“হিন্দু রাজাদের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ
(১)
“সিন্ধু রাজ দাহির এবং রানী রানী বাই”

জানা ইতিহাসে ভারতে সর্ব প্রথম বিদেশী আক্রমন হয় ৩২৭ খ্রীষ্ট পুর্বাব্দে, আলেকজান্ডারের দ্বারা। আমরা জানি, আলেকজান্ডারের সেই ঔপনিবেশিক আগ্রাসন প্রতিহত করেন রাজা পুরু এবং মালি রাজ। আহত এবং ভগ্ন মনোরথ আলেকজান্ডার ফিরে যান ভারতের সীমা রেখা পার না করতে পেরে। তার তিন মাস পরে, গ্রীসে ফিরে যাবার পথে ব্যাবিলনে তার মৃত্যু হয়।
তারপর প্রায় এক হাজার বছর আর কোনো বিদেশী আক্রমন হয়নি ভারতবর্ষে। তার একমাত্র কারন অন্য কোনো সংগঠিত ঔপনিবেশিক শক্তি এশিয়া বা দক্ষিন পুর্ব এশিয়াতে তৈরী হয়নি। সেই শক্তি তৈরী হলো মধ্য এশিয়ায়।

হযরত মোহাম্মদ মারা যান ৬৩২ খ্রীষ্টাব্দে। তার ২৫ বছরের মধ্যে ‘ইসলামিক শক্তি দখল করে নেয় প্রায় সমগ্র মধ্য এশিয়া এবং উত্তর আফ্রিকা। বর্তমান ইরাকের বাগদাদ তখন খলিফার রাজধানী। ঊম্মায়েদ বংশ খলিফার আসন দখল করার পর খলিফার রাজধানী চলে যায় সিরিয়ার দামাষ্কাসে। ঠিক সেই সময় শুরু হয় ভারতবর্ষের হিন্দুদের রাহুর গ্রাস,যা আজো সমানে চলছে।

৭১২ সাল। আলেকজান্ডারের পর কেটে গেছে প্রায় ১০০০ বছর। ভারতের হিন্দুরা বৌদ্ধিক (বৌদ্ধদের শাসন) সন্ত্রাস এবং রাজনৈতিক আধিপত্যের হাত থেকে স্বাধীন হয়ে সবে একটু গুছিয়ে বসেছে। শুরু হলো মুসলমানি আক্রমন। ধীরে ধীরে সারা ভারতবর্ষে যে ঘন অন্ধকারের আবরন ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলো, তার শেষ কবে তা কেউ জানে না।

হেজাজ তখন (৭১২ সালে) খলিফার অধীনে ইরাকের শাসন কর্তা। এর আগে দুইবার সে ভারত আক্রমন করেছে। হিন্দু বীরেরা তা প্রতিহত করেছে। সেই পরাজয়ের গ্লানি আর ভারতের অগাধ ঐশ্বর্য্য , সেই সংগে ভারতে আরবী শাসন প্রতিষ্ঠার অদম্য বাসনা হেজাজের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

তৃতীয়বার ভারত আক্রমন করার জন্য সে খলিফার অনুমতি এবং অর্থ সাহায্য চেয়ে পাঠালো। খলিফা প্রথমে রাজি ছিলো না ,কারন প্রথম দুই বারের হারের জন্য। কিন্তু শেষে রাজী হলো, শর্ত হলো, যে অর্থ খলিফা দেবে তার দ্বিগুন অর্থ ফেরত দিতে হবে। লুন্ঠিত সম্পদ এবং দাস দাসীদের (গনিমতের মাল) এক তৃতীয়াংশ দামাস্কাসে পাঠাতে হবে। হেজাজ তাতেই রাজী। নিজের ভাইপো, নাম মুহাম্মদ বিন কাসিম, সবে কৈশোর উত্তীর্ন হয়েছে তাকে সেনা পতি করে এক বিশাল সৈন্য বাহিনী তৈরী হলো ভারত দখল করার জন্য। আক্রমনের জন্য অজুহাত খাড়া করা হলো শ্রীলঙ্কা থেকে আরবে যাতায়াত কারি আরবি নৌকায় আক্রমনকারি জল দস্যুদের শায়েস্তা করতে হবে বলে সিন্ধুরাজ দাহিরকে পাঠানো আদেশ পালন না করা।

আসল কারন অন্য। লুট পাট এবং দাস দাসী এসব বাদ দেওয়া যাক। এর পিছনে দুটো রাজনৈতিক কারন ও ছিলো। প্রথমটা অতি অবশ্যই মুসলমানি শাসন কায়েম করা। দ্বীতিয় টা হলো, আরবে তখন সবে মোহাম্মদের অনুসারি দের সংগে আলির অনুসারিদের খলিফার আসন দখল নিয়ে গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছে। আলির সহযোগিরা পরাজিত হয়। উম্মায়েদরা সেই আসন দখল করে। বিরোধীদের অনেক নেতারা তখন রাজা দাহিরের আশ্রয়ে বাস করছিলো। এদের বলা হতো “আলতাফি আরব”। এই আলতাফিরা হযরত মোহাম্মদের জামাই ‘আলি’র ছেলে হুসেনের সহযোগি ছিলো। এজিদ ( আলি বিরোধি) যখন হুসেন কে শেষ করার চেষ্টায় ছিলো, তখন হুসেন রাজা দাহিরের আশ্রয় চায়। দাহির সেই আবেদন স্বীকার করে নেন। হুসেন যখন মাত্র ২০০-২৫০ সহযোগি এবং পরিবার নিয়ে মরুপথে সিন্ধু রাজের আশ্রয়ে আসছিলো ,তখন কারবালা প্রান্তরে এজিদের সৈন্য বাহিনী তাদের হত্যা করে। আলতাফি দের সেই বিরোধিতার শেষ করার ও প্রয়োজন ছিলো।

বর্তমান করাচী শহরের তখন নাম ছিলো “দেবল”। রাজা দাহিরের এক সীমান্ত দুর্গ এবং মন্দির প্রাকার। সেই দুর্গ/মন্দির এর দেওয়াল ছিলো ৩৪ ফুট উচু এবং ১৪ ফুট চওড়া। ৬০০০ সৈন্য সেই দুর্গে ছিলো সীমান্ত রক্ষা করার জন্য। রাজা দাহিরের রাজধানী ছিলো “আলোর” যার বর্তমান নাম ‘আরোর”, দেবল থেকে প্রায় ৫০০ মাইল উত্তরে।
কাসিম আসার পথে মারকানের শাসক ৫ টি ‘ক্যাটাপুল্ট’ দেয়, যা দিয়ে বড়ো বড়ো পাথর ছোড়া যেতো। প্রায় ৩ মাস ধরে অসংখ্য পাথর ছুড়ে আর চেষ্টা করে কাসিম দেবল দুর্গের কোনো বিশেষ ক্ষতি করতে পারেনি।

রাজা দাহির সেন ছিনেল ব্রাহ্মন আর তার পারিষদ বর্গ ও বেশীর ভাগ ব্রাহ্মন ছিলেন। সদ্য ক্ষমতা হারিয়ে বৌদ্ধরা তাই খুব একটা খুশী ছিলো না, যদিও রাজা দাহির বৌদ্ধদের প্রতি কোনো অন্যায় করেছিলেন বলে জানা যায় না। মুসলিম ঐতিহাসিক ‘আল বারাবি’ বলেন, দেবল দুর্গ/মন্দিরে বাসবাস কারী কিছু বৌদ্ধ গোপনে কাসিমের সংগে যোগা যোগ করে। সেই গোপন ষড়যন্ত্রের ফলে এক রাতের অন্ধকারে ঐ দুর্গম দুর্গের দরজা খুলে দেওয়া হয়। রাতের অন্ধকারে “ইসলামের বাহিনী’ ঢুকে পড়ে দুর্গে। বাকীটা এক জঘন্য নারকীয় ইতিহাস। তিনদিন তিন রাত ধরে চলে হত্যা লীলা, লুট পাট, ধর্ষন। সর্ব মোট ১৬০০০ হিন্দু প্রান দেয় এক অসম যুদ্ধে,যাদের বেশীর ভাগ ছিলেন ব্রাহ্মন।

দেবল দখল করে কাসিম উত্তরে রাজা দাহিরকে সরাসরি আক্রমন করার পরিকল্পনা করে। রাজা দাহির, দেবল দুর্গের পতনের খবরে এবং এই আরবী দস্যু কে প্রতিহত করতে তৈরী হন। ইতিমধ্যে, কাসিম সাহায্য পায় বেশ কিছুটা অপ্রত্যাশিত ভাবে। আলতাফি আরবি রা, যারা রাজা দাহিরের আশ্রয়ে ছিলো তারা কাসিমের সংগে যোগ দেয় এবং অনেক গোপন সংবাদ কাসিমকে দেয়। সেই সংবাদের সুত্র ধরে কাসিন বেশ কিছু হিন্দু উপজাতিকে উৎকোচ দিয়ে নিজের দিকে টেনে আনে। তার মধ্যে ছিলো জাঠ এবং আমরা যে ‘ভুট্টো’ পরিবারের কথা জানি তাদেরই পুর্ব পুরুষ ‘ভুট্টো’রা (জুলফিকার আলি ভুট্টো হিন্দু ভারতের সংগে যে হাজার বছরের যুদ্ধ করার কথা বলেছিলো সেটা তাদের পুর্ন হয়েছ)। এরা কাসিমের সৈন্য বাহিনীতে যোগ দেয় আর “পঞ্চম বাহিনী’ (বিভীষন) হিসাবে কাজ করে।

পথিমধ্যে আরো কিছু জায়গা ,শহর, গঞ্জ দখল করে অবশেষে হিন্দু রাজা দাহির এবং আরবি সৈন্য দের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। রাজা দাহিরের সৈন্য বাহিনীর প্রাধান সেনাপতি ছিলেন তার ছেলে। হিন্দুদের প্রবল আক্রমনের সামনে আরবীরা যখন ধুলো পাতার মতো ঊড়ে যাচ্ছিলো, ঠিক সেই সময়ে ঘটলো এক অঘটন। কাসিমের কিনে নেওয়া এক ‘হিন্দু গোষ্টি’ (ভুট্টোদের মতো) যারা দাহিরের পক্ষে যুদ্ধ করার ভান করছিলো, তাদের একজন অতর্কিতে রাজা দাহিরের হাওদায় (যার পিঠে বসে দাহির যুদ্ধ পরিচালনা করছিলেন) ন্যাপথা জড়ানো তীর মারে। দাহিরের হাওদায় আগুন লাগে। দাহির মাটিতে নেমে যুদ্ধ করতে থাকেন (ঠিক হিন্দু বীর হিমুর মতো)। সেই দৃশ্য দেখে এবং নিজেদের রাজার সমুহ বিপদ দেখে সৈন্যরা বিশৃংখল হয়ে পড়ে। রাজা দাহির এবং তার ছেলে সেই যুদ্ধ প্রান্তরে মৃত্যু বরন করেন।

দাহিরের স্ত্রী “রানি বাই “ এর কাছে যখন এই খবর গেলো, তখন তিনি দুর্গে যে সৈন্য বাহিনী ছিলো তাদের ডেকে বললেন, “আমরা জানি হয়তোবা আমরা আর নিজেদের রক্ষা করতে পারবো না। কিন্তু যাদের রক্ষা করার জন্য আমাদের স্বামীরা প্রান দিয়েছেন তাদের সম্মান রক্ষায় আমরা নিজেদের জীবন তো দিতে পারি ??” তার কথায় প্রায় আরো ৬০০০ সৈন্য নিজেদের প্রান দিয়েছিলো, হিন্দুদের মান রক্ষায়। রাজধানীর দুর্গে যখন ‘রানী বাই’য়ের নেতৃত্তে চলেছে অসম যুদ্ধ, তখন তিনি দুর্গের সমস্ত নারীদের একত্রে ডেকে যা বলেছিলেন তা একমাত্র এক ‘হিন্দু নারী’ ই বলতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ——————————————————

“আমাদের সামনে যা ঘটছে আর ঘটতে চলেছে তা কোনো সভ্য সমাজে ঘটে না। আমরা কোনোদিন এই বর্বরতা প্রত্যক্ষ করিনি। আমাদের স্বামীরা এই বর্বরদের সংগে যুদ্ধ করে স্বর্গে গেছেন। তারা স্বর্গে গেছেন আমাদের রক্ষা না করতে পেরে। সেখানে তারা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। এই অসভ্যদের থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো উপায় আর নেই। এরা যা চায়, তা করা আর আমাদের স্বামীদের আত্মাকে অপমান করা সমান। আমরা তা করতে পারি না। ওই বর্বর গুলোর হাত আমাদের শরীর (যে শরীর একমাত্র আমাদের স্বামী ছাড়া কেউ স্পর্শ করতে পারেনি) স্পর্শ করার আগে আমাদের উচিত স্বামীদের সংগে স্বর্গে যোগদান করা”।

কাসিমের সৈন্যরা যখন দুর্গের অন্দরমহলে প্রবেশ করলো, তখন চারিদেকে কয়েক হাজার হিন্দু নারীর শব পড়েছিলো। প্রায় ৬০০০ হিন্দু নারী নিজেদের বিষ প্রয়োগ করে নিজেকে হত্যা করেছিলেন।

‘চাচ নামা’ সেই সময়ের ঘটে যাওয়া ইতিহাস। চাচ নামা বলে, দুজন হিন্দু নারী শুধু দাঁড়িয়ে ছিলো সেই অন্দরমহলে ৬০০০ হিন্দু নারীর শব আগলে। তারা হলো রাজা দাহিরের দুই কন্যা।

(কেনো, আর কি সে কাহিনী ??? সেটা পরে।)