Home Bangla Blog কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার…………………………।।

কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার…………………………।।

213
কবি
সুরেন্দ্রনাথ মজুমদাকে বাংলার অন্তরঙ্গ গীতিকবিতার অন্যতম পথিকৃতের
মর্যাদা দেওয়া হয়।  অমর সৃষ্টি মহিলা কাব্য এর জন্য তিনি খ্যাতি অর্জন
করেন।  কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ১৮৩৮ খৃষ্টাব্দে যশোর জেলার কোতয়ালী থানার
বসুন্দি ইউনিয়নের অর্ন্তগত জগন্নাথছর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।  তাঁর পিতার
নাম প্রসন্ন সাহা মজুমদার । অল্প বয়সে তাঁর পিতার বিয়োগ ঘটে। গ্রামে তার
শৈশব কাল ও বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। তিনি ফার্সী ও হিতোপদেশ মূলক নীতিগ্রন্থ
পাঠ অভ্যাস করেন। তিনি বাল্যকাল কলকাতায় থ্রি চার্চ ইনষ্টিটিউশন,
ওরিয়েন্টাল মিসনারি ও হেয়ার স্কুলে পড়াশুনা করেন। স্কুলের শিক্ষা তাঁহার
সীমাবদ্ব ছিল। গৃহে বসে তিনি স্বাধীনভাবে জ্ঞানচর্চা করেন। ১৮৬০ খৃষ্টাব্দে
থেকে তিনি প্রকাশ্যে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন। তিনি ‘বিবির্ধাথ সংগ্রহ ও
নলিনী’ পত্রিকায় নিয়মিত নিখতেন।

কবি সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার মহাশয়ের রচিত গ্রন্থগুলি হল:
১। মহিলা কাব্য
২। ষড়ঋতু সুদর্শন (কাব্যগ্যন্থ-১৮৫৬ খৃষ্টাব্দ)
৩। সবিতা সুর্দশন
৪। বর্সবর্তন
৫। রজস্থানের ইতিবৃ্‌ত্ত
৬। হামির (ঐতিহাসিক নাটক-১৮৮১ খৃষ্টাব্দ)
৭। বিশ্বরহস্য(প্রবন্ধ গ্রন্থ- ১৮৮১ খৃষ্টাব্দ)
৮। ভারতের ব্রিটিশ শাসন পরিদর্শন

তাঁর সব রচনাগুলেই উচ্চাঙ্গের । তাঁর সৃষ্টি সাহিত্যের মধ্যে মহিলা কাব্যই
সর্বশ্রেষ্ঠ। গীতি কবিতার ক্ষেত্রে তিনি বৈজ্ঞানিক মুক্তি ও কার্যকরণের
উপর বেশী প্রধান্য দিয়েছেন। তার ‘মহিলা কাব্য’ উপহার , মাতা ও জয়া এই তিন
ভাগে রচিত হয়েছে। ভগ্নী অংশ লেখার ইচ্ছার থাকলেও পূর্বেই পরলক গমন করেন।
‘হিলা কাব্যে’  যুক্তির্তক ও কাব্যিক প্রশান্তি অধিক গুরুত্বসহকারে দেখা
হয়েছে। ‘বর্চবর্তন কাব্যগ্রন্থে নীতিমুলক বক্তব্য ও আত্বচিন্তার পরিচয়
পাওয়া যায়। এসব কবিতা পুরনো বৎসরের আবিভার্ব এবং নতুন বৎসরের সুচনা নিয়েই।
তার সস্পর্কে মুহাম্মাদ শাহাদত আলী আনসারী বলেন, ‘তার মহিলা’ ‘চিত্রঙ্গদা’,
‘মন্দেদরী’, ‘বিরঙ্গনার বিদ্রোহিনী’ ও কী বিহারী লালের বঙ্গ সুন্দরীর
সঙ্গে তুলনীয়। কবি নারী চরিত্রের দুর্লভ গুনাবলী প্রকাশ করেছেন তার কাব্যে
এবং নারীকে তার সত্যমুল্য প্রতিদান করার চেষ্টা করেছেন। তাঁর এই নারী
প্রশান্তি বিংশ শতাব্দীর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা পথ সুগম করেছেন। কবির
বর্ননা অনস্কার মন্ডিত ও বিষয়বস্ত ঊপমায় সমৃদ্ব। ঊনবিংশ শতাব্দীর
কাব্যাঙ্গনে সুরেন্দ্রনাহা মজুমদার বিশেষ আসনের অধিকারী।”

১৮৬০ খৃষ্টাব্দে তিনি অপম্বার রোগে আক্রান্ত হন। ঐ রোগ থেকে তিনি আর কখনো
মুক্তি লাভ করেন নি। মোহিত লাল মজুমদার “আধুনিক বাংলা সাহিত্য গ্রন্থে
সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার সম্পর্কে যা বলেছেন তা তুলে দেওয়া হল।

“মঙ্গল ঊষা” নামক একখানি পত্রিকা প্রচার করিয়া তাহাতে কবি পোপের Templo of Fame
কবিতার পদ্যানুবাদ প্রকাশ করেন। এই সময় বিবিধার্থ সংগ্রহের কোন এক সংখ্যায়
তাঁহার প্রতিভা বিষয়ক গদ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। তাহাতে লেখকের নাম নাই।
ইহারেই সমকালে বিশ্ব রহস্য নামে একটি প্রাকৃতিক ও লৌকিক রহস্য বিষয়ক
সর্ন্দভ পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। ১৮৩৪ সংবর্তে নূতন বাঙ্গালা যন্তে ঊহা
কিন্তু ঊহাতেও প্রলেতার নাম নাই।

বিষয় বুদ্ধি বা লোক চরিত্রচর্চার আরও ঊম্মেষ হয় তাহার জীবিকাকর্মে।
বাল্যকাল হইতে সঙ্গীতে তাহাঁর খুবই আসক্তি ছিল। এ জন্য যৌবনে সঙ্গীতচর্চার
আগ্রহে তিনি কিছুকাল এমন স্থানে যাতায়াত করিতেন, যাহাকে মুরা ও বারাঙ্গনার
বঙ্গভুমি বলা যাইতে পারে এবং সঙ্গদোষ হইতে তিনি অব্যাহতি পান নাই। যে মৌলবী
সাহেব এই সংগীতচর্চায় তাহার সর্তীথ ছিল, তিনি দিল্লীর সম্রাট মান্য সৈয়দ
বংশীয় অতি তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন সুপন্ডিত। আরব্য, পারস্য, ঊর্দ্দু
প্রভুতি ভাষায় বিশেষ বুৎপন্ন এবং ইংরেজীতেও কিছু কিছু জানা ছিল। দর্শন ও
সঙ্গীত শস্ত্রে প্রকৃত অধিকার ছিল, কিন্তু ঘোর নিরীশ্বরবাদী
সুরেন্দ্রনাথের  জীবনের এই সর্ব্বাপেক্ষা দু:সময়ে তাহার বনধুকে লিখিত
পত্রাবলী হইতে কবির কিছু কিছু ঊক্তি ঊদ্ধিৃত করিতেছে, তাহাতে
সুরেন্দ্রনাথের কবিস্বভাবের সুস্পষ্ট পরিচয় আছে।

দেশহিতৈষিতা, ন্যায়পরায়নতা ও করুনা এসময়ই গুনাভিঠেয় পরস্পরকে পরস্পরের
অভাবে অবস্থান করিতে দেখা যায়। কিন্তু পানা নুরাগ কাম মত্ততা, মিথ্যা কথন
প্রভৃতি দোষগুলির পরস্পর কি প্রনয়। একের অবস্থান, স্থানে একে একে প্রায় সকল
গুলিই সমবেত হয়। তুমি জ্ঞাত আছ এক কাম ভিন্ন অন্য স্বভাব দোষ আমার ছিল না।
কিন্তু সেই এক দোষের প্রভাবে ক্রমে সমুদয় দোষের আধার ইহার এখন প্রকৃত
প্রদত্ত স্বভাবকে নিহত করিয়াছে। বিধাতা যেরুপ মানুস আমাকে করিয়াছিলেন আমি
আর সেরুপ নাই-আপনি আপনাকে পুনঃসৃষ্টি করিয়াছি।

“আমি দূর্বল দরিদ্রকে ঘৃনা করি, সবল ধনীকে ভয় করি যাহাদিগকে জ্ঞানী ও বিজ্ঞ বলে তাহাদিগকে অবিশ্বাস করি।”

সুরেন্দ্রনাথের জীবনে এই ঘুর্নিপাক ঘটিয়াছিল ২৩/২৪ বৎসর বয়সে। সেই বয়সে
সেই অবস্থায় তাহাঁর এই সকল ঊক্তি পাঠ করিলে, তাহাঁর চিত্তবৃত্তির প্রখরতা ও
চিন্তাশীলতা প্রতিভাশালী ব্যাক্তির উপযুক্ত বলিয়াই মনে হয়। দেবশক্তির
অধিকারী যে পুরুষ তাহার বয়সের মাপ সাধারনের  মত নয় এ চরিত্র কবির এবং এইরুপ
অভিজ্ঞতা কবির জীবনেই ঘটে সে পুরুষ মাটি মাখিয়াই আরও শক্তিমান হইয়া ওঠে।

এই সময়ে সুরেন্দ্রনাথের পত্নী বিয়োগ হইয়াছিল। চব্বিশ বৎসর পূর্ন হইবার
কালে তিনি দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করেন এবং ইহারই পরে মৃত্যুকাল পর্যন্ত
তাহাঁর চরিত্র কঠোর আত্নসংযম কখনো শিথিল হয় নাই। ইহারই ফলে তাহাঁর
কাব্যকল্পনায় সহজ রস রসিকতার পরিবর্তে অতি কঠিন তত্ত্ব-প্রীতি ও নৈতিক
ঊৎসাহ প্রবল হইয়াছিল, এ বিষয়ে সন্দেহ নাই। চব্বিশ বৎসর বয়সের মধ্যেই তাহাঁর
মনঃ প্রকৃতি পরির্বতন হইয়া গেল কবি প্রাণ সুরেন্দনাথ তত্ত্বান্বেষী হইয়া
ঊঠিলেন, তাহার নিজের ভাষায় বিধাতা যেরুপ মানুষ আমাকে করিয়াছিলেন আমি আর
সেরুপ নাই। আপনি আমাকে পুনঃসৃষ্টি করিয়াছি। তাহাঁর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তের
লেখক বলিতেছেন-তাহাঁর (সুরেন্দনথের) চিত্তেক্ষেত্রে জ্ঞান ও প্রেম যেন
মল্লযুদ্ধে মত্ত হইয়া ছিল। অনুবাদ মহা ভারতের কিরাত্তজ্জুনীয় পোপের ইলৈসা ও
আবেলার্ড বা গোল্ড স্মিথের, ট্রাভেলার ও মুরের আইরিশ মেলডিস, এর অধিকাংশ
চন্দ্রে গ্রথিত হইয়াছিল।

১২৭৪ হইতে দ্বিতীয়বার অপসার রোগের পর সুরেন্দ্রনাথ যাহা রচসা করেন তাহার
কয়েকটি এই গ্রেব ত্রলিমীর। অনুবাদ নবোন্নতি (আখ্যায়িকা) মাদক মঙ্গল(কবিতা),
‘সুবিতা সুদর্শন’ ও ‘ফুলরা’ নামে দুটি গাথাঁ, বারভে অব ভিনিসের (Braro of Venice) অনুবাদে এ সকল ব্যাতীত তিনি একটি অতি দুরুহ অনুবাদ কার্য্য সুসম্পন্ন করেন Plato-i-Immortality-
অনুবাদ নিজকৃত ব্যাখ্যা ও অবতারনিকা সমেত। এই পুস্তকের সকল পান্ডলিপি ধরে
নষ্ট হয়ে যায়। বহু আয়াস সহকারে দীর্ঘকাল গবেষনা ও তত্ত্বানুসন্ধান করিয়া
তিনি এই পুস্তক রচনা করেন। ইহাতে সক্রেটিসের জীবনীও ছিল এবং টিপ্পনিতে
পৃথিবীর ভুত বর্তমান ধর্ম বিশ্বাস , নব্য বৃদ্ব দার্শনিক সত্য এবং প্রাচীন
গ্রীক ও ভারতের আচার গত সাদৃশ্য প্রভৃতি সাবধানে আলোচিত হয়। এই রচনায় নস্ট
হওয়ায় সুরেন্দনাথ বলিয়াছেলেন, আমার আজম্মের যত্ন সঞ্চিত আর লেখা নষ্ট হইয়া
যদি এই একটি মাত্র অবশিষ্ট থাকিত এত দুঃখিত হইতাম না। এবন্বিধ সাধ্য জ্ঞান
গবেষনা এবং কাব্য রচনা অপেক্ষা ও তৎপ্রতি কবির এই আসক্তি, সুরেন্দ্রনাথের
কবি জীবন ও কবি স্বভাবের বিপরীত পরিনতির প্রমান দিতেছে। ১২৮৮ সালে ‘সলেনী’
পত্রিকায় ‘সন্ধ্যার প্রদীপ’,‘চিন্তা’, ‘খদ্যোতিকা’, ‘ঊষা’,প্রভৃতি কবিতা
প্রকাশিত হইয়াছে। ষোডোন্দ্রনাথ সরকার লিখিত সুরেন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত
জীবনী।

অপেক্ষাকৃত অল্প বযসেই সুরেন্দ্রনাথের কবি মানস পৌঢ়ত্ব লাভ করিয়াছিল,
ক্রমে তিনি জীবন ও জগৎ সন্বন্ধে একটা পরম তত্ত্বের আশ্রয় গড়িয়া লইত
প্রবৃত্ত হইলেন, তাহাতেও তাহার প্রকৃতি গত কবি ধম্মই জয়ী হইয়াছিল।

১২৭৮ সালে পুনরায় স্বাস্থ্য ভগ্ন হওয়ায় কবি কিছুকাল মুঙ্গেতে বাস করেন।
সেই খানেই তিান তাহার ‘মহিলা কাব্য রচনা করেন। ১২৮০সালে তিনি কর্নেল টড কৃত
রাজস্থান অনুবাদ করিতে আরম্ভ করেন। ইহাই তাহার শেষ সারম্বত কর্ম বলিয়া মনে
হয়। যদিও তিনি পুব্বলক্ক রাজন্থানের অনুবাদ মৃত্যুও কিছুদিন পুর্বে আবার
আরম্ব করিয়াছিল। এই গ্রন্থের অনুবাদ অসমাপ্ত রাখিয়া ১২৮৫ সালের ৩রা বৈশাখ
প্রাতে তিনি বিসুচিকা রোগে মাত্র ৪০ বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন।

সুবেন্দ্রনাথ কখনোও হৃষ্টপুষ্ট সবল ছিলেন না, তাহার দুরারোগ্য অপম্বার
ব্যাধিও ছিল। এ সকল সত্ত্বেও তাহার জীবন সাহিত্য সাধনার একাগ্রতা লক্ষ্য
করিবার যোগ্য। তাহার জীবনীকার বলিয়াছেন তাহাঁর আয়ুকালের সহিত তাহাঁর রচনার
পরিমান করিলে তাহাকে অতিশ্রমী বলিতে হয়।

তাহার রচনার পরিমান অল্প না হইলেও অধ্যায়ন অনুশীলন আরও অধিক ছিল। রচনাও
অল্প নহে , কারন ইহাই প্রতীত ২য় যে, প্রকাশিত কাব্য কবিতা ও নিবন্ধ
ব্যাত্তীত অপ্রকাশিত ও অসমাপ্ত রচনাও বিস্তর ছিল। খন্ড কবিতা লপ্ত হইয়াছে
বহু গদ্য রচনাও আরও পাওয়া যায় না। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলেই
সুরেনন্দ্রনাথের ছব্বল দেহ আরও দুর্ব্বল হইয়াছিল। তাহাঁর অকাল মৃত্যুর
কতকটা কারন ইহাই।

তিনি যাহা রচনা করিতেন তাহা যেন প্রকাশ করিতে চাইতেন না। ইহার জন্যই অনেক
রচনা নষ্ট হইয়াছে। যাহা প্রকাশিত হইত তাহাতেও নাম দিতে চাইতেন না। প্লেটোর Immortality-
ষ্টীক অনুবাদ এই জন্য কীটদুষ্ট হইয়াছিল, এই জন্যই ‘মহিলা’ কাব্য তাহার
মৃত্যুর পরে প্রকাশ পয়। জনৈক আত্বীয় চুরি করিয়া তাহার ‘সবিতা সর্দশন’
ছাপাইয়া দেন। ইহাতে কবির নাম ছিল বলিয়া মুদ্রাঙ্গনে দ্রম প্রদর্শন করিয়া
তিনি তার পুস্তক আবদ্ব করেন। ‘বর্ষবর্তন’ কাব্য খানি কোনও বন্ধু কতৃক
মুদ্রিত হয়, উহাতে লেখকের নাম ছিলনা। সুরেন্দ্রনাথের এই আচরনের জন্য যে
কারনেই থাকুক তিনি (কবি) যশোরে জন্য লালারিত ছিলেন না। নিজ সন্তোষ ও বিশেষ
করিয়া আত্নানুশীলনের জন্যই কাব্য রচনা করিতেন ইহাও সত্য।

তথ্যসূত্র: অজ্ঞাত

%d bloggers like this: