কালি পুজার পাঁঠা বলি নিয়ে শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায় কিশোরদের জন্য একটা গল্প লিখেছিলেন। পাঁঠাবলীকে অমানবিক পশুর প্রতি মানুষের নিষ্ঠুরতা তুলে ধরতে শরৎচন্দ্র তার জনপ্রিয় কিশোর চরিত্র লালুকে দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন, এই ঘৃণ্য প্রথাটি একটি নিষ্ঠুরতা মাত্র। অর্থ্যাৎ শরৎ কিশোর বয়সীদের মধ্যে ধর্মের নিষ্ঠুর অমানবিক প্রথার প্রতি তাদের অনিহা আনবার জন্য গল্প ছলে মানুষের বিশ্বাসকে আঘাত করেছিলেন নির্মমভাবে। হিন্দুরা বিশ্বাস করে দেবীর পায়ের নিচে পশুকে বলি করলে দেবী সন্তুষ্ঠ হয়। শরৎ সেই বিশ্বাসকে অমানবিক নিষ্ঠুর বলেছেন। তাও আবার ছোটদের উপযোগী গল্পে। কোরবাণী নিয়ে এমন গল্প লিখলে ঢাকার কবি-সাহিত্যিকরা বলা শুরু করবে, এসব গল্প পড়ে জঙ্গিরা কেন সাধারণ নিরহ মুসলমানরাই ক্ষেপে গিয়ে পিটিয়ে মারতে চাইবে। জঙ্গিদের আর দোষ কি… ইত্যাদি ইত্যাদি।

কোরবানী নিয়ে এরকম গল্প লিখলে সে হয়ে যাবে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’! কোরবাণীর সময় আমাদের অনেক সাহিত্যিককে গরু কেনার পোস্ট দিতে দেখেছি। গরীবকে তাদের পাপ্য মাংস না দিয়ে সবটা যেন ফ্রিজে রেখে একাই না খায়- এরকম উপদেশের মধ্যেই তাদের মানবিকতা শেষ হয়েছে তখন। এই লোকগুলোই ব্লগার কিলিংয়ের সময় ইসলামিস্টদের সঙ্গে গলা চড়িয়ে ব্লগারদের ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ বলে মজা লুটেছিলো। কেন বলেছিলো তাতে শরৎচন্দ্র আর তাদের মধ্যে তফাতই বলে দেয়। যাই হোক, হিন্দুদের পাঁঠাবলী বলুন আর মুসলিমদের কোরবাণী- দুটোই ঈশ্বরকে সন্তুষ্ঠ করতে করা হয়। শরতের সংবেদনশীল মন একটা নিরহ অবোধ পশুর জন্য কেঁদে উঠেছে। মানুষের এই নিষ্ঠুর প্রথা যেন আজকের শিশুরা ভাবিকালে না মানে তার জন্য তিনি লিখেছিলেন। এ জন্য শরৎচন্দ্রকে ‘হিন্দু বিদ্বেষী’ বলেছে এমন কোন নজির পাওয়া যায় না। বরং শিশু-কিশোরদের পাঁঠাবলীর প্রতি বিরূপ মনোভাব আনতে লেখা গল্প বই আকারে প্রকাশিত হয়, পরবর্তীকালে তা শিশুদের জন্য পাঠ্য করা হয়।

আসুন শরতের লালু গল্পের পাঁঠাবলী অংশটি পড়ে দেখি- “লালুকে দেখে চাটুজ্জে মশায়ের ভাবনা ঘুচলো। সময় নেই,—তাড়াতাড়ি পাঁঠা উৎসর্গিত হয়ে কপালে সিঁদুর, গলায় জবার মালা পরে হাড়িকাঠে পড়লো, বাড়িসুদ্ধ সকলের ‘মা’ ‘মা’ রবের প্রচণ্ড চিৎকারে নিরুপায় নিরীহ জীবের শেষ আর্তকণ্ঠ কোথায় ডুবে গেল, লালুর হাতের খড়গ নিমিষে ঊর্ধ্বোত্থিত হয়েই সজোরে নামলো, তার পরে বলির ছিন্নকণ্ঠ থেকে রক্তের ফোয়ারা কালো মাটি রাঙ্গা করে দিলে। লালু ক্ষণকাল চোখ বুজে রইল। ক্রমশঃ ঢাক ঢোল কাঁসির সংমিশ্রণে বলির বিরাট বাজনা থেমে এলো। যে পাঁঠাটা অদূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল আবার তার কপালে চড়লো সিঁদুর, গলায় দুললো রাঙ্গা মালা, আবার সেই হাড়িকাঠ, সেই ভয়ঙ্কর অন্তিম আবেদন, সেই বহুকণ্ঠের সম্মিলিত ‘মা’ ‘মা’ ধ্বনি। আবার লালুর রক্তমাখা খাঁড়া উপরে উঠে চক্ষের পলকে নীচে নেমে এলো,—পশুর দ্বিখণ্ডিত দেহটা ভূমিতলে বার-কয়েক হাত-পা আছড়ে কি জানি কাকে শেষ নালিশ জানিয়ে স্থির হ’লো; তার কাটা-গলার রক্তধারা রাঙ্গামাটি আরও খানিকটা রাঙ্গিয়ে দিলে।”

এবার খেয়াল করুন লাইনগুলো “নিরুপায় নিরীহ জীবের শেষ আর্তকণ্ঠ কোথায় ডুবে গেল” “যে পাঁঠাটা অদূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল”  “পশুর দ্বিখণ্ডিত দেহটা ভূমিতলে বার-কয়েক হাত-পা আছড়ে কি জানি কাকে শেষ নালিশ জানিয়ে স্থির হ’লো; তার কাটা-গলার রক্তধারা রাঙ্গামাটি আরও খানিকটা রাঙ্গিয়ে দিলে”। …ওহে স্বঘোষিত “বাঙালী মুসলমান সাহিত্যিকরা” তোমরা জীবনেও এরকম লাইন লিখতে পারবে না এই কারণে নয় যে তোমরা ভীত, এ কারণে যে তোমাদের মধ্যেই সমস্যা আছে। ঘোরতর সমস্যা…!