মানুষটি আজীবন কোরাণ ও ইসলামের পথে সময় ব্যয় করে গেছেন। বিভিন্ন জায়গায় ইসলামের জীবন বিধান নিয়ে বক্তব্য রেখেছেন। মুমিন মুসলমানদের করনীয় কি, তিনি তার বক্তব্যে একাধিক বার বলেছেন। নারীর শিক্ষা, চাল-চলন, নারীর পড়াশুনা ঠিক কতোখানি হওয়া উচিত, তা তিনি ইসলামের দৃষ্টিকোন থেকে বার বার বলেছেন। তা বলতে গিয়ে তিনি নারীকে তেঁতুলের সাথে তুলনা করেছেন একাধিকার। তেঁতুল দেখলে যেমন মানুষের মুখের জিহ্বা থেকে লালা বের হয়, ঠিক তেমনি নারী দেখলেও পুরুষের দিল থেকে লালা বের হয়। তার যুক্তি হল খাবার উদলা (ঢেকে না রাখলে) রাখলে যেমন খাবারে মাছি বসতে পারে, তেমন নারীরা বোরখা না পড়লে পুরুষরা ঝাপটাইতে পারে বা ধর্ষণ করতে পারে! তাই তিনি নারীকে বোরখা দিয়ে বস্তার মতো ঢেকে চলাফেরা করার উপদেশ দিয়েছেন। নারীকে ৪র্থ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনা করার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন তিনি। নারী চলার জন্য সংসারের সামান্য হিসেব নিকেশ টুকু যাতে করতে পারেন। কারণ ইসলাম বলে দুনিয়াদারীর পড়ালেখা করা হারাম। তাছাড়া নারীর পড়াশুনা করে অতো চতুর হওয়াও ভালো নয়। নারীর একমাত্র কাজ হল স্বামীর সেবা করা আর বাচ্চা পয়দা করা। তিনি যা বলতেন তা ইসলামের দৃষ্টিতে খুব নিষ্ঠার সাথে বলতেন। এবং নিজেও তা পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে তার মেয়েদের চতুর্থ শ্রেণীর বেশি পড়ান নি। আর তার ছেলেদের একেকটা আলেম বানিয়েছেন। নিজেও বানিয়ে ছিলেন ইসলামি-পরিবার।

এদেশের নতুন প্রজম্মের নব্য নাস্তিকরা যখন সবাই মিলে ফেইসবুকে ধর্মের অন্ধতা, কুপমন্ডবতা, অসারতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা-সমালোচনা করছিলেন, দেশের মুসলমানিত্ব নামক একটা বিষাক্ত সাম্প্রদায়িকতাকে পাশ কাটিয়ে যখন শুধুমাত্র মানুষের দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করছিলেন, ঠিক তখনি ইসলামের ধবংস অনিবার্য মনে করে তিনি ২০১৩ সালের ৫ই মে তার সব সমর্থকদের ঢাকা অবরোধ করার নির্দেশ দেন। তিনি মনে করতেন এই কয়েকটা নাস্তিক মিলে তো ইসলাম ধ্বংস করে দেবে। তাই তিনি মনস্থির করেন এই নাস্তিকদের কাছ থেকে যেকোনো মুল্যে ইসলামকে হেফাজত করতে হবে। তাই তিনি “হেফাজত ইসলাম” গঠন (এটা কখন গঠিত হয়েছে সঠিক জানি না) করেন। সেই সময় তিনি আরো মনে করতেন আওয়ামিলীগ সরকার একটা নাস্তিক সরকার। একটি সেক্যুলার সরকার। এই সরকার থাকলে ইসলামের অস্তিত্বের ক্ষতি হবে। পরে তিনি ইসলামি আন্দোলন, ৯০% মুসলমান ও ইসলামি জনতার জুজুর ভয় দেখিয়ে সেই আওয়ামিলীগকে তিনি ইসলামিজম দলে পরিনত করতে সক্ষম হয়েছেন। শুধু তাই নয়, ১৪ সালের পরে আওয়ামিলীগ সরকার তার পদতলে লুঠিয়ে পড়ে, ইসলামের বশ্যতা স্বীকার করে নেন। এর সবটুকু অবদান কিন্তু হাটহাজারী মাদ্রাসা ও হেফাজত ইসলামের প্রধান এই আল্লামা শফীর।

ইসলামিক যোদ্ধা এই মানুষটির বয়স সম্ভবত ৯৩ বছর পেরিয়েছে। হাটহাজারীতে গোটা বড় মাদ্রাসাটি তিনি দাঁড় করিয়েছেন। যেখানে হাজার হাজার শিশুরা তার মাদ্রাসায় পড়াশুনা করছে। তার মাদ্রাসা থেকে পড়ে বড় হয়ে কেউ আলেম হচ্ছে, কেউ হাফেজ হচ্ছে, কেউ হচ্ছে আল্লামা। তিনি আজীবন আল্লাহ, কোরাণ, ইসলাম ও নবীর জয়গান গেয়েছিলেন। তিনি সব সময় মুসলিম ভাইয়ের দেশ পাকিস্তানের অনুগামী ছিলেন। মুসলমানের দেশ পাকিস্তানকে পাক পবিত্র দেশ ভাবতেন। আর প্রতিবেশী মালাউনদের দেশ ভারতকে প্রতিনিয়ত গালাগাল করে নিন্দা করতেন তার বক্তব্যে। কারণ দেশটা অমুসলিম, কাফেরদের। তিনি পৃথিবীর সমস্ত রোগ, বালায়, অসুখ-বিসুখের সমস্যা, আল্লার পবিত্র কোরাণে সমাধান আছে বলে তার মুরিদদের করতেন। মানুষের অসুখ সারানোর শ্রেষ্ঠ ঔষদ মনে করতেন কালো জিরাকে। তিনি অসংখ্যবার ইসলামকে ভালোবেসে হেফাজত করার জন্য বিধর্মী, কাফের, ইহুদি-নাসারাদেরকে গালাগাল করতেন। ইসলামিক বক্তব্য রাখতে গিয়ে অমুসলিম, মালাউনদের অভিষাপ দিতেন বার বার। তাদের মুর্তি পুজা শিরক বলতেন। তাই মুর্তি ভাঙ্গতে বলতেন। তিনি প্রকাশ্যে তার বক্তব্যে বলতেন নাস্তিক হত্যা করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। নাস্তিককে হত্যা করা মুসলমানদের ঈমানি দায়িত্ব বলতেন। এদেশে যেখানে ইসলাম ধর্মের সংকট দেখা গেছে, সেখানে তিনি হুংকার দিয়েছেন বার বার। যেখানে আল্লা, নবী ইসলামের অবমাননা দেখা যেত, সেখানে একাই আল্লা, নবী, ইসলামের পক্ষে দাঁড়িয়ে যেতেন তিনি। ইসলামকে হেফাজত করার জন্য সারাটি জীবন ব্যয় করে গেছেন এই ইসলামিক যোদ্ধা। তার জন্য ইসলামের অনুসারীদের কাছ থেকে পেয়েছেন অঢেল আর্থিক দয়া আর অনুকম্পা। মুমিন মুসলমানরা যখন যেই অবস্থায় পেরেছেন, তাকে দেদারছে টাকা পয়সা আর অর্থ দিয়ে সহয়তা করেছেন। শুধু তাই নয়, এই আওয়ামিলীগ সরকারও তাকে ৩২ কোটি টাকার জমি ও আর্থিক অনুদান দেন। যাতে তিনি মাদ্রাসার শিক্ষা-ব্যবসা বড়ো পরিসরে বাড়াতে পারেন।

—আজ এই ইসলামের মহান যৌদ্ধাটির অসুস্থতার খবর শুনে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। শুনেছি তিনি নাকি সুস্থ হবার জন্য চিকিৎসা করতে ভারতে যাচ্ছেন। যে মানুষটি সারাটা জীবন আল্লাহ, নবী ও ইসলামের হেফাজত করে গেছেন, অথচ এতো বড় ইসলামিক যৌদ্ধাটির চরম অসুস্থতার দুর্দিনেও তার আল্লাহ একেবারেই অনুপস্থিত! আল্লাহর কোরাণের রোগ-বালায়ের সমাধানগুলিও এখন তার রোগকে কোনো ভাবেই সুস্থ করে তুলতে পারছে না! তাকে সুস্থ হবার জন্য যেতে হচ্ছে অমুসলিম হিন্দু মালাউনদের দেশ ভারতে চিকিৎসা করতে! তার জীবন বাঁচানোর জন্য এখন ভরসা করতে হচ্ছে আল্লাহর চেয়ে বেশি মালাউনের দেশ ভারতকে। সেখানে অমুসলিম মালাউন নার্সরা তার সুস্থতার জন্য সেবা করবেন, তাকে আরোগ্য করে তোলার জন্য মালাউন ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করবেন। এই যেন মালাউনদের কাছে শফীর আল্লাহ ও ইসলাম-অহংকারের পরাজয়! এটা দেখে তবুও এদেশের মুসলমান শিক্ষা নেবে না। ভারতের প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞ হবেনা। সেখান থেকে ভালো হয়ে আসলে আবার মালাউনের দেশ ভারতকে গালাগালি দেয়া অব্যাহত রাখবে। আবার পাকিস্তানের মুসলমানিত্বের চেতনা প্রগাঢ় হয়ে উঠবে তাদের অনুভুতি!এই যা আমি এসব কাকে বলছি? মুসলমানদের আবার অমুসলিম ও মালাউনদের প্রতি কৃতজ্ঞা আছে নাকি??? তবুও আল্লামা শফী সুস্থতা কামনা করছি। কারণ প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার আছে….