খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবে এদেশের হিন্দুদের অবস্থা ঠিক কী হয়েছিল তা আমাদের আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন ।

Spread the love

#খ্রিস্টদুষ্ট_পর্ব_১

মধ্যযুগের ইতিহাস থেকে আমরা ইসলামী প্রভাবে হিন্দুদের অবস্থার কথা জানি এবং সে বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা করি ।কিন্তু তেমনি আধুনিক যুগে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রভাবে এদেশের হিন্দুদের অবস্থা ঠিক কী হয়েছিল তা আমাদের আলোচনা করা একান্ত প্রয়োজন ।আজ সে বিষয়ে আলোচনা সূচিত হল।

ষোড়শ সপ্তদশ শতকে পর্তুগিজরা বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্যের উপলক্ষে বসবাস করতে আরম্ভ করলে বাংলায় রোমান ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্ম প্রচার আরম্ভ হয় । সপ্তগ্রাম ,চট্টগ্রাম ,ব্যান্ডেল, হুগলিতে পর্তুগিজরা বাণিজ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। ক্রমে এই সমুদয় স্থানে, বিশেষত হুগলিতে, বহু পর্তুগিজ ও ইউরোপিয়ানরা স্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করে । পর্তুগিজরা মরুবাসীদের মতই দস্যু প্রকৃতির ছিল। যে এলাকায় বসবাস করত সেই এলাকার মানুষদের উপর অত্যাচার করত। এছাড়াও জোর করে এলাকাবাসীকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করত।

তারা গর্ব করতো যে সমস্ত প্রাচ্য ভূখণ্ডে তারা দশ বছরে যত ভারতীয়কে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে হুগলিতে এক বছরে তার চেয়ে বেশি লোক খ্রিস্টান হয় । কিন্তু শাহজাহানের হারেমের দুই বাঁদি কে অপহরণ করার ফলে 1632 খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা বিতাড়িত হয়।

পর্তুগিজ মিশনারীরা  ধর্ম প্রচারের জন্য বাংলা শিখেছিল । এরপর বাংলা ভাষায় বিভিন্ন খ্রিস্ট গ্রন্থ রচনা করত।   একটি কাহিনী প্রচলিত আছে যে,” 1783 খ্রিস্টাব্দে রচিত “ব্রাহ্মণ রোমান ক্যাথলিক সংবাদ” গ্রন্থের রচয়িতা ডোম এন্টোনিও রোজারিও নামক খ্রিস্টধর্মান্তরিত এক বাঙালি হিন্দু ঢাকার নিকটবর্তী অঞ্চলে 200000 দরিদ্র ও অন্তজশ্রেণীর হিন্দুকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে ।

কিন্তু এদের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে এই নিয়ে দুই পাদ্রীর মধ্যে বিবাদ সূচিত হয় এবং তার ফলে এরা সকলেই হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গে দরিদ্র শ্রেণীর কিছু মানুষ বহু  খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশি নয়। ইংরাজ রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙ্গালীদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রভাব খুব সামান্যই ছিল।  তবে বহু পর্তুগিজ এই দেশের স্ত্রী লোকদের তুলে নিয়ে গিয়ে বা জোর করে বা ভালোবাসায় ভুলিয়ে বিবাহ করায় বৃহৎ একটি বাঙালি খ্রিস্ট সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল।

পর্তুগীজদের পরে ইউরোপ থেকে ওলন্দাজ ও ইংরেজ কোম্পানি ভারতে এসে বাণিজ্যের প্রাধান্য  বিস্তার ঘটায় । কিন্তু তারা ধর্মপ্রচারে স বিপক্ষে ছিলেন।  যে রাজকীয় সনদের বলে ইংরেজ বা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে বানিজ্য করবার অধিকার পেয়েছিল ,তাতে স্পষ্ট নির্দেশ ছিল যে তারা ভারতে কোন রকম ভাবে মিশনারী পাঠাতে পারবে না। 

এত বাধা সত্বেও উইলিয়াম কেরি নামে একজন ইংরেজ পাদ্রী ডেন দেশীয় জাহাজে 1793 সনে ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে কলকাতায় উপস্থিত হন। এই উইলিয়াম কেরি একজন দরিদ্র মুচির পুত্র ছিলেন এবং যথেষ্ট উৎসাহ ও অধ্যবসায় স্বত্বও ধর্ম প্রচারে সম্পূর্ণ বিফল হলেন। কিছুদিন পরে তাঁর আহবানে আরো চারজন ইংরেজ এক অ্যামেরিকান জাহাজে কলকাতায় পৌঁছলেন।।কিন্তু ইংরেজ গভর্নর তাদের কলকাতায় নামতে না দেওয়ায় তারা ডেন জাতি অধিকৃত শ্রীরামপুর অঞ্চলে চলে গেলেন এবং কেরি ও সেখানে তাদের সঙ্গে যোগ দিলেন ।এই রূপে কলকাতার নিকটবর্তী শ্রীরামপুরে প্রোটেস্টান্ট খ্রিস্টান মিশনারীদের একটি কেন্দ্র স্থাপিত হলো।

1800 সনে কৃষ্ণ চন্দ্র পাল নামে এক ছুতার মিস্ত্রির হাত ভেঙে গেলে টমাস নামে এক মিশনারি ডাক্তারের চিকিৎসায় সে আরোগ্য লাভ করে। সেই সর্বপ্রথম খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করে। এর পূর্বে সাত বছরের মধ্যেও একটি বাঙালি হিন্দু কেও কেউ খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত করতে পারেনি ।সুতরাং এই ঘটনায় সমস্ত মিশনারীরা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে এবং টমাস উন্মাদের মত আচরণ করতে শুরু করে। ফলে তাকে পাগল বলে আটক করে রাখা হয়।

বিলেতে একদল লোকের চেষ্টায় ভারতে ইংরেজ মিশনারীদের ধর্ম প্রচারে জযে নিষেধাজ্ঞা ছিল 1814 রহিত করা হয়। সুতরাং শ্রীরামপুরের প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিদের ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্র বাংলায় এবং বাংলার বাইরে বিস্তার লাভ করে। 1818 সনে 126 টি দেশীয় ভাষা শিক্ষার বিদ্যালয়ের প্রায় 10 হাজার ছাত্র পড়ত। তারা সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্ট ধর্ম শিক্ষা লাভ করত । 1821 শ্রীরামপুর কলেজের প্রতিষ্ঠা হয়।

1814 সনের পর থেকে ব্যাপক হারে missionary এই বঙ্গে আসতে শুরু করে ।কলকাতায় একজন পাদ্রী নিযুক্ত হলেন । এর ফলে প্র এবং প্রধানত বিদ্যালয় , হাসপাতাল এগুলির দ্বারা  দরিদ্র শ্রেণীর হিন্দুরা প্রলুব্ধ হয়ে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করল। কিন্তু তাদের সংখ্যা খুব বেশি হয়নি।

1817 হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা হয় এবং 1835 সরকারি নতুন ব্যবস্থা ইংরেজি শিক্ষার প্রসারের ফলে উচ্চ শ্রেণীর হিন্দুদের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্মের প্রতি আশক্তি বৃদ্ধি পায় । মধুসূদন দত্ত , কৃষ্ণমোহন বন্দোপাধ্যায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে।

পূর্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্তৃপক্ষ এ দেশে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের বিরোধী ছিলেন । ক্রমে ক্রমে তাদের মত সম্পূর্ণ পরিবর্তন হল।  1813 সনের সনদে দেওয়া হল মিশনারীদের এদেশে বসবাস ও ধর্ম প্রচারের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা । ফলে  ব্যাপক হারে মিশনারি এ দেশে আসতে শুরু করল ও ইংরাজ কর্মচারীগণ পরোক্ষভাবে হিন্দু ধর্মের সমর্থন করে আসছিল তার বিরুদ্ধে তারা বিরোধিতা করতে শুরু করল ।

এক্ষেত্রে বলে রাখি এর পূর্বে ইংরেজ সরকার পক্ষ থেকে, কিন্তু হিন্দু মন্দিরের ভার গ্রহণ করা ,অনাবৃষ্টি হলে তার নিবারনের জন্য ব্রাহ্মণদের দ্বারা পুজো করানো ,সরকারী দলিলপত্র শ্রী লেখা ,গনেশ নাম উচ্চারণ করা ,হিন্দুদের নানা ধর্মউৎসবে সরকারি কর্মচারীদের যোগদান দেওয়া এবং সেই উপলক্ষে শোভাযাত্রা সামরিক বাদ্য বাজানো, হিন্দু উৎসব উপলক্ষে কামান দাগা ইত্যাদি কার্যাবলী গুলো হতো।

ক্রমশঃ

বাংলাদেশের ইতিহাস : রমেশচন্দ্র মজুমদার