বাঙালী সংস্কৃতিকে বাঙালী মুসলমান ছাড়া আর কেউ ‘হিন্দুয়ানী’ বলে?

Spread the love

বাঙালী সংস্কৃতি : ১৭ এপ্রিল ছিলো রাখাইনদের নববর্ষ ১৩৮১। রাখাইন নারী-পুরুষ ‘জলকেলি’ মাধ্যমে তাদের নববর্ষ পালন করেছে। একে অপরকে জল ছিটিয়ে হাস্যরসের মাধ্যমে দিনটিকে তারা উৎসবের সঙ্গে পালন করে থাকে। এসব দেখে বেমক্কা প্রশ্নটা আসতেই পারে,- রাখাইন নববর্ষ পালন নিয়ে হারাম হালাল বিতর্ক উঠল না কেন?

রাখাইনরা বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের অনুসারী হয়। নারী পুরুষ একত্রে জলকেলি খেলা রাখাইন সংস্কৃতি। এভাবেই তারা নববর্ষ উদযাপন করে থাকে। যদি রাখাইনদের মধ্যে কেউ ইসলাম গ্রহণ করে থাকে তাহলে তার রাখাইন জাতিসত্ত্বা উঠে যাবে না। তার চেহারায় প্রকৃতি যে ছাপ দিয়ে রেখেছে সেটা ধর্ম পরিবর্তন করলেই পাল্টে যাবে না। কিন্তু একজন মুসলিম রাখাইন কি জলকেলিকে সমর্থন করবে?

খ্রিস্টান হওয়ার পরও কিন্তু কোন রাখাইনের তার সংস্কৃতি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়নি। বাঙালী জাতির মধ্যে হিন্দু মুসলমানই সংখ্যাধিক্য। এছাড়া খ্রিস্টান বৌদ্ধ বাঙালী রয়েছে। একমাত্র মুসলিম ছাড়া আর কোন বাঙালী তার নিজের নববর্ষ নিয়ে বিরোধীতা করেনি। একমাত্র মুসলিম তার সংস্কৃতিকে বেহায়াপণা বলেছে। রাখাইনদের এই নববর্ষের প্রাক্কালে তাই এই প্রশ্নটি ফের তুলে ধরছি, ইসলাম কি সংস্কৃতি ও জাতিগত উপনিবেশ চালায়?

এখানেই এডওয়ার্ড সাঈদ পুরোপুরি ভ্রান্ত। তিনি আরব খ্রিস্টান হলেও ইসলামকে কখনই সংস্কৃতি ও জাতিগত উপনিবেশিক শক্তি মনে করতেন না। যারা এরকম মতামত দিতেন তিনি তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হতেন এবং তাদেরকে ‘ইসলাম বিদ্বেষী’ মনে করতেন। একঘর রাখাইন যদি ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়ে যায় তাহলে দেখা যাবে রাখাইন পল্লীতে তারা ছোটখাটো একটা ইসলামিক উপনিবেশ চালু করেছে।

নারীদের বোরখা পরা এবং পুরুষদের সুন্নতী লেবাসই কেবল নয়, সমস্ত রাখাইন সংস্কৃতিকেই তারা ত্যাগ করেছে কারণ তারা ‘মুসলমান’! কোন রাখাইন খ্রিস্টান হলে, হিন্দু হলে, ইহুদী হলে… পৃথিবীর চার হাজার ধর্মের কোন একটি গ্রহণ করলেও নিজ সংস্কৃতি পালনে কোন বিরোধ থাকত না।

আমি পাহাড়ী খ্রিস্টানদের সঙ্গে মিশে দেখেছি তারা তাদের জাতিগত আচার আচরণ এখনো অনুসরণ করে চলে। তাদের গির্জার যিনি ফাদার সেই ভদ্রলোকও একজন পাহাড়ী। তিনিও বলেন না এগুলো পৌত্তলিকতা কিংবা অখ্রিস্টানসুলভ তাই পরিত্যাজ্য…।

যখন ইসলামিক কোন শক্তি যারা পুরোপুরি ধর্মকে অনুসরণ করে শাসন পরিচালনা করতে চায় যেমন তালেবান আইএস বোকো হারাম, তারা ক্ষমতায় এসেই আফগানিস্থানের পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা বুদ্ধ মূর্তি কামান দেগে গুড়িয়ে দিয়েছিলো। আফগানিস্থান দেশটাই ছিলো এক সময় বৌদ্ধদের।

আইএস সিরিয়ার যত পুরাকীর্তি ছিলো অমুসলিম যুগের সমস্ত ধ্বংস করেছে কারণ এগুলো জাহিলিয়া যুগের স্মৃতি বহন করে চলেছে। এর পুরোপুরি ইসলামিক রেওয়াত আছে। মক্কা দখলের পর মুহাম্মদের নির্দেশে সমস্ত পৌত্তলিক সংস্কৃতির চিহৃ ধ্বংস করা হয়েছিলো। আজো তাই ফান্ডামেন্টালিস্ট মুসলিম যে কোন অমুসলিম সভ্যতার বিরোধী এবং মনে মনে এসব ধ্বংস করার স্বপ্ন লালন করে চলে।

পাহাড়ে খ্রিস্টান মিশনারী ধর্ম প্রচার করে পাহাড়ী আদিবাসীদের খ্রিস্টান বানিয়েছিলো। এতে করে পাহাড়ের মানুষ পাহাড়ী সংস্কৃতি বিরোধী হয়ে উঠেনি। শাহজালাল শাহ পরাণের মত দরবেশদের হাতে বাঙালী মুসলমান হয়ে বাঙালীর শত্রু হয়ে উঠেছে। সে পহেলা বৈশাখের মুখে লাত্থি মারতে চায়।

শহীদ মিনারের লাত্থি মারতে চায়। চিরায়ত বাঙালীদের সহিষ্ণুতাকে শিরক বলে। বাঙালী মুসলমান ছাড়া আর কে বাঙালী সংস্কৃতিকে ‘হিন্দুয়ানী’ বলে? বলে না। কারণ ইসলাম কোন ধর্ম নয়। ইসলাম নিজেই বলে কেবল নামাজ রোজা করার জন্য কেউ মুসলমান হয় না। মুসলমানকে হতে হবে একজন সৈনিক যে ইসলামের জন্য রাজ্য দখল করার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে।

যে কিনা ইসলামী সংস্কৃতি সভ্যতা প্রতিষ্ঠা এবং অমুসলিম মুশরিক কাফের সংস্কৃতিকে কবর দিতে এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিবে। একজন খাটি মুসলমান এই কাজটিতে অংশ গ্রহণ না করলে পরকালে তাকে জবাবদেহী হতে হবে। পৃথিবীতে ইসলামের এই অংশটির মত দ্বিতীয় আর কোন ধর্মে পাবেন না। হিন্দুদের ‘রামরাজ্য’ ধারণাটি মহাত্মা গান্ধি প্রথম ব্যবহার করেছিলেন সম্ভবত তলস্তয়ের ‘ঈশ্বরের রাজ্য’ শব্দটিকে ভারতীয় রূপ দিতে।

কাজেই হিন্দুদের ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ পুরোটাই ধর্মীয় কনসেপ্ট ছাড়া একটা জাতীয়তাবাদী রাজনীতি। যীশু খ্রিস্ট ছিলেন সন্ন্যাসী। তিনি বাইবেল অনুযায়ী কখনো যুদ্ধ করেনি। কাউকে আক্রমণ করেননি। জিহাদ করতে অনুসারীদের নির্দেশ দেননি। কাজেই খ্রিস্টানদের ক্রুসেড সম্পূর্ণই ইউরোপীয়ান রাজনীতি। কিন্তু ইসলাম নিজেই একটি উপনিবেশিক রাজনীতি।

ইউরোপীয়ান বণিকদের হাতে উপনিবেশ যুগে তাদের পরাজয় ঘটেছিলো। সমগ্র পৃথিবী ইউরোপীয়ান উপনিবেশের তলায় চলে গেলে ইসলাম কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত নিছক ধর্ম কর্মের মধ্যে প্রবেশ করে। এর মধ্যেই সে ছোট পরিসরে অনুসারীদের মধ্যে সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদী চেতনার চর্চা অব্যাহত রাখে। এরকম একটি চর্চা কেন্দ্র হচ্ছে দেওবন্ধ। ভারতবর্ষে আমরা সেটাই দেখেছি।

যে কারণে ভারতে হিন্দু মুসলমান ইংরেজ আমলে বহুবছর ‘শান্তিতে’ পাশাপাশি বসবাস করলেও কেউ কারোর আপন হতে পারেনি…।  ইসলাম ধর্মের পরিচয়ই হলো মানুষ থেকে তাকে আলাদা করে একটি পরিচয় তৈরি করে দেয়া যা কেবল মানুষত্ব থেকে বাইরে বের করে আনে। যাই হোক, রাখাইন নববর্ষের উদযাপনটা দেখে বাঙালী মুসলমান অন্তত ইসলামের উপনিবেশিক চরিত্রটা এক সময় বুঝতে পারবে। তখন অন্তত মুসলমান নোয়াম চমেস্কি-এডওয়ার্ড সাঈদ পড়ে মুচকি হাসবে…।

আরো পড়ুন…