বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের হীনতায় ভুগছে।।

Spread the love
সম্প্রতি সলিমুল্লাহ খানের দুটি ভিডিও আমাকে পাঠিয়েছেন কয়েকজন। সেই ভিডিওতে সুলিমুল্লাহ খান খুব রসিয়ে রসিয়ে বলছিলেন, বাঙালী মুসলমান নজরুল ইসলামের আগে সাহিত্যে “নামাজ” “রোজা” শব্দগুলো লিখতে পারত না। এই শব্দগুলোর বদলে প্রার্থনা, উপোস লেখা হত। খুব দু:খ করে বললেন, মীর মোশাররফ হোসেন তার বিষাদ সিন্ধুতে নামাজের জায়গায় ‘প্রার্থনা’, রোজার জায়গায় ‘উপোস’ লিখেছিলেন। নজরুল ইসলামই প্রথম বাঙালী মুসলমানের ভাষা কবিতায় গল্পে তুলে ধরতে শুরু করেন…।
আমার নিজের কোন ভাষা বা শব্দ নিয়ে কোন রকম এ্যালার্জি নেই। পৃথিবীর কোন ভাষাই বিদেশী শব্দ মুক্ত নয়। কিন্তু বাংলা ভাষায় প্রার্থনা উপোস না লিখে সচেতনভাবে “নামাজ” “রোজা” লেখার প্রচলন কি করে সেটা বাঙালী মুসলমানের সাহিত্যের একটা ‘নিজস্বতা’ প্রতিষ্ঠা হলো?
‘নামাজ’ ‘রোজা’ এই শব্দগুলো পার্সি। ইরানীরা মুসলমান হওয়ার আগে অগ্নির উপাসনা করত। তাদের ভাষাতে নামাজ মানে প্রার্থনা, না খেয়ে উপোস থাকাকে বলত ‘রোজা’। এ কারণেই কুরআন হাদিসের কোথাও আপনি নামাজ রোজা’র মত কোন শব্দ পাবেন না। নামাজকে আরবীতে লেখা হয়েছে ‘সালাত’, আর রোজাকে ‘সওম’। পার্সিরা ইসলাম গ্রহণ করলেও তাদের ভাষাতেই ইসলামের নিয়মগুলো পালন করত। বাঙালী কিন্তু মুসলমান হওয়ার পর তার নিজের ভাষাতে সালাত বা সওমকে প্রকাশ করেনি। যদি সালাত ও সওমের বাংলা সমার্থক শব্দ বাঙালী মুসলমান ব্যবহার করত তবে না হয় সলিমুল্লাহ খানের বলাটা স্বার্থক হতো যে নজরুল ইসলামের পর বাঙালী মুসলমান হিন্দুদের উপোস প্রার্থনার বদলে বাঙালী মুসলমানের নিজস্ব ভাষায় সাহিত্য লিখতে শুরু করে। কিন্তু আমরা দেখি বাঙালী মুসলমানের ধর্মীয় প্রথা উৎসবের নামে আরবী পার্সি উর্দু হিন্দি শব্দগুলোর প্রতিষ্ঠাকে নিজেদের ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবী করছেন!
মীর মোশারর হোসেন রোজাকে উপবাস লিখে কি এমন দোষ করেছেন? তিনি যে রোজা লিখবেন সেটা বাঙালী মুসলমানের অর্জিত নিজস্ব শব্দ ভান্ডার কি? রোজা পার্সিদের অর্জন কারণ তারা আরবী সালাত সওমের বদলে তাদের নিজস্ব ভাষাতে ইসলামী এই রিচুয়ালগুলোর শব্দ তৈরি করে নিয়েছে। বাঙালী মুসলমান কি সে গর্ব করতে পারে? পরের বাপকে নিয়ে গর্ব করার মত বাঙালী মুসলমানের ভাষা প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসলে স্পষ্টত বাংলা ভাষায় একটা সাম্প্রদায়িক ভেদরেখা টানার চেষ্টা নয়?
আজকাল অনুবাদে অহরহ দেখতে পাচ্ছি ‘শুকরিয়া’ ‘জায়েজ’। বিদেশী গল্পের অনুবাদে লেখা হচ্ছে, ‘শুকরিয়া চায়ের দাওয়াত দেয়ার জন্য’, কিংবা ‘ডিনারের পর এখানকার হোটেলগুলোতে রুম ভাড়া দেয়া জায়েজ নয়’ ইত্যাদি। আমার আপত্তির জায়গা এখানেই। আপনারা যত খুশি নিজেদের বাঙালী মুসলমানের নিজস্ব ভাষা তৈরি করেন কোন সমস্যা নেই। কিন্তু নিজেদের আইডেন্টি হিসেবে বলা শব্দগুলো কোনটাই কি আপনাদের অর্জন? এমন একটা ইসলামী বা মুসলমানী পরিচয় বহন করে তেমন বাংলা শব্দ কি আজ পর্যন্ত দেখা গেছে? আহমদ ছফা থেকে সলিমুল্লাহ খান- তাদের বাঙালী মুসলমানের নিজেদের ভাষা সাহিত্য নির্মাণের এই হচ্ছে অবস্থা!…
… এসব বললেই আমি আবার সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবো!