“ধর্ম কি এবং কেনো?”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

বেদ বিশুদ্ধ জ্ঞান ভান্ডার। কালের অমোঘ নিয়মে সব কিছুই যেমন হারিয়ে যায় ,ঠিক তেমনি কালের কুঠারাঘাতে বেদ ভিত্তিক জ্ঞান আজ প্রায় হারিয়ে গেছে।বৈদিক জ্ঞান ভান্ডার আজ কালিমা লিপ্ত হয়ে পড়েছে। বৈদেশিক ধর্ম এবং ভীন দেশী সংষ্কৃতির আক্রমন, উত্থান এবং নিষ্ঠুরতার চাপে, সেই বৈদিক জ্ঞান আজ কলুষিত।

যে জাতির পুর্বপুরুষগন এই ‘মহাজ্ঞান’ পৃথিবীকে দিয়ে গেছেন, সেই জাতির অধঃস্তন পুরুষ আজ নিজেই অস্তিত্বের সংকটে। সংকটের এই আবর্ত না কেটে গেলে, বৈদিক সভ্যতার পুনরুত্থান না হলে, হয়তো অনেক প্রাচীন সংষ্কৃতি ,প্রাচীন ধর্ম বা জ্ঞান ভান্ডারের মতো এই বৈদিক জ্ঞান, ধ্যান ধারনাও একদিন চিরতরে এই পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে যাবে। উদ্ধারের আর কোনো উপায় থাকবে না। সাম্প্রতিক উদাহরন, অসুরদের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যাওয়া ‘বেমিয়ানের বুদ্ধ মুর্তি’। আজ থেকে কিছুদিন পর আর কেউ মনেও রাখবে না সেই কথা।

যুগে যুগে এক সংঘাত আসে। সেই সংঘাতের দুই পক্ষ। সংঘাত ‘ধর্মোময় মহাদ্রুমঃ’ আর ‘মন্যুময় মহাদ্রুম’। ধর্মোময় অর্থ্যাৎ যে পক্ষ ধর্মকে আশ্রয় করে থাকে। ‘মন্যু’ কথাটার অর্থ ‘মানব দৈন্য, ক্রোধ, অহংকার, ক্ষুদ্রাশয়তা। ঈশ্বর স্বয়ং আসেন সেই ‘ধর্মোময় মহাদ্রুম’ এর পক্ষে (মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ), আর অপরপক্ষ ‘মন্যুময় মহাদ্রুম’ এর পক্ষে পান্ডব বিরোধী রথী মহারথীরা।

সৃষ্টির মুলেই এই দ্বন্ধ বা সংঘাত। উপনিষদ তাই বলেন, “দ্বয়া হ প্রাজাপত্যা’, দেবাশ্চ অসুরাশ্চ”। প্রজাপতির (সৃষ্টি কর্তা) দুই সন্তান। দৈব গুন সম্পন্ন দেবতারা অন্যদিকে আসুরিক গুনসম্পন্ন অসুরগন ( শ্রীগীতার ১৬ তম অধ্যায় দেবাসুর যোগ দ্রষ্টব্য) বা অমৃত কুম্ভের জন্য দেবাসুরের মহাসংগ্রাম। উপনিষদ আরো বলেন, “জ্যায়াংসো অসুরাঃ কনীয়াংসো দেবাঃ”। অর্থ্যাৎ অসুরদের পক্ষেই বেশী মানুষ, দেবতারা সংখ্যালঘু। কিন্তু এই কথা টাও একটি আপ্ত্যজ্ঞান, “যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ, যতো কৃষ্ণস্ততো জয়ঃ”—- যেখানে ধর্ম সেখানেই জয়, যেখানে কৃষ্ণ সেখানেই জয়। শ্রীকৃষ্ণ কখনো নিজে যুদ্ধ করেন না। ধার্মিকদের পক্ষে থেকে তাদের দিয়েই যুদ্ধ করান এবং সেই পক্ষেরই জয় হয়।

মানুষের নিজের চেষ্টা বা পুরুষাকারের (প্রতিভু দুর্য্যোধন) সব আস্ফালন এক সময় স্তব্ধ হয়ে যায় কোনো এক অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে।

“দুঃখ যে পায়নি সে সুখের অধিকারী নয়”। দুঃখ কষ্ট জীবনের শেষ পরিনতি নয়। মানুষ নিজের উদ্ধত অহমিকার আড়ালে মুল চালিকা শক্তিকে অস্বীকার করে, কিন্তু একদিন পরাজিত হয়ে হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে। নিজে কর্তা না সেজে  অদৃশ্য এই শক্তির কাছে নিজেকে, নিজের সব চেষ্টা সমর্পন করতে পারলেই এবং এই অদৃশ্য শক্তি নিজের অন্তরে যখন যে কর্ম করতে বলে দেয় ,যে পথে চলতে বলে, ধর্ম বোধে অটল থেকে পরম উৎসাহে একাগ্র চিত্তে সেই কর্ম করে গেলেই জীবনে সাফল্য আসে, মনে শান্তি এবং আনন্দ আসে।

আমরা ধর্ম আচরন করি সুখের আশায়, পুন্য কাজের অনুষ্ঠান করি স্বর্গ সুখ লাভ করার লালষায়। কিন্তু ভুলে যাই—-

“ধর্ম নহে সম্ভোগের হেতু,
নহে সে সুখের ক্ষুদ্র সেতু,
ধর্মেই ধর্মের শেষ”।।
******************************