প্রজারঞ্জক নৃপতি বলে সারা বাংলায় খ্যাতিলাভ করেছেন এই ইলিয়াসশাহী বংশ। বৃদ্ধ সুলতান গিয়াসুদ্দিন আজম শাহ গঙ্গাতীরের উদ্যানে পায়চারি করছেন। তাঁর হাতে একখানি পত্র। আরও একখানি পত্র উঁকি দিচ্ছে জামার জেব থেকে। চীন সম্রাটের পত্র গোঁজা রয়েছে ওই জামার জেবে। কোনরকমে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে সেই যে ওটা একবার পকেটজাত করেছেন সুলতান, তার পরে ও নিয়ে চিন্তা করেননি এতটুকু। হাতের পত্রখানিই পড়েছেন বারবার।

পড়ে পড়ে আশ যেন মেটে না আর। হাতের এই চিঠিখানি ইরান থেকে এসেছে। মহাকবি হাফেজের নিজের হাতে লেখা। হাফেজের সঙ্গে পত্রালাপ চলছে বহু বছর ধরে। কেউ কাউকে চোখে দেখেননি এযাবৎ, যদিও বার বার বঙ্গেশ্বরের আমন্ত্রণ গিয়েছে মহাকবির কাছে, ” এসো কবি, ইরানের দ্রাক্ষা কুঁজবিলাস দুদিনের জন্য আমাদের বাংলার আম্রকুঞ্জে বেড়িয়ে যাও একবার। আঙুরের চাইতে আম কম মধুর নয়।”

মহাকবির আসা হয়নি।  আজম শাহকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য মাঝে মাঝে দীর্ঘ পত্র লেখেন এক একখানা। তাঁর শেষ পত্র আজ ওই সুলতানের হাতে। একটি যুবক কিছুক্ষণ থেকেই অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ দেহে অতি সাধাসিধে পরিচ্ছদ, হাঁটুর উপরে তোলা ধুতি, আর গায়ে হাত কাটা মেরজাই। পায়ে কাঠের জুতো ছিল, চামড়ার ফিতে আলগা করে এক্ষুণি সে জুতোজোড়া খুলে রেখেছে, কারণ খড়মের খটাখট শব্দ তুলে সুলতানের সম্মুখে যাওয়া বেয়াদবি হবে।

বার চারেক চিঠিখানি পড়া হয়েছে । সুলতান এইবার মুখ তুলে চাইলেন গঙ্গার দিকে। আর সেই অবসরে যুবক এসে নত মস্তকে কুর্নিশ করে দাঁড়ালো। পায়ের সামান্য শব্দেই দৃষ্টি ফেরালেন আজম শাহ। যুবককে দেখেই মুখখানি প্রফুল্ল হয়ে উঠলো, -” আজ দেখছি, আমার শুভদিন। প্রথমেই কবির দেখা পেলাম। তার পরেই গনুর দেখা। আজই এলে?”

“জাহাপনা, আজই , এইমাত্র। নৌকা ওই বাঁধা রয়েছে। নেমে আগে জাহাপনাকে কুর্নিশ জানাতে এলাম। বাসায় যাইনি এখনো।” “যেয়ো না, যেয়ো না। মালপত্র চলে যায় বাসায়, তুমি এখানেই আমার সঙ্গে বসে দুটো মুরগির ঝোল ভাত খেয়ে নিও।’ এটা সুলতানের মামুলি পরিহাস। গনেশ নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ, মুসলমান দূরে থাক, অব্রাহ্মণ হিন্দুর বাড়িতেও খায় না, তা বিলক্ষণ জানেন আজম শাহ। এবং জোর করে খাইয়ে ব্রাহ্মণের ধর্মনাশ করবেন, এমন কল্পনাও করতে পারেন না এই হাফেজ বন্ধু নরপতি। 

অত্যাচার অনাচার? সে সব ছিল একসময়। কিন্তু সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ থেকে শুরু করে তাঁর নাতি এই আজম শাহ পর্যন্ত এই তিন পুরুষ ধরে এরা হিন্দুর ধর্মবিশ্বাসে এতটুকু আঘাত দেননি কোনোদিন। ফলে প্রজারঞ্জক নৃপতি বলে সারা বাংলায় খ্যাতিলাভ করেছেন এই ইলিয়াসশাহী বংশ।

নৌকা সত্যিই বিদায় দিল গনেশ। চাকররা রয়েছে নৌকায়, তারাই বাসায় গিয়ে মালপত্র নামিয়ে দেবে। গনেশ নিজে রয়ে গেলো, কারণ সুলতানকে নিরিবিলি পাওয়া গিয়েছে, এ সুযোগ কদাচিৎ আসে। ওনার তো সুলতানি আড়ম্বর আদবে নেই, যখন যার খুশি বিনা এত্তেলায় এসে সমুখে হাজির হচ্ছে।

কাছাকাছি রক্ষীরা থাকে বটে, কিন্তু তারা আটকায় শুধু অচেনা লোককে। গণেশের মতো যারা সুলতানের অতিপরিচিত , অন্তরঙ্গ বললেই হয় তাদের গতিরোধ বা জিজ্ঞাসাবাদ করবার অধিকার রক্ষীদের নেই। 

সুলতানকে বাগানে পায়চারি করতে দেখেই গনেশ নৌকা থেকে নেমে পড়েছে। এ সুযোগ ছাড়া নয়। জরুরি কথা আছে তার। এক্ষুণি সেটা বলে ফেলার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে যখন, তখন তা অবহেলা করা কিছু নয়। করলে হয়তো দ্বিতীয় সুযোগ আসতে সপ্তাহ কেটে যাবে।

সুলতান পায়চারি করছেন। হাফেজের চিঠিখানি হাতে নিয়েই। গনেশ তাঁর পিছনে পিছনেই হাঁটছে, আর হাঁটতে হাঁটতেই নিবেদন করছে তার আরজিম গণেশের জমিদারি বরিন্দি অঞ্চলে। উত্তরকালে যে অঞ্চলের নাম হয়েছিলো দিনাজপুর , সেখানেই।

জমিদারিতে হিন্দু মুসলমানে পরম সম্প্রীতি বজায় ছিল এতদিন । সামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের আমল থেকেই রয়েছে। এতদিন ছিল। কিন্তু আর বুঝি থাকে না।……….

(**লেখকের নাম পাইনি, কিছু ঘষামাজা বাদ দিয়ে এ গল্পের যাবতীয় কৃতিত্ব সেই নাম না জানা লেখকের।)

আরো পড়ুন……