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দাবানলের মতো
ছড়িয়ে পড়ায় গণমানুষের চাপে ব্রিটিশ সরকার গঠন করে একটি তদন্ত কমিটি।
তদন্ত শেষে ঘোষণা দেওয়া হয় এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে নিহত মাত্র ৩৭৯ আর আহত
এক হাজার ১০০ জন। যদিও সেদিন জাতীয় কংগ্রেস দাবি করে এই হত্যাকাণ্ডে নিহত
হয়েছে সহস্রাধিক মানুষ। তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. স্মিথ জানান, এই
হত্যাযজ্ঞে নিহত মানুষের সংখ্যা এক হাজার ৫২৬ জন।
ঘটনার পরপরই
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারকে অপসারণ করে ব্রিটিশ সরকার। তাঁকে ফিরিয়ে
নেওয়া হয় লন্ডন। কিন্তু প্রতিশোধের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলতে থাকে শিখদের
মধ্যে। সে আগুনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এক শিখ যুবক লন্ডনে গিয়ে গুলি করে
হত্যা করে ডায়ারকে। ডায়ার তখন লন্ডনের ক্যাক্সটন হলে আয়োজিত একটি
অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন।
ব্রিটিশ সরকারের বর্বর অত্যাচারের
প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরকার প্রদত্ত নাইট উপাধি ঘৃণাভরে
প্রত্যাখ্যান করেন । নরমপন্থী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন ”
জালিয়ানওয়ালাবাগের বীভত্স ঘটনা সারা দেশে মহাযুদ্ধের হোমশিখা প্রজ্বলিত
করেছিল ”।
১৯১৯ সালে তৎকালীন ঔপনিবেশিক ভারতের জালিয়ানওয়ালাবাগে
গণহত্যার জন্য ২০১৩ সালে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন দুঃখ
প্রকাশ করেন। গণহত্যার জন্য ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই প্রথম কোনো
ব্রিটিশ কর্তা দুঃখ প্রকাশ করলেন। প্রায় এক শতাব্দী পর ভারতে তিনদিনের
রাষ্ট্রিয় সফরের শেষ দিনে ২০১৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পাঞ্জাব প্রদেশের
অমৃতসরে গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভে গিয়ে প্রার্থনা করে কিছুক্ষণ নীরবতা পালন
করেন ক্যামেরন। ঐ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুঃখপ্রকাশ করে ক্যামেরন বলেন, “এ
ঘটনা ব্রিটেনের ইতিহাসে সবচেয়ে লজ্জাজনক ঘটনা”।
সৌজন্যেঃ বাঁশের কেল্লা…..।।