(১)

রামায়ণ পড়েছেন নিশ্চয়ই? প্রিয় চরিত্র কী?

এক ঝাঁক উত্তর আসবে। রাম, হনুমান, ইন্দ্রজিৎ, সীতা …..।

উর্মিলাকে মনে পড়ে ? লক্ষ্মণপত্নী উর্মিলা?

বারো বছর স্বামীকে ছেড়ে থাকা, নিজের সমস্ত সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়া উর্মিলাকে?

রামায়ণ ছেড়ে এবার বাস্তবের মাটিতে আসুন।

“Who’s Who of Indian Martyrs” নামক একটি বই আছে, ভারত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নিয়ে যারা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের নামের তালিকা ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

তাতে গান্ধীপত্নী কস্তুরীবাঈ এর নাম পাবেন। আরো অনেকেরই নাম পাবেন।

একটি নাম পাবেন না। রামরাখী। শহীদ বালমুকুন্দের স্ত্রী রামরাখী।

দিল্লি ষড়যন্ত্র মামলায় বিপ্লবী বাল মুকুন্দের ফাঁসি হয়, ১৯১৪ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারি। একই দিনে তাঁর ২০ বছর বয়সী স্ত্রী রামরাখী আমরণ অনশন করে মৃত্যুবরণ করেন। স্বামী স্ত্রীর দেহ একই সঙ্গে দাহ করা হয়েছিল।

রামরাখী মর্যাদা পাননি। কীভাবে নিজেদের পাওনা আদায় করতে হয়, ওরা জানতেন না।

এবার ভারত ছেড়ে চলুন বিদেশে। সুদূর নবীন সূর্যোদয়ের দেশে।

(২)

সন ১৯১৮ । জাপান।

জাপানের এক ষোড়শী তরুণী। নাম তোশিকো। বাবা মি: সোমা জাপানের এক রুটি কারখানার মালিক। স্কুলছাত্রী, সুন্দরী, পাণিপ্রার্থীদের ভিড় লেগেই আছে। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।

হঠাৎ ছন্দপতন ঘটলো তাদের নিশ্চিন্ত জীবনে। ঘটালেন পরাধীন ভারত থেকে পালিয়ে আসা এক ভারতীয় বিপ্লবী। নাম রাসবিহারী। রাসবিহারী বোস।

মানুষটি সামান্য নয়। গোটা ভারতের পুলিশবাহিনীকে নাকানিচোবানি খাইয়েছেন। লর্ড হার্ডিঞ্জকে বোমা মারার যাবতীয় প্ল্যান ওনার। তাঁর সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা সফল হলে ভারতে এতদিনে ব্রিটিশদের টিকিও খুঁজে পাওয়া যেত না। ডেঞ্জারাস লোক।

এহেন লোকটিকে ব্রিটিশ বাহিনী হন্যে হয়ে খুঁজবে , আশ্চর্য কী!! একবার, একবার খুঁজে পেলে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়ে যদি গায়ের জ্বালা মেটে।

কিন্তু না, তারা সফল হয়নি। তাদের ফাঁকি দিয়ে, তাদের নাকের ডগা দিয়ে রাসবিহারী পালিয়ে এসেছেন জাপানে। আশ্রয় নিয়েছেন ব্ল্যাক ড্রাগন পার্টির নেতা মিৎসু তোয়ামার কাছে। আর তোয়ামাও পুলিশের নজর এড়াবার জন্য রাসবিহারীকে গচ্ছিত রেখেছেন রুটি কারখানার মালিক সোমার কাছে। এর চেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা তারা মাথায় আসেনি।

আপত্তি করেননি সোমা। দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা এক বিপ্লবীকে আশ্রয় দেওয়া গর্বের ব্যাপার বলেই মনে করেন তিনি।

কিন্তু তোয়ামার পরের প্রস্তাব যে মারাত্মক। তিনি রাশবিহারীর জন্য আরো কিছু চান। চান তার আদরের দুলালী, সাত রাজার ধন এক মানিক, তার কন্যা তোসিকো কে।

তোয়ামার মতে জাপান পুলিশ আর ব্রিটিশ পুলিশ , এই যুগ্ম বাহিনীর থেকে রাসবিহারীকে বাঁচাতে হলে চাই এমন একজন মানুষ ,যিনি সঙ্গে থাকলে কেউ অপরিচিত রাসবিহারীর দিকে সন্দেহের চোখে তাকাবে না। তাই তোয়ামার প্রস্তাব, সোমার কন্যা তোসিকোর সঙ্গে রাসবিহারীর বিয়ে হোক।এছাড়া রাসবিহারীকে বাঁচানো যাবে না।

হতভম্ব সোমা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার ছেড়ে দিলেন তোসিকোর ওপরেই।

(৩)

কীসের অভাব ছিল তোসিকোর? কী দরকার ছিল অন্য দেশের এক অজানা বিপ্লবীর স্বার্থে নিজের জীবনের সমস্ত আহ্লাদ বিসর্জন দেওয়ার? ব্যালান্স শিটের অঙ্কে মেলে না যে!!

কিছু মানুষ নিজের চাওয়া পাওয়ার অঙ্ক বোঝে না!!

নিজের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি উপেক্ষা করে তোসিকো তাই হাসিমুখে স্বীকার করে নিলেন রাসবিহারীকে, একই সঙ্গে নিজের দুর্ভাগ্যকেও।

আট বছরের সংক্ষিপ্ত বিবাহিত জীবন। তার মধ্যে সতেরো বার বাসা পরিবর্তন করতে হলো। , জাপান ও ব্রিটিশ গুপ্তচরদের এড়াতে। পদে পদে বিপদের ভয়। কখন যার অলক্ষ্য থেকে মৃত্যু এসে হানা দেবে, কে বলতে পারে। রাসবিহারী যে সামান্য লোক নয়, তাকে মারতে পারলে অনেকের লাভ।

কোনো দুঃখ নেই তোসিকোর, সব কিছু মেনে নিলেন তিনি। স্বামীকে শেখালেন জাপানি ভাষা, নিজেও স্বামীর থেকে আত্মস্থ করে নিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি, খাওয়া দাওয়া, অভ্যাস, সবকিছুই!!

প্রতি মুহূর্তে উদ্বেগ, প্রতি মুহূর্তে ভয়, এই বুঝি কেউ …!

দুঃসহ জীবনের অবসান ঘটলো ১৯২৩ এর জুলাই মাসে, রাসবিহারী স্বীকৃতি পেলেন জাপানি নাগরিক হিসেবে।

তারও দুই বছর বাদে নিজের সমস্ত কর্তব্য চুকিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন তোসিকো, একটি পুত্র ও একটি কন্যাকে রেখে।

গীতায় ” নিষ্কাম কর্ম’ পড়েছিলেন? সেই যে, কর্মে তোমার অধিকার, ফলে নয়.!

তোসিকোর সমস্ত জীবনই কী আদ্যন্ত নিষ্কাম কর্মের কাহিনী নয়??

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্ৰকৃত ইতিহাস কোনোদিন রচিত হলে নেতাজি সুভাষ স্বীকৃতি পাবেন তার জর্জ ওয়াশিংটন হিসেবে, রাসবিহারী হবেন তার গ্যারিবলডি!

তোসিকো, রামরাখী এরা স্বীকৃতি পাবেন না??

ওরা না থাকলে কী রাসবিহারীর মতো , বালমুকুন্দের মতো বিপ্লবীদের পেতাম?? তাদের বাঁচানো যেত?

আপনার কী মনে হয়?

প্রণাম করুন ওদের। আজ সারা বিশ্বের কাছে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে আপনি যে পরিচয় দেন, ওদেরই জন্য। ওরা নিজেদের পাওনা গন্ডার হিসেব কোনোদিনই বোঝেননি, তাই প্রাপ্য স্বীকৃতি ও পাননি। প্রণাম করুন।

আজ , ২০১৮ র ৯ ই জুলাই রাসবিহারী তোসিকোর বিয়ের একশো বছর পূর্ণ হলো।

#Tribute_to_Toshiko
#Tribute_to_India’s_ Daughter-in-law

শহীদ তোসিকো, মৃত্যুঞ্জয়ী তোসিকো অমর রহে !
By Chayan Mukherjee