ভূমিকাঃ ১৯৪৬’এর ১০ই অক্টোবর কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার দিন নোয়াখালির বিখ্যাত
রায়চৌধুরী পরিবারে অর্থাৎ ‘রায়সাহেব’ রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর জমিদারীতে
ঘটে যাওয়া ‘গণহত্যা’র ঝড় অন্যান্যদের মত সেই পরিবারের গৃহবধূ কিরণপ্রভা রায়
চৌধুরীর জীবনের উপর দিয়েও বয়ে যায়। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া কলকাতার
‘প্রত্যক্ষ সংগ্রামের’ (১৬ই আগষ্ট, ১৯৪৬) প্রতিক্রিয়া নিজ পরিবারে কি বীভৎস
আকার নিয়েছিল তার একটুকরো জ্বলন্ত দলীল এই “ডাইরীর কটা খোলা পাতা”।….

যা রয়ে গেছে তার মানসকন্যা ‘সায়াহ্নের প্রচেষ্টা’য় স্মৃতি-কথা রূপে — এবং
– সেটিই পরবর্তীকালে উক্ত বংশেরই পরবর্তী বংশধর শ্রী শিবাশীষ রায়চৌধুরী
(পৌত্র), ধর্মব্রত রায়চৌধুরী(পুত্র) এবং শুভঙ্কর রায়চৌধুরী (প্রপৌত্র)
কর্তৃক প্রকাশিত হয়।
লেখিকা পরিচয়ঃ নোয়াখালি জেলার ফেনী’র বিখ্যাত
আইনজীবী স্বর্গত শ্রীশচন্দ্র মজুমদার ও প্রয়াত সরলা সুন্দরী দেবীর একমাত্র
কন্যা কিরণপ্রভা রায় চৌধুরী। জন্ম- ১৯০৮ সাল। স্কুল শিক্ষা কুমিল্লা
মিশনারী বালিকা বিদ্যালয়ে।
মাত্র বারো বছর বয়েসে ১৯২০ সালে
নোয়াখালি জেলার বিখ্যাত ‘রায়বাহাদুর’ মহীমচন্দ্র রায়চৌধুরী (আইনজীবী) ও
তেজস্বিনী বসন্তকুমারী রায়চৌধুরানী’র পরিবারে বধূরূপে প্রবেশ। স্বামী
পরিবারের আইনজীবী স্বর্গত দেবেন্দ্রকুমার রায়চৌধুরী।
স্মৃতি-কথায় তিনি উল্লেখ করেছেন, —
“এই যে প্রাসাদ, অট্টালিকা হয়েছে নির্মাণ
তোমার পূর্বপুরুষগণ কত দেহ করে গেছে দান
তুমি কম কিসে ভাই”—মনের কথা:
“যাহা মনে আসে, তাই লিখে যাই
কেহ পড়ুক, না পডুক কোন ক্ষোভ নাই।
আমি জানি – যখন থাকব না আমি
আমার এই তুচ্ছ লেখা
কারো কারো কাছে
হবে তখন অনেক অনেক দামী।”
ভূমিকা ও সংকলক পরিচিতিঃ
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ইংল্যান্ডের নব নির্বাচিত শ্রমিক সরকার, ভারতে
ক্যাবিনেট মিশন, অন্তর্বর্তী সরকারে নেহেরু জিন্না তথা কংগ্রেস ও মুসলিম
লীগের দড়ি টানাটানি, লীগের ভারতের মধ্যে মুসলমান স্থান পাকিস্তানের জন্য
হিন্দু বিরোধী প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পরীক্ষা, কলকাতা-নোয়াখালি-বিহার
প্রভৃতি স্থানে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও সব শেষে ১৫ই অগাষ্ট ১৯৪৭ সালের মধ্য
রাত্রে with destiny যাত্রা – এই সকল ঘটনাবলী তৎকালীন ভারতবর্ষের সমস্ত
পরিবারের উপর দিয়ে ঝড়ের মত বয়ে গেল।

 ভারতের নেতৃবৃন্দও দেশভাগের মধ্য
দিয়ে আত্মতুষ্টি লাভ করল। শুধু যে যে পরিবারের ভাঙন-ক্ষত স্থায়ী হয়ে
গেল। যার কোন প্রলেপ হয় না, শুধু নিরবে সেই ক্ষত বয়ে নিয়েই সময়ের সাথে
সাথেই পথ চলা।
এরকমই একটি পরিবার। নোয়াখালির বিখ্যাত আইনজীবি
‘রায়সাহেব’ রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরী তথা ‘রায়বাহাদুর’ মহিমচন্দ্র
রায়চৌধুরীর একান্নবর্তী জমিদার পরিবার। সেই পরিবারের উপর দিয়ে প্রথম ঘটে
যাওয়া নব-তান্ডব লীলার পরবর্তীকালের ঘাত-প্রতিঘাতে ভারতবর্ষে জাতীয়
নেতৃবৃন্দ এক প্রকার অসহায় হয়ে একমাত্র ভারত-পাকিস্তানের বিভাজনের মধ্যেই
সমাধান খুঁজে পান। জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী অস্থির হয়ে নোয়াখালির
ভয়াবহতা পরিদর্শনে আসেন শান্তিবারি নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়ীক
সমস্যার সমাধান কল্পে। তার এই একক প্রচেষ্টার সফলতা ও ব্যর্থতার মূল্যায়ণ
লুকিয়ে রয়েছে মুসলীম লীগ, নেতা জিন্নার দ্বি-জাতী তত্ত্বের মাধ্যমে
ভারত-পাকিস্তান, পূর্ব পাঞ্জাব – পশ্চিম পাক-পাঞ্জাব, পশ্চিম বাংলা ও পূর্ব
পাক-বাংলা প্রভৃতি সহ ভারতবর্ষের এক ব্যাপক ভাঙা-গড়ার মধ্যেই।
নোয়াখালির এক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা, যেখানে তৎকালীন ভারতবর্ষের ভিন্ন ভিন্ন
ধারায় রাজনীতির অস্তিত্বের পরিপক্কতা থাকা সত্ত্বেও সে সবেরই পরাজয় ঘটে
সংখ্যা গরিষ্ঠের “পাকিস্তানের আদর্শগত কারণে। সেই জন্য নোয়াখালি আজও এক
বিরাট রাজনৈতিক গবেষণার বিষয়। এই নোয়াখালির মাটিতেই লালিত-পালিত ভারতের
কমিউনিষ্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মুজাফফর আহমেদ, কমিউনিষ্ট-সাহিত্যিক
গোপাল হালদার, সুভাষচন্দ্র বসুর ফরওয়ার্ড ব্লকের নগেন্দ্ৰ গুহরায়,
আর.এস.পি.’র মাখন পাল, গান্ধী কংগ্রেসের হারানচন্দ্ৰ ঘোষ চৌধুরী ইত্যাদি
প্রমুখের নেতৃত্বে ভারতের ভিন্ন ধারার রাজনীতির চর্চাসহ ব্রিটিশ বিরোধী
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে চরম ও নরম পন্থী ধারায় আন্দোলনের বাতাবরণের
মধ্যেই ১৯৪৬ সালের নোয়াখালিতে কি ভাবে সে সবের পরাজয় ঘটে গোটা সমাজটাই
হিন্দু মহাসভার ও নোয়াখালি বার এর সভাপতি ‘রায়সাহেব’ রাজেন্দ্রলাল
রায়চৌধুরী ও মুসলিম লীগের গোলাম সরোয়ারের মধ্যে বিভাজিত হয়ে গিয়ে ভারতভাগের
অর্থাৎ ভারত-পাকিস্তান গঠনের মধ্য দিয়ে আত্মতুষ্টি লাভ করে লক্ষ লক্ষ
মানুষকে দেশান্তরী করল – সেই নোয়াখালি আজও এক বড় রাজনৈতিক শিক্ষা ও গবেষণার
বিষয়।
মুসলিম লীগের এই কলকাতা – নোয়াখালীর প্রত্যক্ষ সংগ্রাম ও তার
পরবর্তী প্রতিক্রিয়ার অবশ্যম্ভাবী অভিঘাত ছিল বাঙ্গালীর ধর্ম ও সংস্কৃতির
আবাসভূমী ‘পশ্চিম বাংলা’র জন্য বাংলা ভাগ পাঞ্জাবের মতই, যদিও জন ও
সম্পত্তির বিনিময়ে সাম্প্রদায়িক সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধান প্রধানমন্ত্রী
নেহেরূ করলেন না, যা তিনি পাঞ্জাবে করেছিলেন। হিন্দু-বাঙ্গালীদের জন্য
বাংলাভাগের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ‘বাংলার বাঘ’ ডঃ আশুতোষ মুখার্জীর
‘বাচ্চা’ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী, ও তাঁর বিশ্বস্ত লেফটেন্যান্ট
‘রায়সাহেব’ রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরীর কনিষ্ট ভ্রাতা ঐতিহাসিক—অধ্যাপক ডঃ
মাখনলাল রায়চৌধুরী ওরফে ‘মৌলানা মাখনলাল’ সহ তৎকালীন বিশিষ্ট বাঙালীরা।
উল্লেখ্য, নোয়াখালির দাঙ্গা বিধ্বস্ত বাড়ি পরিদর্শন করে তৎকালীন ভারতের
কংগ্রেস সভাপতি জে বি কৃপালনী মন্তব্য করেছিলেন: “যদিও আমি সম্পূর্ণ
অহিংসায় বিশ্বাসী তা সত্ত্বেও আমি রাজেন্দ্রলাল রায়চৌধুরী’র প্রতি পূর্ণ
শ্ৰদ্ধা জানাচ্ছি। প্রত্যেক বাঙালীর সামনে আমি রাজেন্দ্রলাল এবং তার
পরিবারের কথা উদাহরণ স্বরূপ তুলে ধরতে চাই, যারা দু’দিন ধরে লড়াই করে
আক্রমণকারী উন্মত্ত জনতাকে ঠেকিয়ে রেখেছিলেন।”

সেদিনের এই ঘটনাবহুল
‘রায়চৌধুরী’ পরিবারে উপস্থিত ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া, বেঁচে ফেরা, জীবিত
সকলের কাছেই সেই পরিবারের মহাকাব্যের কতকগুলি পাতা জমে, ছড়িয়ে আছে, যা এক
জায়গায় একত্রিত করলেই তাঁর সম্পুর্ন চিত্রায়ন সম্ভব। জীবনটাকে সেদিন জীবিত
সকলেই রক্তমাংসের শরীরে আটকে রাখতে ব্যস্ত থেকে অন্যের দিকে তাকাতেও পারেন
নি। তাই নিজ নিজ অভিজ্ঞতাই এক মস্ত বড় ট্যাজেডির টুকরো টুকরো অংশ।
“Yet shall some tribute of regret be paid
When her long life hath reached its final day;
Men are we and we must grieve when even the shade
of that which once was great is passed away.”
সে কারনেই নোয়াখালী গবেষণার অঙ্গ হিসাবে এই পরিবারের এক প্রত্যক্ষদর্শী ও
ভূক্তভোগী সায়াহ্নের প্রচেষ্টা’র স্রষ্টা ‘শ্ৰীমতী কিরণপ্রভা,
রায়চৌধুরী’র স্বহস্তে লিখিত কচি পাতা ‘ডাইরী’র ক’টা খোলা পাতা সংক্ষেপিত
রূপে প্রকাশ করলেন এই বিখ্যাত ‘রায়চৌধুরী’ পরিবারের ঐ ১৯৪৬-ত্তোর ঘটনার
দ্বিতীয় প্রজন্ম-উত্তরপুরুষ।তাঁরা ডাইরী লেখিকার সম্পর্কে পৌত্র, পুত্র ও
প্রপৌত্র…।
(আগামী পর্বে ক্রমশঃ….)