রাজ্যের ৯৮.৩% অমুসলমান তাদের জন্য এক পৃথক দেশ চান।

Spread the love

২০ জুন পশ্চিমবঙ্গ (স্থাপনা) দিবস পালন করুন!

ভারতে প্রত্যেক রাজ্যেরই একটা রাজ্য দিবস আছে। নেই শুধু পশ্চিমবঙ্গের। পশ্চিমবঙ্গের কোন রাজ্য দিবস নেই কেন? আমাদের কি পশ্চিমবঙ্গ বাসী হিসেবে কোন গর্ব নেই নাকি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য গঠনের ইতিহাস আমরা বিস্মৃত? দুইই আংশিকভাবে হলেও সত্য। আজ পশ্চিমবঙ্গ ভারতে অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ, দরিদ্র ও পশ্চাদপদ রাজ্য। কিন্তু প্রতিবেশী রাজ্য বিহারও তো তাই। তবুও তো সেখানে পালিত হয় বিহার দিবস। নানান উৎসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাজ্যবাসী পালন করেন ওই দিনটি। তারা স্মরণ করেন বিহারের মহান ব্যক্তিত্বদের, তুলে ধরেন রাজ্যের কৃষ্টি ও ঐতিহ্যকে, গর্ববোধ করেন একজন বিহারবাসী হিসেবে। আমরাও কি তাহলে পারি না বছরে একটি দিন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করতে? ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলিতে সাধারণত রাজ্য প্রতিষ্ঠার দিনটিকেই রাজ্য দিবস হিসেবে পালন করা হয়। মহারাষ্ট্রে যেমন ১ মে, কর্ণাটকে ১ নভেম্বর, রাজস্থানে ৩০ মার্চ।
এখন প্রশ্ন পশ্চিমবঙ্গের প্রতিষ্ঠা দিবসটি কবে? ব্রিটিশ শাসনকালের শেষ লগ্নে দেশভাগ ছিল এক অনভিপ্রেত অনিবার্য পরিণতি। বিংশ শতকের গোড়া থেকেই বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রতিহত করতে ব্রিটিশ শাসকগণ জাতীয়তাবাদ বিমুখ মুসলমান সমাজকে সাংবিধানিক শাসনতন্ত্রে অন্যায্যভাবে অতিরিক্ত সুযোগাসুবিধা দিতে থাকে। ১৯০৫ সালে মুসলমানদের জন্য এক পৃথক প্রদেশের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনে বঙ্গীয় আইনসভায় মুসলমানদের জন্য সংখ্যার অনুপাতে অতিরিক্ত প্রতিনিধিত্ব প্রদান বঙ্গদেশে মৌলাবাদের জন্ম দেয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর ওয়াহাবী মানসিকতার পুনর্জন্ম হয় মুসলমান নেতৃত্বের মধ্য। খিলাফত আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের প্রকৃত প্যান-ইসলামী স্বরূপ প্রকাশ পায় ও স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামী রাষ্ট্রের দাবীর মধ্যে দিয়ে তা প্রকট হয়। মুসলিম লীগ যখন পাকিস্তান প্রস্তাব গ্রহণ করে জাতীয় নেতৃত্ব তখন তাকে “ফ্যান্‌টাস্টিক নন্‌সেন্স্‌” বলে উড়িয়ে দেন। ১৯৪৬এর ১৫ আগষ্ট পাকিস্তানের দাবীতে কলকাতার রাস্তায় হিন্দুর রক্তে হোলি খেলার পর নোয়াখালি ও পূর্ববাংলার অন্যান্য জায়গাতে হিন্দুদের সার্বিক গণহ্ত্যা অনুষ্ঠিত হলে ক্ষমতালোভী জাতীয় নেতৃত্ব পাকিস্তানের দাবী মেনে নেয়। মুসলমান নেতৃত্ব গোটা বাংলার পাকিস্তানভূক্তি দাবী করলে জাতীয়তাবাদীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁরা বাংলার অমুসলমানদের জন্য পশ্চিমবঙ্গ নামে এক নতুন রাজ্যের প্রস্তাব দেন, যা পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতের অন্তর্ভূক্ত আর তাঁরা বলেন যে যুক্তিতে মাত্র ২৪% মুসলমান ভারতে থাকতে চাইছেন না, সেই একই যুক্তিতে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার ৪৫% অমুসলমান পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হতে চাইবেন কেন? অমৃতবাজার পত্রিকার একটি সমীক্ষায় দেখা যায় রাজ্যের ৯৮.৩% অমুসলমান তাদের জন্য এক পৃথক রাজ্য চান। বুদ্ধিজীবি থেকে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ পশ্চিমবঙ্গের দাবীতে আন্দোলন করতে থাকেন।
আন্দোলনের প্রভাবে ব্রিটিশ শাসক তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হন। তারা আইনসভায় ভোটাভোটির মাধ্যমে বিষয়টার মীমাংসা করার সিদ্ধান্ত নেন। ২০ জুন ১৯৪৭ বঙ্গীয় আইনসভার অমুসলমান সদস্যগণের সংখ্যগরিষ্ঠ ভোটে পশ্চিমবঙ্গের দাবী সুনিশ্চিত হয়। প্রধানমন্ত্রী (তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের তাই বলা হত যেমন অখণ্ড বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী মুসলিম লীগের সুরাবর্দী) প্রফুল্ল ঘোষের নেতৃত্বে একটি সমান্তরাল মন্ত্রীসভা গঠিত হয়ে যায়। অমুসলমান আমলারা সুরাবর্দীর পরিবর্তে প্রফুল্ল ঘোষকেই রিপোর্ট করতে শুরু করেন। জন্ম হয় পশ্চিমবঙ্গের। আজ পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব সংকট। যে বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাধারা এককালে দেশভাগ করে পাকিস্তান গঠন করেছিল সেই একই চিন্তাধারা আজ বকলমে পশ্চিমবঙ্গের ভাগ্য নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায়। ১৯৪০-এর দশকে শিক্ষা ও চাকরী ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য বিশেষ সংরক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ইসলামী রাষ্ট্রের যে বীজ বপন করা হয়েছিল আজ পশ্চিমবঙ্গে সেই বীজ পুনরায় রোপিত হচ্ছে। আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে যে নোয়াখালির পুনরাবৃত্তি হবে না তা কে বলতে পারে? না কোন “ফ্যান্‌টাস্টিক নন্‌সেন্স্‌” নয়, বরং আরও কঠিন ও রূঢ় এক বাস্তব অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। শুধু ভোট দিয়ে দায় সারলে চলবে না। ফেসবুকে লাইক করেও না। ধর্মনিরপেক্ষ নেতা ও বুদ্ধিজীবিদের গালি দিয়েও কোন লাভ নেই। ক্ষতি যা হবার আপনারই হবে। অদূর ভবিষ্যতে শরণার্থী শিবিরে বসে কি উত্তর দেবেন নিজেকে? নিজের পরবর্তী প্রজন্মকে? আপনার সামনে দুটোই মাত্র পথ। শরণার্থী শিবিরের ভিক্ষার অন্নে জীবন্মৃত হয়ে বেঁচে থাকা অথবা নিজগৃহে নিজের উপার্জনে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা। সিদ্ধান্ত আপনার। তৃতীয় কোন বিকল্প নেই।
পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি হয়েছিল আপনারই জন্য। পশ্চিমবঙ্গের অস্তিত্ব রক্ষার দায়িত্বও আপনার। আজ যুবসমাজের এক বৃহৎ অংশের জানা নেই কোন পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমবঙ্গের সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সময়ের উপর সেই ইতিহাসের কি অপরিসীম গুরুত্ব। যুবসমাজের মধ্যে এই সচেতনতার একান্ত প্রয়োজন। সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই ২০ জুন পালিত হইয়েছে পশ্চিমবঙ্গ দিবস। আপনার অঞ্চলে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাক্ষেত্রে আপনিও পালন করুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস। আসুন লড়াই করি পশ্চিমবঙ্গের জন্য।