১৯৭১: ঢাকা ফার্মগেট ও আজকের বাঙালি
———————————————–

১৬ই ডিসেম্বর,১৯৭১

রেসকোর্স ময়দান, ঢাকা – বিকাল ৪টে প্রায় । জেনারেল নিয়াজী হেটে চলেছে আত্নসমর্পনের জন্য নির্ধারিত স্থানের দিকে।কাঁধে ঝোলানো চায়নীজ অটোমেটিক রাইফেল বোঝাতে চাইছে এখনো যে কোন অপ্রিয় এবং আকষ্মিক ঘটনার জন্য প্রস্তুত ! পাশে  তরুন নাম মেজর হায়দার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যিনি ছিলেন কুমিল্লা সেনানিবাসের কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের একজন অফিসার। পরবর্তীতে যোগ দেন মুক্তিসংগ্রামে। বিদ্রোহী ক্যাপ্টেন হায়দার ২ নং সেক্টরের মেজর খালেদ মোশারফের সেকেন্ড ইন কমান্ড  ছিলেন। মেজর খালেদ মোশাররফ ব্রিগেড “k” ফোর্সে মেজর হায়দার ২ নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মেলাঘরে অবস্থিত ২ নং সেক্টরের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মেজর হায়াদার মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডো, বিস্ফোরক ও গেরিলা ট্রেনিং করাতেন। তার হাতেই গড়ে ওঠে ‘৭১ এর এক ভয়ংকর গেরিলা বাহিনী। একের পর এক দুঃসাহসী অভিযানের মাধ্যমে এই বাহিনী আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর নজর কেড়ে্ নিয়েছিল খুব অল্প সময়ে।  দলে ছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের ছেলে রুমী ,বদি, সামাদ, জুয়েল, পুলু, বাদল, চুল্লু এবং আরো  কিছু অদম্য সাহসী , মেধাবী তরুণ। প্লাটুনের নাম- “ক্র্যাক প্লাটুন”। ঢাকা শহরে অনেকগুলো সফল এবং বিধ্বংসী অভিযান চালায় এই দলটা ।  “অপারেশন ফার্মগেট” যার মধ্যে একটা – সময় মাত্র এক মিনিটের মত, তবে ব্যাপ্তি বিশাল!

আগেরদিন ক্র্যাক প্লাটুনের বিচ্ছুগুলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে সফল বোম্বিং করেছিলো । এবার টার্গেট – ফার্মগেটে চেকপোস্ট। ট্রাফিক আইল্যান্ডে  তাবু খাটিয়ে চেক পোস্ট তৈরী করেছে খান সেনা এবং পাকি পদলেহী  রাজাকার বাহিনী। পাশের ফুটপাতে  মিলিটারি পুলিশ, হাতে লাইট মেশিনগান। নিরাপত্তা  বেশ জোরদার!!

৭ আগস্ট, ১৯৭১:

সামাদের নিউ ইস্কাটনের বাড়িতে  সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিলো যে আজকেই আক্রমণ চালাবে তারা। সে অনুযায়ী প্ল্যানও ঠিক করে ফেললো  প্লাটুনের সদস্যরা। অপারেশনের সময় ঠিক হল রাত আটটা এবং এর জন্য সময় রাখা হলো – ১ মিনিট।

সারা দিন রেকি হলো পুরো এলাকা। সন্ধ্যাবেলায় শেষবারের মত খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা গেল পাকিদের পজিশন আগের মতই আছে।তবে সেনাদের জায়গায় মিলিটারি পুলিশের আনাগোনা বেশী !

অস্ত্রসজ্জিত গেরিলা দল অপারেশনে গেলো । দলে  জুয়েল,আলম , পুলু , স্বপন,সামাদ আর বদিউজ্জামান, মানে আমাদের সকলের চেনা বদি । গাড়ীর চালক সামাদ।সবার হাতে স্টেনগান,আলমের হাতে চায়নীজ এল,এম,জি। সামাদের কাছে রিভলবার,জুয়েল আর পুলুর কাছে ফসফরাস গ্রেণেড আর গ্রেণেড-৩৬।

ঢাকার রাস্তায় সবুজ রঙের একটি টয়োটা করোনাকে দুরন্ত গতি নিয়ে ছুটে চলতে দেখা গেলো ।হলিক্রস কলেজের গলির সামনে এসে ঢুকে পরলো গলির ভিতরে। গলির মুখে ,যেখান থেকে খান সেনাদের নাস্তানাবুদ করে সহজে কেটে পরা  যাবে এমন জায়গায় নিঃশব্দে থামলো সবুজ টয়োটা করোনা। নিঃশব্দে  গাড়ী থেকে নেমে এলো দলটা ।যার যার মত পজিশন নিয়ে ব্রাশফায়ার শুরু করেদিলো । সাথে চললো  গ্রেনেড ও ফসফরাস বোমার তান্ডব। মিনিটের মধ্যেই খান সেনা আর রাজাকারদের লণ্ডভণ্ড করে দিলো গেরিলা দলটা । মরলো পাঁচ মিলিটারি পুলিশ ও ছয় রাজাকার। অপারেশন শেষ কেটে পরলো তারা।

ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হলো সারা ঢাকায় আর নতুন উদ্যম এলো দেশের মুক্তিকামী মানুষের মনে । দারুন ভীতি জাগলো খান সেনা আর তাদের চামচা রাজাকারদের মধ্যে। এভাবেই অনেকগুলো সফল অপারেশন চালিয়েছিল এই ক্র্যাক প্লাটুনে !

অপারেশনের নেতৃত্বে ছিলেন বদিউল আলম।হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত “আগুনের পরশমণি”সিনেমা এই ঘটনার উপর ভিত্তি করেই তৈরী  হয়।

২৯ আগস্ট ধানমন্ডিতে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জালাল উদ্দিন সাহেবের বাড়িতে তাঁর ছেলে ফরিদ, জাফর আহমেদ ও পারভেজ হাসানদের সাথে তাশ খেলছিল বদি। এখানে বুন্ধুদের সাথে প্রায়শই সে তাশ খেলতে বসতো । বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাক-বাহিনীর একটি দল হঠাৎ বাড়ি ঘেরাও করলো । বদিউল জানালা টপকে পালানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হলো না! পাক-হায়েনারা সেখান থেকে বদিকে ধরে নিয়ে গেলো!! এরপরের ঘটনা আগের লেখায় লিখেছি। ভাবলে অবাক লাগে, এই হলো আমরা, বাঙালি! আর আজকের বাঙালি? কোথায় উপাচার্যকে ধাক্কা মারছে , ইভ-টিজিং করছে, নয়তো ইয়াবা খাচ্ছে! ওপারে ভন্ড নেতা ইমরান সরকার, আর এপারে তো আরেক কাঠি উপরে–ঘুষখোর শঙ্কু দেব পান্ডা!! 

দেশ স্বাধীন হলে শহীদ বদিউল আলমকে বীর বিক্রম উপাধিতে ভূষিত করা হয়–এটা আজকের বাঙালি ভুলে গেছে? না ভুললে তাদের লজ্জা হয়না কেন?