আমেরিকা জেরুজালেমকে ইজরায়েলের রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দেয়ায় বাংলাদেশে বিক্ষোভ দেখালো মুসলমানরা। বাজি রেখে বলতে পারি এদের পেটে বোম মারলেও জেরুজালেম তো ছাড়, পৃথিবীর মানচিত্রে ইজরায়েল নামক দেশটা কোথায় অবস্থিত সেটাও এরা দেখাতে পারবেনা।

ইজরায়েলের অবস্থান এরা জানেনা,  জেরুজালেমকে রাজধানী হিসাবে স্বীকৃতি দিলে এদের কিছু এসেও যায়না, তবুও এরা বিক্ষোভ দেখাতে জমায়েত হয়েছে। কেন? কারণ, তাদের সমাজের ধর্মগুরুরা বলেছে যে এটা তাদের ফরজ। ইজরায়েল ও আমেরিকার বিরোধিতা করা মুসলমানদের ফরজ, মুশরিকদের ধ্বংস করা মোমিনদের ফরজ, কৌমের জন্যে জাকাত দেয়া মোমিনদের ফরজ, দার-উল-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা মোমিনদের ফরজ।

এরকম অসংখ্য ফরজ-র বাঁধুনিতে বাঁধা আছে মুসলমান সমাজ। ফরজ মানে আরবি শব্দ ফর্জের অপভ্রংশ, যার মানে কর্তব্য। প্রত্যন্ত কোন গ্রামের এক অশিক্ষিত মুসলমান আমেরিকা বা ইজরায়েল না চিনতে পারে, দেশের ডেমোগ্রাফি না জানতে পারে কিন্তু তার ফরজ কি, সেটা সে জানে। আর সেটা তাকে জানায় তার ধর্মগুরু, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। প্রতি শুক্রবার নামাজের পরে তাদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে উপদেশ দেয় তাদের ধর্মগুরুরা। তাই ইতিহাস, ভূগোল, সমাজনীতি বা অর্থনীতির জ্ঞান না থাকলেও নিজেদের ফরজ থেকে বিরত হয়না মুসলিম সমাজ।

উল্টোদিকে হিন্দু ধর্মগুরুদের দেখুন, তাদের মধ্যে কতজন আছেন যারা তাঁদের শিষ্যদের সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে শিক্ষা দেন? রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ থেকে শুরু করে লোকনাথ বাবা, বালক ব্রহ্মচারী, অনুকূল ঠাকুর- এদের মধ্যে কতজন তাঁদের ভক্তদের সমাজের আশু বিপদ সম্পর্কে সচেতন করেন? কতজন নিজেদের ভক্তদের সমাজকে রক্ষা করার শিক্ষা দেন? আমরা ১৬ বার সোমনাথ মন্দির ধ্বংস হওয়ার পরেও সেটার পুনঃনির্মান নিয়ে গর্ব করি কিন্তু একবারও ভাবিনা যে একবার, দুইবার, তিনবার ধ্বংস হওয়ার পরে সেই মন্দিরের পুনরায় নির্মানকল্পে যে অর্থব্যয় করা হয়েছে সেই অর্থ দিয়ে মন্দির রক্ষার সৈন্যদল তৈরি করা হলনা কেন? কেন মন্দিরের বিপুল ঐশ্বর্য কেবল রাজানুগ্রহে ছেড়ে দেয়া হলো? মনে রাখতে হবে, শিবাজী যখন হিন্দুপদপাদশাহী স্থাপনের জন্যে মুঘলদের সাথে লড়াই করছেন তখন বারবার আবেদন সত্ত্বেও সুরাটের ব্যবসায়ীরা তাঁকে অর্থ সাহায্য করেনি (ভীম শাহ ব্যতিক্রম), তাই তাঁকে বাধ্য হয়ে বারবার সুরাট আক্রমণ করতে হয়েছিল।

হিন্দুদের সেই ট্র‍্যাডিশন আজও চলে আসছে। রামদাস বা চাণক্যর মত গুরু হিন্দু সমাজে বিরল। অধিকাংশ গুরুই ভক্তদের ব্যক্তিগত লাভ, ব্যক্তিগত মোক্ষ ইত্যাদি নিয়ে প্রবচন দিতে আগ্রহী, এতে ঝুঁকি কম, আয় বেশী। তাই সুখের সময় যে গুরুর আশ্রম ভক্তসমাগমে পূর্ণ থাকে, স্বয়ং গুরু যখন নিজে বিপদে পরে তখন সে তাঁর নিজের শিষ্যদেরও পাশে পান না। কারণ গুরু যে নিজেই তার ভক্তদের আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। তাই আশারাম বাপুর মত গুরু বছরের পর বছর ধরে বিনা চার্জশীটে আটক থাকলেও ভক্তদের কোন প্রতিক্রিয়া হয়না, উল্টোদিকে একটি সাধারন মসজিদের ইমাম গ্রেপ্তার হলেও এলাকায় র‍্যাফ নামাতে হয়। তাই মোল্লার ভয়ে অনুকূল ঠাকুর পূর্ব পাকিস্তান থেকে দেওঘর পালিয়ে আসলেও ভক্তদের ইসলামিক আগ্রাসন সম্পর্কে সচেতন করেননা। রামকৃষ্ণ মিশনের সেকুলারিজম তো এখন কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌছে গেছে যদিও এত সেকুলারিজমের ভেঁপু বাজিয়েও বাংলাদেশে খোদ নিজেদের আশ্রমের সাধুর নিরাপত্তা তারা নিশ্চিত করতে পারেনা।

সমাজের যেকোন খারাপের জন্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করা আমাদের সহজ অভ্যাস। দলগুলির নির্লজ্জ মুসলমান তোষণের জন্যে আমরা তাদের সমালোচনা করতেই পারি কিন্তু যে প্রক্রিয়ার ফলে মুসলমান সমাজ নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে পারে, হিন্দু সমাজ সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে কি?