সুভাষ বসুকে ঘৃণা করে কারা ? কেন ? (প্রথম খন্ড)
© অরুণ মাজী Arun Maji

——————————
অনিতা বসু যখন এমিলি বসুর গর্ভে, সুভাষ বসু তখন- জার্মানীতে, এমিলিকে বসুকে রেখে জাপান চলে যান। স্বামী স্ত্রীর সেই শেষ সাক্ষাৎ। এমিলি বসু, সুভাষ বসুকে কাছে কখনো আর পায় নি। অনিতা বসু বাবাকে কখনো দেখেনি। দেশের জন্য জীবন যৌবন সংসার, আরাম নিদ্রা আহার, সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন- মহামানব সুভাষ বসু !

কলকাতা থেকে আফগানিস্তানের মধ্য দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময়, বারবার তার জীবন সংশয়ের উপক্রম হয়েছিলো। সুভাষ বসুকে জীবিত বা মৃত ধরার জন্য, ব্রিটিশরা সমস্ত দেশে তাদের গুপ্তচর লাগিয়ে রেখেছিলো। দেশের জন্য সুভাষ বসুর যে ত্যাগ, তার উদাহরণ পৃথিবীর সহস্র বছরের ইতিহাসে আর একটাও মেলে না। স্বামীহারা এমিলি বসু, বহুবার আত্মহত্যার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু কেবল সন্তানের কথা ভেবে, আর তার নিজের মায়ের (এমিলি বসুর ) সাহায্যের কারনে মরতে তিনি পারেন নি। খুন হয়ে যাওয়ার ভয়ে, জার্মানি ছেড়ে এমিলি বসু ভারত বা অন্য কোন দেশে যেতে পারেন নি। এতোটাই নির্মম আর হৃদয়বিদারক যন্ত্রণা পেয়েছিলেন সুভাষ বসু আর তার নিজের পরিবার !

তারপরও ভারতীয়দের অনেকে, ব্রিটিশদের সুরে সুর মিলিয়ে, লুকিয়ে বা প্রকাশ্যে তাকে উগ্রপন্থী বলেছে (এবং এখনো প্রচার করছে)। আমাদের বাংলার কমিউনিস্টরা আবার তাকে “তেজোর কুকুর” নামে বারবার অপমান করেছে।

ব্যাপারটা তোমরা গভীর ভাবে ভাবো- পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ শক্তিকে, একজন সামান্য সাধারণ নাগরিক যুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করছে। তাও আবার মুখোমুখি যুদ্ধে (সম্মুখ সমরে)। পাড়ার “দাদা” তোমাকে একটু চিমটি কেটে দেবে, সেই ভয়েই তুমি অন্যায় দেখেও, শামুকের মতো গুটিয়ে থাকো। আর সুভাষ বসু ব্রিটিশ ভারতের পরাধীন নাগরিক হয়ে, ব্রিটিশ শক্তির বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাও আবার বিদেশ থেকে এসে, ব্রিটিশ ভারতে ঢুকে, ব্রিটিশ সৈন্যের বিরুদ্ধে ! ভাবতে পারো ? কটা মহাকাশ বিস্তৃত তার বুকের পাটা ?

কাদের সাহসে ভর করে ? গান্ধী তো সুভাষ বসুকে কংগ্রেস পার্টি থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। দেশের জনগণ সবাই তো তখন, গান্ধী আর নেহেরুর সাথে। এমনকি আমাদের রবি ঠাকুরের- সুভাষ বসুর প্রতি যতটা স্নেহ ছিলো, তার থেকে বেশি ওনার গান্ধী প্রীতি ছিলো ! ঘরে বাইরে ভারতের সবাই, সুভাষ বসুকে তখন পরিত্যাগ করেছে। সুভাষ বসু তবুও ভারত মাতার শৃঙ্খল মুক্তিতে বদ্ধ পরিকর। 

হে ভগবান এতো নির্মম হতে পারো তুমি ? যে দেশকে পরাধীনতার গ্লানি মুক্ত করার জন্য, সুভাষ বসু তার জীবন যৌবন সংসার স্ত্রী ইত্যাদি পরিত্যাগ করেছিলেন- সেই দেশ তাকে অবহেলা, নিঃসঙ্গ অসহায়তা, অপমান ছাড়া আর কিছু দেয় নি !

সুভাষ বসু কি এতটাই মূর্খ ছিলেন, যে উনি জানতেন না- ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধে উনি পরাস্ত হবেনই হবেন ? উনি জানতেন। তবুও উনি যুদ্ধ করেছিলেন। কেন ? কারন উনি ছিলেন ভয়ঙ্কর দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ। উনি ওনার মনের শক্তি দিয়ে ভবিষ্যৎ পরিষ্কার দেখতে পেতেন। উনি বুঝেছিলেন- যুদ্ধে উনি হারবেন ঠিকই। কিন্তু সেই যুদ্ধ দেশ ব্যাপী যুব সমাজের মধ্যে, একটা কাল বৈশাখীর মতো আলোড়ন তুলবে। সেই যুদ্ধ- ব্রিটিশ শক্তির যে সমস্ত “কালো সৈনিক (ভারতীয় সৈনিক)” আছে, তাদের মধ্যে ভয়ঙ্কর এক বিদ্রোহ সৃষ্টি করবে।

বাস্তবে ঠিক তাই ঘটেছিলো। আজাদ হিন্দ বাহিনী, উত্তর পূর্ব সীমান্ত দিয়ে ভারত আক্রমণ করে নিদারুন ভাবে পরাস্ত হলো। কিন্তু তার ফল ? দেশের শিশু বৃদ্ধ যুবসমাজ সবার মধ্যে ভয়ঙ্কর এক আলোড়ন সৃষ্টি হলো। INA ট্রায়াল সেই আলোড়নকে আরও বেশি বাড়িয়ে দিলো।

ব্রিটিশ নৌবাহিনীর যে সমস্ত “কালো ভারতীয় নাবিক /সৈন্য” ছিলো, তারা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পরপর বিদ্রোহ ঘোষণা করলো। ভারতীয় কালো সৈনিক দিয়ে ব্রিটিশরা কেবল ভারত শাসনই করতো না। ভারতীয় কালো সৈনিক দিয়ে ব্রিটিশরা সারা পৃথিবী শাসন করতো। ভারতীয় কালো সৈনিকরা তখন ব্রিটিশদের হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ করছে। ভয়ঙ্কর বিশাল “কালো ভারতীয় সৈন্য বাহিনীর” মধ্যে বিদ্রোহ সৃষ্টি হলে ব্রিটিশ শক্তি যে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে, তাতে কোন সন্দেহ ছিলো না।

“কালো ভারতীয় সৈন্যদের” মধ্যে যখন বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়লো, উইনস্টন চার্চিল (তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী) তখন নিশ্চিৎ হয়ে গেলেন যে ভারতকে আর দখলে রাখা যাবে না। চার্চিল ভারতীয়দেরকে তীব্র ঘৃণা করতেন। ওনার সেই বিশ্ব বিখ্যাত মন্তব্য- “I hate Indians” আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া আর সোশ্যালিস্টরা ভুলে গেছে।  (Churchill’s remark, reported in Barnes-Nicholson, ed., The Leo Amery Diaries(London: Hutchinson, 1980), vol. II, 833)।

এই অলিখিত পরাজয়, চার্চিলের হৃদয়ে ভারতের প্রতি আরও বেশি তীব্র ঘৃণার জন্ম দিলো। উনি ওনার ডিপ্লোম্যাট আর স্ট্রাটেজিস্টদের বললেন- এমন কিছু একটা করতে, যাতে ভারতবর্ষ যুগযুগ ধরে যন্ত্রণা পেতে থাকে। শুরু হলো- “ভারত বিভাগ” অভিযান। তাতে ট্রুপের তাস কারা হবে ? গান্ধী, নেহেরু আর জিন্না।  আজও ভারত পাকিস্তান উভয়ই কেমন যন্ত্রণা পাচ্ছে তা তো চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছো।

মুসলিম আর হিন্দুরা ভারতবর্ষে যুগযুগ ধরে এক সাথে বাস করছে। ভারত বিভাগ কূটনৈতিক পরিকল্পনায়- তাদের সেই সহাবস্থান মানসিকতায় বিষ ঢেলে দেওয়া হলো। শুরু হলো- হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে, আর এক অন্তহীন রক্তক্ষয়ী হিংসা আর দাঙ্গা। সেই যুদ্ধ আজও চলছে। ভবিষ্যতেও চলবে। কেন ? সে কারন পরে কখনো বলবো।

এবার তোমরা ভাবো, কার শক্তিতে ভারত স্বাধীনতা পেয়েছে ? গান্ধী অথবা নেহেরু ? সঠিক উত্তর হয়তো তোমরা জানো। যদি না জানো- তো উত্তর জানার জন্য দ্বিতীয় খন্ডের অপেক্ষা করো তোমরা। ভারতীয়রা তাদের নিজেদের সঠিক ইতিহাস জানে না। আমার মতো তোমরা সকলেই তা জানতে চাও। তাই না ? তাই যদি হয়, একে অপরকে এই ইতিহাস জানতে সাহায্য করো।