জঙ্গি সৃষ্টির কারখানা কোথায়?
………………………………….
গোটা আফ্রিকা কেঁপে উঠে বোকো হারামের নাম শুনলে! বোকো হারাম বলতে যে ইসলামিক জঙ্গি গোষ্ঠির নাম আমরা জানি এটি আসলে তাদের সংগঠনের নাম নয়। তাদের সংগঠনের নাম ‘জামা’আতু আহলিস সুন্নাহ লিদ-দা’ওয়াতি ওয়াল জিহাদ’। লোকজন তাদের বোকো হারাম বলে ডাকে কারণ তারা পশ্চিমা শিক্ষা বিরোধী বলে। নাইজিরিয়ান স্থানীয় ভাষায় ‘বোকো’ শব্দের অর্থ পশ্চিমে যাওয়া। আর আরবী ‘হারাম’ শব্দের অর্থ নিষিদ্ধ। দুটো মিলে অর্থ দাঁড়ায় ‘পশ্চিমা শিক্ষা হারাম’। এদের এই নামে স্থানীয়রা ডাকতে শুরু করে কারণ তারা পশ্চিমি শিক্ষার ঘোরতর বিরোধী। এই বোকো হারাম যিনি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি একজন ইসলামিক আলেম অর্থ্যাৎ মাদ্রাসায় পাশ করা মুফতি। তার নাম শায়খ মুহাম্মদ ইউসুফ। তিনি ২০০২ সালে কুফরি শিক্ষা ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে ইসলামি দ্বিনী শিক্ষা ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষে একটি মাদ্রাসা চালু করেন। নাইজিরিয়া এবং আফ্রিকার আশেপাশের মুসলিমরা তার মাদ্রাসায় এসে ভর্তি হতে থাকে এবং খুব দ্রুত তার মাদ্রাসার নাম প্রচার হতে থাকে। এই মাদ্রাসার ছাত্ররাই সশস্ত্র জিহাদের সূচনা করে নাইজিরেয়াকে ইসলামিক খিলাফতে পরিণত করতে। তাদের সশস্ত্র জঙ্গি তৎপরতা এতখানি বেড়ে যায় যে নাইজেরিয়ান সরকার সেই মাদ্রাসায় সেনা অভিযান চালাতে বাধ্য হয়। শুরু হয় সরকার ও বোকো হারাম ওরফে ‘জামা’আতু আহলিস সুন্নাহ লিদ-দা’ওয়াতি ওয়াল জিহাদ’ দলের গৃহযুদ্ধ। একের পর এক নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়ে বোকো হারাম বিশ্ব মিডিয়ার সংবাদ শিরোনাম হতে থাকে। আইএসের উত্থানের আগে বোকো হারাম এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিশ্ববাসীকে চেয়ে চেয়ে দেখতে বাধ্য করল ‘যৌনদাসীকে’ কিভাবে বিক্রি করতে হয় নিলামে। ঘটনাটি ঘটে নাইজেরিয়ার একটি বালিকা বিদ্যালয়ের সমস্ত খ্রিস্টান ছাত্রীদের তুলে নিয়ে যায় বোকো হারাম এবং সেই ছাত্রীদের সকলকে যৌনদাসীতে পরিণত করে নিজেরা ভোগ করে বিক্রিও করে দেয়। এই বর্বর ঘটনাটি বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। বোকো হারামের একজন শীর্ষ নেতা এই বর্বরতার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, নাইজেরিয়ান সরকার বোকো হারামের সদস্যদের পরিবার পরিজনকে যে হেনস্তা করেছে এটি ছিলো তার প্রতিশোধ। খেয়াল করে দেখেন এটি কিন্তু মদিনাতে নবী মুহাম্মদের দল যখন বাণিজ্য কাফেলাগুলোতে হামলা চালিয়ে ব্যবসায়ীদের সর্বস্ব লুট করতে লাগল তখন মুহাম্মদ হুবহু এই দাবী করেছিলো যে, আমার দলের লোকজন হিজরত করায় তাদের সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্ত করার প্রতিশোধ নিচ্ছে তার দল…। যাই হোক, বিশ্ব জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের অন্যতম শক্তি বোকো হারাম যে মাদ্রাসার ছাত্রদের নিয়ে গড়া সেটি বোধহয় অনেকেই জানেন না। আর যারা জানেন তারা সব সময় এই তথ্যটি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, মাদ্রাসায় জঙ্গি সৃষ্টি হয় না।

মিশরীয় প্রখ্যাত ইসলামিক আলেম শেখ আবদুল্লাহ আজ্জামের অত্যন্ত প্রিয় শিষ্য ছিলেন মোল্লা মোহাম্মদ ওমর ও ওসামা বিন লাদেন। এর মধ্যে লাদেন আধুনিক শিক্ষা মাধ্যমে যেটাকে ইসলামিকরা কুফরি শিক্ষা ব্যবস্থা বলে সেরকম শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন। কিন্তু আগে থেকে ইসলামের প্রতি আগ্রহ এবং পরবর্তীকালে শেখ আবদুল্লাহ আজ্জামের সঙ্গে সাক্ষাৎ তার জীবনকে জিহাদের রাস্তায় ব্যয় করার জন্য প্রস্তুত করে দেয়। এখানে দেখা গেলো সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং  পড়তে গিয়ে বিন লাদেন জিহাদ কতল শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সিলেবাসে এসব থাকেও না। আমাদের দেশের ইসলাম প্রেমিক নেতারা বলেন, ইংরেজি শিক্ষা মাধ্যমের ছাত্ররাই জঙ্গি হয়, তাদের কথার ভাবটা এমন যেন এসব স্কুল-কলেজেই জঙ্গি হবার শিক্ষা দেয়া হয়। কিন্তু এসব স্কুল-কলেজে যদি শেখ আবদুল্লাহ আজ্জামের মত কেউ থাকে তাহলে ডাক্তারী পড়েন আর ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েন- জঙ্গি হতে সমস্যা কোথায়? বিন লাদেন শেখ আবদুল্লাহ আজ্জামের শিষ্যত্ব নিয়ে ইসলামিক খিলাফত কায়েম করতে প্রতিষ্ঠা করেন আল কায়দা নামের সশস্ত্র জিহাদী গ্রুপ। এদিকে মোল্লা মোহাম্মদ ওরম তার শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় মাদ্রাসায় দ্বিনী শিক্ষা ব্যবস্থায়। আফগানিস্থানের দারুল উলুম হাক্কানি মাদ্রাসায় তার শিক্ষা জীবন শুরু হয়। তার প্রথম গুরু নেক মোহাম্মদের জিহাদী গ্রুপ হরকাত-ই-ইনকিলাব-ই-ইসলাম’-এ যোগদান করে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জিহাদের অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে মোল্লা ওমর পাকিস্তানের কুয়েটা শহরে এক মাদ্রাসায় শিক্ষাকতা শুরু করেন। এরপর করাচির বিনুরি মসজিদে কয়েক বছর ইমামতি শুরু করেন। সেখানেই তার সঙ্গে বিন লাদেনের প্রথম সাক্ষাৎ। তারপর দুজনের অভিন্ন গুরুর পরামর্শে একজন আল কায়দা অন্যজন তালেবান গঠন করেন। মোল্লা ওমর নিজের হাতে গড়া মাদ্রাসার ছাত্রদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন বিশ্বে ত্রাস জাগানিয়া ইসলামিক জঙ্গি সংগঠন তালেবান। এই তালেবান পুরো একটা দেশ দখল করে নিয়ে রাতারাতি আফগানিস্থানকে সপ্তম শতাব্দীতে নিয়ে যায়। যে আফগানিস্থান ছিলো একসময় আধুনিক, যে দেশের নারীরা একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করত তালেবান সরকার তাদের গরু ছাগুলের মত বেত্রাঘাত করতে শুরু করল বেপর্দার অভিযোগে। আফগানিস্তানী নারীদের বোরখা কেমন সেটি দেখলে সবার বুঝতে কষ্ট হবে না কেমন কঠর শাসন তালেবান চালু করেছিলো। বলাই বাহুল্য সবটাই কুরআন ও সুন্নার আলোকে। এই বিন লাদেন ও মোল্লা ওমরকে একদা আমেরিকা তার বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও তেল বাণিজ্যের স্বার্থে তাদের আর্থিক সহায়তা দিলেও এই সশস্ত্র জিহাদের জন্য সাম্রাজ্যবাদী মার্কিনদের দায়ী করাটা অন্ধে হস্তি দর্শনের মতই অজ্ঞতা মাত্র। কারণ ইসলামিক স্কলারদের বিশুদ্ধ ইসলামিক দর্শন ও কুরআন হাদিসের সরাসরি নির্দেশকে ফলো করে এইসব ইসলামিক জঙ্গি দলগুলোর জন্ম লাভ হয়েছে। এবং এগুলোর সবটাই মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। যে কারণে নাইজেরিয়া সরকার বহু মাদ্রাসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। পাকিস্তান সম্প্রতি ১৮২টি মাদ্রাসা বন্ধ করে দিয়েছে জঙ্গিবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে। উল্টো সুর কেবল বাংলাদেশে। এখানে জঙ্গিবাদের উত্থানের পর উল্টো মাদ্রাসা শিক্ষায় পৃষ্ঠপোষকতা দিতে শুরু করেছে সরকার। সরকারী নেতারা মাদ্রাসা শিক্ষার পক্ষে ঢালাওভাবে পক্ষালম্বণ করতে শুরু করে। হাটহাজারী মাদ্রাসাকে সরকারের উপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেয়া হয়। অথচ ইতিহাস বলছে সমস্ত জঙ্গিবাদের কারখানাই হচ্ছে মাদ্রাসা। বোকো হারাম, তালেবান এখানে সবচেয়ে বড় উদাহরণ।