আমি জেগে উঠলে ভয়ে থরথর কেঁপে উঠবে পৃথিবী:
————————————————————–

ল্যাংড়া থেকে লং । যুদ্ধ করতে গিয়ে তৈমুরের বল্লম লাগে । সে ল্যাংড়া হয়ে যায় । ভারতীয় উপমহাদেশে যে নারকীয়তার মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার এক নরপশু সম স্থপতি হলো তৈমুর লং ।

তৈমুর তুর্কি শব্দ অর্থাৎ লোহা । যোদ্ধা মানুষ । সৈনিক জীবনে তরবারির জোরে জয় করেছে পশ্চিম, দক্ষিণ আর মধ্য এশিয়ার বিশাল এলাকা । প্রতিষ্ঠা করেছে নিজস্ব আইন-কানুন সংবলিত তৈমুরের সাম্রাজ্য । বাবরের দাদার দাদার দাদা ছিল এই নর পিশাচ ! ভারতের লাভ জিহাদি সইফ আলী খান ও তার মাসুকা কারিনা কাপুরের প্রথম পুত্র সন্তানের নাম হলো তৈমুর, এবং তৈমুর সর্বাধিক স্বীকৃতি পেয়ে থাকে মুসলিম ইতিহাসে । তাকে দেখানো হয় ইসলামের প্রতি সমর্পিত ধর্মপ্রাণ এক বীর যোদ্ধা হিসেবে । আসুন দেখি ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রসারে এই নর পিশাচের কীর্তিকলাপ:

দিল্লি দখলের উদ্দেশ্যে তৈমুর তার অভিযান শুরু করে ১৩৯৮ সালে । মসনদে তখন সুলতান নাসির উদ্দীন মেহমুদ।সেপ্টেম্বর মাসের ৩০ তারিখ তৈমুরের রক্তপিপাসু বাহিনী পার হলো সিন্ধু নদ । বিনাবাধায় দখল করে নিল মুলতান । দিল্লি দখলের পেছনে তৈমুরের রাজনৈতিক অজুহাত ছিল এটিই যে, সেখানকার মুসলিম সুলতানরা তাদের হিন্দু প্রজাদের ব্যাপারে ‘মাত্রাতিরিক্ত’ উদার। আসলে দিল্লির ধন সম্পত্তি দখল করাই ছিল তার মূল লক্ষ্য ।

ডিসেম্বরের ১৭ তারিখ তৈমুরের বশ্যতা স্বীকার করে নিল সুলতানের বাহিনী আর দিল্লীর নগরবাসীর কপালে জুটল চরম পরিণতি । ঐতিহাসিক সূত্র মতে, দিল্লির পতনের পর এক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকা হত্যাযজ্ঞে প্রায় এক লাখ বিধর্মীর শিরশ্ছেদ করে তৈমুর । তাজক-কি-তৈমুরী বা তৈমুর স্মৃতিকথনে নিজের ভাষায় দিল্লির ঘটনার বয়ান; ‘মাসের ষোড়শ দিবসে এমন কয়েকটা ঘটনা ঘটল যার পরিণতিতে ধ্বংস হলো দিল্লি । তরবারির নিচে কাটা পড়ল অনেক বিধর্মীর মস্তক । ভয়ানক একদল তুর্কি সৈন্য নগরীর কোনো এক ফটকের কাছাকাছি ঘুরে বেড়াচ্ছিল আর ফুর্তি করছিল । এ সময় তাদের কেউ কেউ কাছের লোকজনের ঘরবাড়িতে হামলা চালায়, তাদের নারী এবং সম্পদ লুটপাটের চেষ্টা করে । খবর কানে আসামাত্র আমি শৃঙ্খলা বিধানের নিমিত্তে একদল সৈন্য পাঠাই সেখানে । এরপর আমার হারেমের কতিপয় মেয়েছেলে দিল্লি সম্রাজ্ঞী মালিকি জৌনার দুর্গ জাহান-পানাহ দর্শনের সাধ প্রকাশ করে । আমি একদল সৈন্যের পাহারায় তাদের নগরে পাঠাই । এরপর জালাল আহমেদ ও তার লোকজন নগরে গিয়ে সেখানকার বিজিত অধিবাসীদের ওপর আরোপিত কর আদায়ের কাজ শুরু করে । এছাড়া খাদ্যশস্য, তৈল, চিনি এবং ময়দা জোগাড়ের লক্ষ্যে আরও এক সহস্র সৈন্য নগরে প্রবেশ করে । এছাড়া আমার কাছে সংবাদ এলো, আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালিয়ে বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ এবং স্ত্রী-পুত্র-পরিজনসহ একদল অভিজাত হিন্দু আশ্রয় নিয়েছে শহরে । তাদের ধরে আনার জন্য আরও কিছু সৈন্যসহ বেশ কয়েকজন সেনাপতিকে পাঠালাম নগরে । এতগুলো কাজ সম্পাদনের জন্য পর্যাপ্ত তুর্কি সৈনিক তখন অবস্থান করছিল ভেতরেই । পলাতক হিন্দুদের ধরার জন্য সৈন্যরা যখন অগ্রসর হলো সে মুহূর্তে বিধর্মীদের কেউ কেউ তরবারি হাতে আক্রমণ করল তাদের । মুহূর্তের ভেতর জ্বলে উঠল সংঘাতের আগুন । সম্রাজ্ঞীর আদরের মহল থেকে শুরু করে পুরনো দিল্লির প্রতিটি দুর্গ নেচে উঠল লকলকে আগুনের শিখায় । খুন আর ধ্বংসের নেশায় মাতোয়ারা হলো বর্বর তুর্কি দল । সর্বনাশ থেকে পরিত্রাণের পথ নেই দেখে বিধর্মীরা নিজের হাতেই আগুন দিল নিজের ঘরবাড়িতে । শত্রুর হাতে অবমাননার ভয়ে নিজেরাই পুড়িয়ে মারল নিজের বিবি-বাচ্চাদের । এরপর তরবারি হাতে ছুটে এলো যুদ্ধে আর মারা পড়ল মাছির মতো । হিন্দু বিধর্মীরা যথেষ্ট শৌর্যের পরিচয় দিয়ে লড়াই করে গেল । সারাদিন ধৈর্যসহকারে নগর ফটক পাহারা দিল সেনাপতিরা । সৈনিকদের নিবৃত্ত করল শহরে ঢুকতে । ওইদিন ছিল বুধবার । পরদিন বৃহস্পতিবার সারাদিন এবং সারারাত পর্যন্ত চলতে থাকা এই লুটপাট, ধর্ষণ, হত্যা আর ধ্বংসযজ্ঞে অংশ নেয় প্রায় ১৫ হাজার তুর্কি সৈনিক । শুক্রবার ভোর এলো। সৈন্যদের মধ্যে কোনো শৃঙ্খলা নেই । আমার নির্দেশ ছাড়াই তারা সব ছুটে চলে গেছে নগর অভ্যন্তরে । প্রতিটি সৈন্যের হাতে খোলা তরবারি, চোখে খুন আর ধ্বংসের নেশা । যাদের খুন করা হলো না, তাদের ধরে আনা হলো বন্দি হিসেবে । পরদিন শনিবারও চলল এই জের । দিনশেষে প্রতিটি সৈন্যের ভাগে পড়ল নারী-শিশু মিলিয়ে শতাধিক বন্দি । এমনকি বাবুর্চির ভাগেও পড়ল কমপক্ষে কুড়িজন বন্দি । লুণ্ঠিত দ্রব্যের মধ্যে পাওয়া গেল বিপুল পরিমাণ রুবি, হীরা, চুনি, মুক্তা ও অন্যান্য দ্যুতি ছড়ানো দামি পাথর; সোনা-রুপার অলঙ্কার, আশরাফি বা বাদশাহি মুদ্রা, টাকা আর অমূল্য সিল্ক । দিল্লির বাসিন্দাদের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকজন ওলামা, মাওলানা আর সাঈদী ছাড়া সব নাগরিককে কতল করা হলো । দুর্ভাগ্যের লিপি মাথায় নিয়ে এভাবেই ধ্বংস হলো এ নগর । আমার কী কসুর, আমি তো তাদের বাঁচাতেই চেয়েছিলাম; কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা, এভাবেই ধ্বংস হবে দিল্লি ।’

১৩৯৮-এর ডিসেম্বরে মিরাটের উদ্দেশে দিল্লি ছাড়ে তৈমুর । পরের বছর যায় হরিদ্বার, যথারীতি লুটপাট, হত্যাযজ্ঞ শেষে শহরটি মিশিয়ে দেয় ধুলোর সঙ্গে । একই বছর আগের অভিযান স্থগিত রেখে ফিরে যায় আমু দরিয়ার পাড়ে তার রাজধানীতে । সঙ্গে নিয়ে যায় লুণ্ঠিত বিপুল সম্পদ আর হাজার হাজার ক্রীতদাস । এসব মালামাল বহন করতে কাজে লাগানো হয় শতাধিক রাজকীয় হাতি । ঐতিহাসিক সূত্রমতে, ভারতবর্ষ থেকে লুণ্ঠিত এ সম্পদ দিয়েই গড়ে উঠেছে সমরখন্দের নয়নলোভা বিখ্যাত মসজিদ_ বিবি খানমের মসজিদ ।

তৈমুরের কবরের গায়ে খোদাই করা: ”আমি জেগে উঠলে ভয়ে থরথর কেঁপে উঠবে পৃথিবী ।”