সভ্যতার সাথে সমাজ পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু সেই সাথে বাংলাদেশের সনাতনি সমাজ কি পা মিলাতে পারছে, আজ এটা আমাদের কাছে এক বড় প্রশ্ন?? বাংলার সমাজের উত্তরাধিকার আইনের মার-পেঁচে সনাতনি নারী আজও সম্পতির অধিকার পাইনি কেন, এমন প্রশ্ন কি এবারো মনে আসে না?? প্রায় ১১৫ কোটি হিন্দু জনসংখ্যা অধ্যুষিত ভারতে নারীরা পিতার মৃত্যুর পর ভাইয়ের সাথে সম্পত্তির সমান উত্তরাধিকার পেলেও বাংলাদেশে তা পাননা। এ ব্যপারে ধর্মীয় ও আইনগত দৃষ্টিকোন থেকে কিছু আলোচনা আবশ্যক বলে মনে করছি।

পিতৃসম্পত্তির সমবন্টন নিশ্চিতকারী পৃথিবীর প্রথম গ্রন্থ পবিত্র ঋগ্বেদ।অনেক অন্য ধর্মীরা এ বিষয়ে হম্বিতম্বি করলেও এক্ষেত্রে বেদ ই সাম্য বজায় রেখেছে-

ন জাময়ে তান্বো রিক্থমারৈক্চকার গর্ভং সনিতুর্নিধানম্।
যদী মাতরো জনযন্ত বহ্ণিমত্যঃ কর্তা সূকৃতোরন্য ঋন্ধন্।।
(ঋগ্বেদ ৩.৩১.২)

অনুবাদ-পুত্র কন্যাকে পিতৃসম্পত্তি থেকে আলাদা করে দেয়না,তা সমান ই থাকে বরং সে তার বোনকে শিক্ষিত,সংস্কৃতিবান করে গড়ে তোলে এবং স্বামীর হাতে তুলে দেয়।পিতামাতা ছেলেমেয়ের জন্ম দেন,প্রথমজনকে পারিবারিক দায়িত্বঅর্পনের জন্য আর দ্বিতীয়জন তাদের জন্য আসে পবিত্রতা ও গুনের প্রতীক হিসেবে।

ব্যখ্যা-এই মন্ত্রে ছেলে ও মেয়ে সন্তানের সম্পত্তির উত্তরাধিকারের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।একটি পিতামাতার যদি শুধু মেয়ে সন্তান থাকে তবে পিতৃসম্পত্তির সম্পূর্ন ভাগটাই সে পাবে,আর যদি তার ভাই থাকে তাহলে দুজনের মধ্যে তা সমানভাবে ভাগ হবে,কোনভাবেই তা এককভাবে শুধু পুত্রসন্তান পাবেনা।আর পিতা-ভ্রাতাদের কর্তব্য হল কন্যাকে বিয়ের আগেই শিক্ষা-কৃষ্টিতে স্বয়ংসম্পূর্ন হিসেবে গড়ে তোলা।একজন পুত্রের কাজ সংসারের দায়িত্বভার নেয়া আর একজন কন্যাসন্তানকে পিতামাতার জন্য পবিত্রতা ও গুনের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

হিন্দু সম্পত্তিবিভাগের প্রধানত দুটি শাখানিয়ম প্রচলিত রয়েছে।

একটি দায়ভাগ শাখা যা মূলত বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্রের উপর জীমূতবাহন এর একটি সম্মিলিত ভাষ্য।এটি প্রধানত বাংলাদেশ,পশ্চিমবঙ্গ, আসামে প্রচলিত ছিল।

অপরটি মিতাক্ষর শাখা যা হল মূলত যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতির উপরে বিজ্ঞানেশ্বর এর ভাষ্য।এটি বাংলা প্রদেশ ছাড়া সম্পূর্ণ ভারতে বিদ্যমান ছিল।

মনুসংহিতায় সম্পত্তির উত্তরাধিকারকে কেন্দ্র করে একটি শ্লোক আছে,

“কারো মৃত্যু হল সম্পত্তি প্রথমে পাবে তার সপিন্ড,তা না থাকলে পাবে সকুল্য,তা না থাকলে তার গুরু আর তা না থাকলে তার শিষ্য।”

এখন সপিন্ড কে?এই একটি শব্দের অর্থ নিয়ে দ্বিমত পোষনের মাধ্যমে সৃষ্টি হল এই দুটি শাখা।

দায়ভাগ শাখামতে সপিন্ড অর্থ হল যিনি সম্পত্তি রেখে যাওয়া ওই মৃত ব্যক্তির পিন্ডদান করেন বা করতে পারেন।এখন পৌরানিক মতে পিন্ডদান করতে পারেন পুত্র,পুত্র মৃত হলে পুত্রের পুত্র,পুত্র না থাকলে যদি পিতা বেঁচে থাকে তবে পিতা,তা নাহলে কন্যার পুত্র,তাও না থাকলে মাতা বা কন্যা।সেই অনুসারে একজন ব্যক্তি মারা গেলে তার সম্পত্তি পাবে তার পুত্র,পুত্র মৃত হলে পুত্রের পুত্র,তা না থাকলে কন্যার পুত্র,তাও না থাকলে যদি পিতা বেঁচে থাকে তবে পিতা,তা নাহলে মাতা বা কন্যা সম্পত্তির অধিকারী হবে।

অপরদিকে মিতাক্ষর শাখা অনুযায়ী পিন্ড অর্থ রক্তসম্পর্ক।এইক্ষেত্রে সম্পত্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পিন্ডদান নয় বরং রক্তসম্পর্ক ই গুরুত্বপূর্ন মর্যাদা পায়।যার কারনে এখানে মেয়েদের ও সম্পত্তি পাবার সমান সুযোগ রয়েছে।এছাড়া মিতাক্ষর শাখা অনুযায়ী বিধবা স্ত্রীর ও সম্পত্তির অংশ পাবার সুযোগ রয়েছে।আরেকটি বিষয় হল দায়ভাগ শাখা অনুযায়ী মৃত ব্যক্তির কোন উত্তরাধিকারী না থাকলে এবং পিতামাতা জীবিত থাকলে সেক্ষেত্রে পিন্ডদানের অধিকারের অগ্রাধিকারে পিতা সম্পত্তির অধিকারী হন কিন্তু মিতাক্ষর শাখাতে মৃত ব্যক্তির মা রক্তসম্পর্কের নৈকট্যবলে সেই সম্পত্তির অধিকার পান।

উভয় শাখাতেই হিন্দুধর্মত্যগকারীদের সম্পত্তির অযোগ্য বলে ঘোষনা দেয়া হয়েছে।

বৈদিকভাবে ছেলে-মেয়ের সম্পত্তির সম্পত্তির সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার সুবর্ণক্ষণটি আসে ১৯৫৬ সালে যখন ভারত সরকার দায়ভাগ ও মিতাক্ষর দুটি শাখাকে সমন্বিত করে Hindu succession act চালু করে।এই আইন অনুযায়ী ভারতে মেয়েরা পৈতৃকসম্পত্তির সমান অংশীদার হয়।

অপরদিকে বাংলাদেশের হিন্দুরা এখনো পুরুষতান্ত্রিক অন্যয্য উত্তরাধিকার আইনটি বয়ে চলেছে।হিন্দু ভগিনীগন সম্পত্তির ন্যয্য প্রাপ্তি থেকে হচ্ছেন বঞ্চিত।এখন সময় হয়েছে নিজেদের কলঙ্ক মোচনের।