গদরে গদ্দারী – চীনের মহান সাম্রাজ্যবাদের আখ্যান  (CPEC এর পরবর্তী পর্ব  )

লেখায় সহি লিংক ব্যবহার করা হয়েছে ,ভারত বা বাংলাদেশের কোনো সংবাদ মাধ্যম কে সূত্র করি নি। পাকিস্তান এবং পৃথিবীর সচ্ছ এবং আন্তর্জাতিক মানের সংবাদ সূত্রকে ব্যবহার করেছি মাত্র !

আজকাল কিছু গন মাধ্যমে একটি পাহাড়ি রাস্তার গাড়ি এবং রাস্তা দেখিয়ে এই CPEC মানে চীন পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর এর জয়গাথা চলছে। ওটা নাকি পাকিস্তানের গেম চেঞ্জার হবে। এর সাথে চলছে ,ভারত এই প্রজেক্টে যোগ না দিয়ে অনেক ভুল করছে তার উপর হাহাকার। সেই সব চীনের মানস পুত্র এবং কন্যাদের জন্য এইবার পরের কিস্তির লেখা। আগের লেখার লিংক জুড়ে দিলাম ,যারা পরে এসেছেন তাদের বলবো এই গদর এর উপর ওটা দেখে নিতে আর যারা আগেই দেখেছেন তারা এই লেখা থেকে শুরু করুন।আগের লেখার সূত্র : https://www.facebook.com/permalink.php?story_fbid=427664454293398&id=100011495404017

এই লেখার জন্য প্রথমে যে লেখাটা দেখে ভেবেছিলাম ওটা বিকেলের মধ্যেই মূল পাতা থেকে গায়েব করে দেওয়া হয়েছিল কিন্তু মুশকিল হলো ইন্টারনেট  আর গুগল। বড্ড পাজি , ঠিক খুঁজে বের করে দেয়। যাই হোক , বিষয়ে আসি।

চীনের কাশগড় (ঝিনঝিয়াং , খেয়াল করে , সেই উইঘুরদের সংখ্যালঘু করার প্রদেশ এর অঞ্চল ) থেকে ১৩০০ কিমি পথ পেরিয়ে পাকিস্তানের গদর সমুদ্র বন্দরে শেষ হয়েছে এই চীন পাকিস্তান ইকোনোমিক করিডোর বা CPEC ,আর এই পুরো প্রজেক্ট কে নাম দিয়েছে OBOR অর্থাৎ ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড। এই দুই লেনের সড়ক চীনের জন্য একটি বড় আদরের জিনিস। অনেক বিলিয়ন ট্যাকাটুকা খরচ করে অনেক ফন্দি ফিকির করে তৈরী করা।  এখন কথা হলো মোমিনের চোখের মনি ,এই প্যারা পাকিস্তান এর থেকে কি পাচ্ছে বা পাবে তার একটু হিসাব করা।

এখন এই খানেই কবি কেঁদেছেন ,এই দিকের আওলাদে মাও গণ তাতে না কাঁদলেও পাকিস্তানের সাধারণ ব্যবসায়ী বা মানুষ কিন্তু মোটেই লাভবান না। পাঠক , এই কথা আমি বলছি না , বলছে পাকিস্তানের পুত্তুম আলু থুক্কু ডন আখবার। তাদের প্রতিবেদনে দেখতে পাই , পাকিস্তানের ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যেই এই দুই লেনের রাস্তাকে একমুখী রাস্তা বলছে মানে ‘দিবে আর নিবে ‘ না , কেবলই দিবে !

উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে পাকিস্তানি ব্যবসায়ী মুরাদ শাহ এর আক্ষেপ , তিনি বলেছেন এই রাস্তা কেবল চীনের ব্যবসা আর উন্নতির জন্য হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা যায় , চীন আর পাকিস্তান ২০১৩ সালে ৪৬ বিলিয়ন ডলার এর চুক্তি করে। এই চুক্তি অনুযায়ী , এই চিহ্নিত রাস্তার তৈরী থেকে এর পাশে এবং কুখ্যাত কারাকোরাম সড়ক এর উন্নতির জন্য পরিকাঠামোর খরচ এর কাজ করবে চীন। ট্যাকাটুকা ও দেবে ,দাঁড়ান , উল্লসিত হবে না , ওটা অনুদান নহে , পাকিস্তানের ভিতরের কাজের ভাগ ঋণ। ওটার সুদ ও দিতে হবে , হারাম বলিয়া এড়ানো যাবে না। তা , চুক্তি তো বলে , উভয়ের উন্নতি। আসুন এবার একটু বাস্তবের উপর খোঁচাখুঁচি করি।

২০১৬র শেষ ভাগে দেখা যায় পাকিস্তানের চিনে রপ্তানি কমেছে ৮% আর আমদানি বেড়েছে ২৯ % , আরো আছে , চীন এর উপর ইতিমধ্যেই অনৈতিক ভাবে ভর্তুকি দিয়ে ইস্পাত বা লোহার দাম কমিয়ে পাকিস্তানের বাজার শেষ করে দেওয়ার অভিযোগ ও উঠেছে। যাই হোক ওটার উপর আরো খোঁচানোর আগে আসুন একটু ওই পুরো প্ল্যান এর বিষয়টা দেখি।

চীন ওটার নাম দিয়েছে OBOR ,আগেই বলেছি , এই ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড এর অনেকগুলো ভাগ আছে। রুট মানে স্থল ভাগের প্ল্যান ছয়টি। ছবি দেখুন , আর জলভাগের রুট একটি। অনেকেই জিজ্ঞাসা করেছেন ,বাংলাদেশের দিকে আশংকা কি রকম , তাদের জন্য বলি , ওই প্ল্যান আছে একদম ছয় নম্বরটি। ওতে ভারতের সাথে মিলে করার ‘ইচ্ছা ‘ আছে ,অর্থাৎ আগে আমাদের সাথে হিসাব না করে ঢুকতে পারবে না। অর্থাৎ আপনারা এখনো সেফ জোন এ আছেন ,অবশ্য কিছু বামাতি এবং আওলাদে মাও গোষ্ঠীর এতে অতীব দুঃখ হতে পারে। কিছু করার নেই। আর হ্যা , এই পরিকল্পনার মধ্যে একমাত্র পাকিস্তানের রুট এর উপর দিয়েই কাজ হচ্ছে ,বাকি গুলো অর্ধেক রাস্তায় আছে। এই রুট গুলোর মধ্যে চীনের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো চীন -পাকিস্তান এবং চীন -মধ্য এশিয়া -তুর্কি রুট।

এই রাস্তাগুলোর রিস্ক ফ্যাক্টরের মানে ঝুঁকির উপর নজর দিই :
১. পুরো প্রকল্প চীনের স্বার্থ নির্ভর তাই চীনের অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়লে অন্য সব দেশগুলোর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। 
২. সব কটা প্রকল্প (১,২ এবং ৩ বাকিগুলো কাগজে কলমে )পশ্চিম চীন মানে ঝিয়াং ঝিয়াং এর অঞ্চল থেকে কেন্দ্রীভূত ,ওটা একটা ধর্মীয় আর অনুন্নত অঞ্চল। আরো আছে সন্ত্রাস এর আঁতুরঘর হিসাবে উইঘুর সন্ত্রাসের অঞ্চল। অনেক ক্যাচাল হবার সমূহ সম্ভাবনা আছে। ক্রমশ প্রকাশ্য !
৩. চীনের অতি উচ্চাভিলাষী কাজ নিজেদের শিল্পক্ষেত্রে মানে সিমেন্ট ,স্টিল , রাসায়নিক এবং ভারী যন্ত্রপাতির প্রচুর কারখানা তো করে  ফেলেছে কিন্তু এর অভ্যন্তরীণ চাহিদা এখনো অর্ধেক ও না। মানে ওই ক্ষেত্রগুলোর প্রস্তুতকৃত মালামাল এর সরবরাহের জায়গা হবে এই রুটের দেশ গুলো। ইতিমধ্যেই ওই CPEC এর পাকিস্তানের লাগোয়া অঞ্চলে তৈরী পোশাকের কারখানা করেছে যাতে পাকিস্তানের কাঁচামাল মানে তুলোর ব্যবহার করা যায়। পাকিস্তান কি পাবে ? কেন ? বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলো। ইতিমধ্যেই ওটা শুরু হয়েছে।

যাইহোক বৃহত্তর চীনা বাদ্য শোনার সময় অন্য কোথাও বলবো ,আবার ওই দারোয়ান এ জাহাঁ মানে পাকিস্তানের আর চীনের বর্তমান রুট এর উপর আবার ফোকাস করি।

ইতিমধ্যেই বালুচিস্থানের মানুষ সর্দার আখতার মঙ্গল এর নেতৃত্বে বিক্ষোভ করছে। ৭০ বছরের দখলদারি আর এই CPEC এর কোনো উন্নয়নে তাদের কোনো লাভ হয় নি বলে। তারা এটিকে নাম দিয়েছে চীন পাঞ্জাব ইকোনোমিক করিডোর। মোমিন খেয়াল করে , সেই পাঞ্জাব এর হাতে বঞ্চনার অভিযোগ , যা ১৯৭১ এর গণ বিদ্রোহের কারণ। বালুচিস্থানের BNP (খালেদার নহে , এটার নাম ,বালুচিস্থান ন্যাশনাল পার্টি ) ছবি নম্বর : ২

এই প্রজেক্ট অর্থাৎ চীন পাকিস্তান করিডোর এর নির্মাণ শেষ হতে আরো ১৫ থেকে ২০ বছর লাগবে ,অন্তত পরিকল্পনা অনুযায়ী। এর অর্থ , পাকিস্তানে যেই সরকার  আসুক তার সমর্থন দরকার। আরো দরকার ওই পথের উপর নিরুপদ্রব চলাচলের গ্যারান্টি। ওটা দেওয়া আক্ষরিক অর্থে অসম্ভব। সেই জন্য পুরো পাকিস্তানের ফৌজ কে ওই রাস্তায় লাগাতে হয়। কি বুঝছেন ?

এই নির্মাণের মধ্যে সরাসরি বিনিয়োগ চীনের আর সরকারি ঋণের পরিমান ১২ বিলিয়ন ডলার। গদর থেকে কাশগড় এর রাস্তার তিনটি রাস্তা রাখা হয়েছে আলাদা করে। ছবি নম্বর :

এই পথে কোনো চীনা নাগরিকের ভিসার দরকার হবে না , কেন ? হে হে , বুঝেন ই তো !

এবার আসি ওই পথের একাংশ গিলগিট বাল্টিস্তান এর উপর , ওটা আবার বিতর্কিত পাক অধিকৃত কাশ্মীরের উপর অবস্থিত , এতে আরো সমস্যা বাড়বে কারণ আইনত ওটার উপর কোনো কাজ করার অধিকার পাকিস্তানের নেই। এর ফলে কিন্তু ভারতের অনেক সুবিধা হয়ে যাবে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে। কি ব্যবস্থা ? ওই , বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত হওয়ার।

এবার আসি পাকিস্তান কি সুবিধা পাচ্ছে ওটার উপর , ওটা আবার চীনা ম্যাজিক ,পাকিস্তানের কাগজ বলছে , আমদানি করলে চীন বড্ড খুশি কিন্তু ঐদিকে রপ্তানি করলেই কি রকম জানি করে। আর হ্যা , ট্যাক্স এর কোনো চার্ট মানে তালিকা নেই। আজ যে জিনিসের উপর ৫% ট্যাক্স কাল ওটাই ২০% আবার তারপর ওটা কখনো নিষিদ্ধ। কেন ?কে জিগায় ? কার এতো সাহস ! পাঠক এটা ও আমার কথা না , কাগজ এর সূত্র সেই পাকিস্তানি পুত্তুম আলু মানে ডন ! লিংক দেখুন।

আরো আছে , যান কোথায় ? আরবের হরফের কোনো কিছু আমদানি করলেই ক্যাচাল। ওটা নিষিদ্ধ। হে হে , ওটা ও আমি বলছি না ! ডন বলে। আরো বলে , ওই রাস্তায় ,মানে পাকিস্তান থেকে চিনে প্রবেশের সময় ৩০০ কিমি রাস্তায় ৬ বার দাঁড় করানো হয়। মেটাল ডিটেক্টর এর চেক করা থেকে মোবাইলের লেখা সব চেক করে।  কোনো ধর্মীয় উস্কানি ইত্যাদি ও আছে কি না দেখা হয়। ওটা ভারত করলে এতক্ষন মোমিনের আর বাম এর  মোমবাতির স্টক থেকে মিছিলের জট কি পরিমানে হতো ভাবতেই আমার হাত পা  ……যাই হোক আবার লাইনে আসি !

আরো আছে , ওই কারাকোরাম সড়ক কিন্তু শীতে চলাচলের জন্য উপযুক্ত না। ওটা আবার আমি বলছি না ,বলছেন জোনাথন হিলম্যান। উনি ও বলছেন তথ্য আর ভৌগোলিক অবস্থা বিচার করে। ওই সর্ব আবহাওয়া আর হিমালয় এর থেকে উঁচু বা সাগরের থেকে গভীর বন্ধুত্ব দিয়ে তো আর ওই রাস্তার ওয়েদার এর হিসাব হয় না। লিংক দেওয়া হলো। একটু দেখে নেবেন।

আবার একটু ব্যাংক অফ পাকিস্তান এর রিপোর্ট দেখি , রিপোর্ট মোটেই ভালো না , ওটা বলছে চীনা বিনিয়োগ ৫৪% কমেছে। অর্থাৎ প্রতক্ষ্য বিনিয়োগ যা পাকিস্তানের জন্য দরকার ওটা কিন্তু শঙ্কাজনক ভাবে হ্রাস পাচ্ছে। ইয়ে আমি বলছি না , ওটা ও ওই অঞ্চলের বিশেষঙ্গ জনাথন হিলম্যান বলছেন। লিংক ওই উপরের , দেখে নেবেন। এছাড়া ও এখনই ১৫ হাজার পাকিস্তানি সেনা কে পাহারার কাজে লাগানো হয়েছে কারণ ওই অঞ্চলে একের পর এক সন্ত্রাস কর্ম বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো ওই পথ কে সুরক্ষিত ভাবছে না।

সোজাসাপ্টা বলতে গেলে ওই রাস্তার উপর যা কিছু ওটাই চীন করতে আগ্রহী ,পাকিস্তানের কোনো আঞ্চলিক উন্নয়ন এ কোনো আগ্রহ নেই।

আরো একটু সংযোগ করি , ট্যাকাটুকা একটু আগ্রহের বিষয় ,কি করি ,পারি না ! যাই হোক , রসিকতা থাক ! আপাতত চীনের পাকিস্তানের বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ঋণের পরিমান ২৭.৮ বিলিয়ন ধরা হয়েছে। এর আবার সিংহভাগ ওই কয়লার ,হে হে , আনু সাহেব আর আমাদের দিকের গুলো কোথায় ? দূষণ কি খালি এই দিকেই ? এর মধ্যেই ওর দাম রাখা হয়েছে ১৫ থেকে ১৮ টাকার মতো ,হ্যা ঋণের সুদ আর নির্মাণ এর পর বিদ্যুতের দাম হিসাবে।  কি তামাশা !

ঠিক যে ভাবে নিয়ন্ত্রণ করার প্যাচ করেছে শ্রীলঙ্কাকে ,ওই ভাবেই পাকিস্তান এর অর্থনৈতিক দখল নেবে চীন। হাফিজ পাশা , প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী পাকিস্তান এবং আশফাক হাসান খান ,পূর্বতন উপদেষ্টা অর্থ মন্ত্রক -পাকিস্তান ,এই দুজনেই আশংকা প্রকাশ করেছেন সরাসরি ১৪ বিলিয়ন আর পুরো বৈদেশিক ঋণ মানে ৯০ বিলিয়ন এর বেশিরভাগ এর উপর নির্ভরশীল হয়ে পাকিস্তান এর এরপর অবস্থা অতীব খারাপ হবে।

শেষ করি একটা মজার ছোট্ট গপ্প দিয়ে , পাকিস্তানের একটা সিনেমা ছিল ‘ না মালুম আফ্রাত ‘ ওটা আমাদের হিন্দি ‘হেরাফেরি ‘ সিনেমার নকল। ওতে একটা দারুন রসিকতা ছিল , এক বৃদ্ধ ঠাকুমা আখরোট খেতে ভালোবাসেন ,দুঃখ করে বলছেন ,কেন বাকি সব জিনিসের মতো এই আখরোট ও চীনের হয় না। তা হলে ভাঙতে কত সুবিধা হতো। আশাকরি বুঝেছেন !
তথ্যসূত্র :
১. https://asia.nikkei.com/Viewpoints/Jonathan-Hillman/Mishandled-China-Pakistan-Economic-Corridor-could-misfire?page=1
২. https://asia.nikkei.com/Viewpoints/Jonathan-Hillman/Mishandled-China-Pakistan-Economic-Corridor-could-misfire?page=2
৩.https://asia.nikkei.com/magazine/20170406/Politics-Economy/Pakistan-bets-on-a-Chinese-development-project-but-debt-looms
৪. https://asia.nikkei.com/magazine/20170406/Politics-Economy/Pakistan-bets-on-a-Chinese-development-project-but-debt-looms
৫. http://herald.dawn.com/news/1153597
৬. http://herald.dawn.com/news/1153413/mother-china-a-chinese-revolution-sweeps-across-pakistan