শূন্য শুধু শূন্য নয় !

একটু সংযোজন :

আমার এক সুজন আছেন যিনি আমার মতো অলস না তাই তার সাহায্যে আমার ব্লগ একাউন্টটা সচল থাকে। তিনি এই লেখাটা তুলে ধরেন আমাদের সেই পুরোনো ট্র্যাডিশনের জায়গায়। লিংক জুড়ে দিলাম। আবার বললাম , আপনারা একটু ব্লগে ফিরে আসুন ! https://nobojug.org/node/3440

গতকালের একটি খবরে চোখ আটকে গেল। খবরটি পেয়েছিলাম সহি দৈনিক এবং পুত্তুম আলুর বড় ভাই পাকিস্তানের ডন এ। বড় ভালো লাগলো ,তাই পারসিক সভ্যতা আর জেন্দা বেস্তা ছেড়ে এইটা একটু বিস্তারিত বলতে চলে এলাম।

আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জানি যে ভারত প্রথম গণিতে শূন্য ডিজিট টি নিয়ে আসে। এটি না এলে ওই প্রাচীন রোমান হিসেবে আর আজকে মহাকাশ বা অন্য বিদ্যা এগোতো না। আর এগোলে ও হয়তো অনেক পরে ওটার উৎকর্ষতা আসতো। যাক কি হলে কি হতো ওটা না হয় নাই ভাবলাম। কথা হলো ওই ‘শূন্য’ র আবিষ্কার এর আগে ধরা হতো নবম শতাব্দীতে হয়েছে। কারণ সর্বপ্রাচীন যে উদাহরণ পাই তাতে দেখি  এই শূন্য ব্যবহার করেছিল ওটা পাওয়া গিয়েছিল গোয়ালিয়র এর একটি মন্দিরের ভাস্কর্যে । না , আজ প্রমাণিত যে এই আবিষ্কার হয়েছিল আরো অন্তত পাঁচশো বছর আগে।

সেই সময়ের প্রাচীন ভারতের সভ্যতার এক অংশ ছিল আফগানিস্তান থেকে একদম কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত। সেই দিকের কাছাকাছি , পেশোয়ার এর কাছে বাকশালী ( হে হে , বাংলাদেশের জামাত বা প্রবল ভারত বিরোধীরা ওটা সেই বাকশালী নহে ,লাফাবেন না ! ) বলে একটি গ্রামে ১৮৮১ সালে একটি পুঁথি পাওয়া যায়  ,পায় এক স্থানীয় চাষি যার থেকে ওটা কিনে নেন ভারত তত্ববিদ হর্নলি । এই জায়গাটির নামে ওই পাণ্ডুলিপিকে বাকশালী পাণ্ডুলিপি বলা হয়। এই পাণ্ডুলিপি ১৯০২ সাল থেকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত বডলিয়ান লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে।

পাঠক , ওই ছবির সংস্কৃত লেখার সাথে লাল রং দিয়ে মার্ক করা ডট গুলো খেয়াল করুন। ঐগুলোই সেই আমাদের গর্বের শূন্য।

অতঃপর এই শূন্যের উল্লেখিত পুঁথির রেডিও কার্বন টেস্টিং প্রমান করেছে ,এই আবিষ্কার হয়েছে অন্ততঃ তৃতীয় বা চতুর্থ শতকে। এই শূন্য কে বোঝানো হতো ডট চিহ্নের সাহায্যে। এর প্রয়োগ ওই ডেসিমেল এর উপর ছিল অর্থাৎ দশক ,শতক ,সহস্র ,হাজার ইত্যাদি। মানে ওই রোমান বিটকেল X ইত্যাদির মাধ্যমে সংখ্যার জটিলতার নিরসন হয়ে গিয়েছিল আগেই। প্রসঙ্গত ভারতীয় এই শূন্য সর্বপ্রথম গাণিতিক ভাবে এর সঙ্গায়িত করে সঠিক ব্যবহার করে। আমরা এর উপর প্রথম কাজ করতে দেখি প্রাচীন জ্যোতির্বিদ এবং অংক শাস্ত্রের বিজ্ঞানী ব্রহ্মদেব এর রচনা ব্রহ্মসিদ্ধান্তে।

এই ‘শূন্য ‘ র মতো কি কিছু আগে বা ঐসময়ে কোথাও ছিল না ?

হ্যা ছিল কিন্তু ভাবনাটা মায়া সভ্যতার মানুষরা অংকের হিসেবে আনতে পারেন নি। অর্থাৎ শূন্যের জায়গায় ঝিনুকের মতো কিছু ব্যবহার করার কথা  ভেবেছে কিন্তু ওই স্থান নির্ণয় বা য্থায্থ ব্যবহার আর কেউ করতে পারে নি ফলে সংখ্যার সরলীকরণ বা সঠিক ভাবনায় ভাবার কাজ আর কারোর দ্বারা হয় নি। ব্যাবিলনীয় সভ্যতা এর নির্ণয় না করতে পেরে ওই জায়গাটা গ্যাপ মানে লাফিয়ে পরের ধাপে গিয়েছে। একই কথা বলেন অক্সফোর্ডের গণিতবিদ Marcus du Sautoy , লিংকে দেওয়া ভিডিওটি দেখলে আরো পরিষ্কার ধারণা পাবেন।

তা এই পুঁথিটি ঠিক কিসের উপর লেখা ?

এই পুঁথি আরো রহস্য তৈরী করছে ,কারন এটি এক ধরণের ব্যবসা করার প্রশিক্ষণ দেওয়ার উপর বই ,আপনি এতে আলজেব্রার ব্যবহার পাবেন ,খেয়াল করে ! আগে আমরা জানতাম ওটা আরব থেকে এসেছে মানে আলজেব্রা ,এই বই কিন্তু ওটার ধারণা ও পাল্টাচ্ছে ! বইটি আপনাকে শিখাচ্ছে এই সিল্ক রুটে বাণিজ্যিক পন্থা ,অঙ্ক ব্যবহার করে কত জিনিস কত দামে বেচলে আপনি কত লাভ করবেন। অনেক গুলো যদির উপর কাজ আছে আর যদির উপর কাজ হয় ওই আলজেব্রার প্রয়োগে। কি বুঝলেন ? উহু , আমি বলছি না ,বলছেন Du Sautoy , ছবি ও দিলাম।

তা হলে তো আরো প্যাচ বাড়লো ! কেন ?

কারন যদি ব্যবহারের জন্য একটা বই সেই সময়ে কেউ লিখে থাকে তা হলে এর আবিষ্কার তো আরো আগের হয়। কি বলেন ?

কথা হলো এই পুঁথির সময় বের করতে এতো সময় লাগলো কেন ?

আগে এই পুঁথি নিয়ে নানান পন্ডিতের নানান মত ছিল। সর্বপ্রথম এর সময় নিয়ে একটা যুক্তিনির্ভর ধারণা দিয়েছিলেন জাপানি পন্ডিত হায়াশি তাকাও। তিনি এই পুঁথির সময় অষ্ঠম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ভাবেন। এই ভাবনার কারণ ছিল ওই লেখার ধরন তার সাহিত্য আর তার গাণিতিক গবেষণার ধাঁচ অনেক আধুনিক মনে হয়েছিল। সমস্যা ছিল এই পুঁথি লিখিত ছিল বার্চ গাছের পাতায় আর পাতাগুলো ছিল ভীষণ ভঙ্গুর। অতঃপর এর রেডিও কার্বন ডেটিং আমাদের সঠিক সময়ের নির্নয় করতে সাহায্য করে। সকল সন্দেহের নিরসন হয়।

আজকের এই বাইনারি কনসেপ্ট বা ডিজিটাল যুগের মূল কিন্তু ওই শূন্যের সঠিক ব্যবহারের পথ যা দেখিয়েছে ভারত। আরো গর্বিত বোধ করি এর আবিষ্কার এতো আগে হয়েছে বলে যখন গোটা পৃথিবীর প্রায় অধিকাংশ জায়গায় বিজ্ঞানের চর্চা ছিল না। গর্বিত বোধ করছি বডলিয়ান গ্রন্থাগারের প্রধান গ্রন্থাগারিক যখন বলেন এই প্রমান এটাই দেখিয়েছে যে এই উপমহাদেশ জ্ঞান বিজ্ঞানে কত আগের থেকে কি উচ্চ জায়গায় আসীন ছিল।

এই বিষয়ে একটি ইউটিউব ভিডিও সংযুক্ত করলাম আপনাদের আরো বিশদে জানার জন্য। আরো বলি , এই পুঁথিটি সর্বসাধারণের কাছে প্রদর্শন করা হবে চৌঠা অক্টবর (৪/১০/২০১৭) এ লন্ডন সায়েন্স মিউজিয়ামে। অসাধারন নাম দেওয়া হয়েছে এই প্রদর্শনীর , ইচ্ছা করে ওটার ইংরেজি নামটা আগে দিলাম : Illuminating India , আমার ভাষায় উদ্ভাসক ভারত ! এতে ভারতের যুগে যুগে অগ্রগতির প্রতীক আর ছবি ইত্যাদি নিয়ে সাজানো হবে পুরো প্রদর্শনীটি।

ছবির জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই বডলিয়ান গ্রন্থাগার এবং তাদের তথ্যসূত্র কে। আর খবরের জন্য নিম্নলিখিত সূত্র কে।

লেখাটি পড়ে আপনাদের কি মনে হলো একটু জানাবেন , যদি এর উপর আরো কিছু আলোকপাত করতে পারেন তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকবো। সবাইকে ধন্যবাদ ধৈর্য ধরে পড়ার জন্য।

তথ্যসূত্র :
১. https://www.youtube.com/watch?v=pV_gXGTuWxY&feature=youtu.be
২. https://www.dawn.com/news/1358036/1800-year-old-dot-is-first-zero-say-researchers
৩. http://www.sciencemuseum.org.uk/visitmuseum/Plan_your_visit/exhibitions/illuminating-india
৪. https://www.theguardian.com/science/marcus-du-sautoy