প্রাচীন যুগের দশ শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনীষার তালিকায় চটজলদি চোখ বুলিয়ে নিন।

Spread the love

প্রাচীন যুগের দশ শ্রেষ্ঠ বাঙালি মনীষার তালিকায় চটজলদি চোখ বুলিয়ে নিন, যাঁদের প্রত্যেকেরই আন্তর্জাতিক/সর্বভারতীয় খ্যাতি ছিল।  এ তালিকায় নতুন সংযোগ স্বাগত, সেক্ষেত্রে সংখ্যাটা বাড়বে।

১। কপিল।
খুলনায় তাঁর জন্মস্থান ছিল, গঙ্গাসাগরে তাঁর আশ্রম। তাঁর পিতার নাম কর্দম (নাম শুনেই বোঝা যায়, আমাদের এই জলকাদাময় দেশের উপযুক্ত নাম এটি), মার নাম দেবহুতি। কোনও কোনও শাস্ত্রে বলছে যে তিনি প্রহ্লাদের ছেলে। বাংলা অসুরভাষী ছিল, সে তো আমরা জানি। প্রহ্লাদের রাজবংশ এই অঞ্চলে রাজত্ব করা অস্বাভাবিক নয়। এমনিতেই অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গ পুণ্ড্র সুহ্ম এই নামগুলি তো অসুররাজ বলির পাঁচ ছেলের নাম থেকে এসেছে, পুরাণে বলে। বলি আবার প্রহ্লাদের নাতি ছিলেন। কে জানে, কপিল তাহলে মহারাজ মহাবলির কোনও কাকু বা জেঠু হতেন কি না।

পশ্চিমবঙ্গে বহমান গঙ্গার বর্তমান প্রবাহের অন্তত কিছুটার খাত ভগীরথ খনন করেছিলেন, এইজন্য খনার বচনে ভগার খাতের কথা বলা আছে। এই গঙ্গা আনয়নের সঙ্গে কপিলের নাম যুক্ত। এটি পৌরাণিক গল্পকথা। লর্ড অভ দ্য রিংস এর ফেলোশিপ অভ দ্য রিং ছবিতে একটা ভয়েস ওভার ছিল না, হিস্ট্রি বিকামস মিথ, মিথ বিকামস লিজেন্ড। ওই ওরকম একটা ব্যাপার হয়েছে, এর মূলে কিছুটা বাস্তব সত্য আছে। যা মনে হয়, কপিলের উপদেশ (নদীবিজ্ঞানের খুঁটিনাটি) অনুযায়ী কাজ করে ভগীরথ সেই প্রাচীন যুগে গঙ্গার জলপ্রবাহের সংস্কার করেছিলেন, তাই আমাদের বাঙালিদের গঙ্গাকে আমরা আজও ভাগিরথী বলে থাকি।

সাংখ্য ভারতের প্রাচীনতম দর্শন। কপিলকে আদিবিদ্বান বলা হয়। আমার মতে আদি সাংখ্য ঋগবেদের থেকেও পুরোনো। কিন্তু আদি সাংখ্য কালগ্রাসে পতিত। বর্তমানে আমাদের হাতে যা আছে, সেই ঈশ্বরকৃষ্ণের সাংখ্যকারিকা খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দীর।

প্রকৃতি পুরুষ দ্বৈতবাদ সাংখ্যের সবথেকে বড় অবদান। বঙ্কিম থেকে সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত, সবাই একমত যে বাংলার তন্ত্র, শাক্ত বৈষ্ণব এ সমস্তই সাংখ্য প্রভাবিত। বুদ্ধের দুই গুরু অড়ার কলাম এবং উদ্রক ছিলেন সাংখ্য অনুসারী। বৌদ্ধধর্ম সাংখ্য অনুসারী, ভারতে শিব ও শক্তির উপাসনার সঙ্গে সাংখ্য দর্শন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বুদ্ধের জন্মস্থান কপিলাবস্তু কপিলের নামাঙ্কিত ছিল। আজ তিন-সাড়ে তিন হাজার বছর পরেও আদিবিদ্বান কপিলের প্রভাবের দার্শনিক ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ব্যাপ্তি তুলনাহীন।

কপিলের পরে বেশ কয়েক হাজার বছর বাঙালি মনীষার ইতিহাস নথিবদ্ধ নয়।

২। আদি চন্দ্রগোমিন্‌।
বৌদ্ধ গ্রামারিয়ানদের মধ্যে এঁর নাম অগ্রগণ্য, চান্দ্র-ব্যাকরণের উল্লেখ ছাড়া ভারতে ব্যাকরণশাস্ত্রের বিবর্তনের ইতিহাস লেখা যায় না। অল্প বয়েসে সাহিত্য, ব্যাকরণ, ন্যায়, কলাশাস্ত্রে পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। রাজশাহীতে জন্ম, সময়কাল নির্দিষ্ট না করা গেলেও ৪৫০ থেকে ৬৬০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যেই এঁর জীবন ও কাজকর্ম। বরেন্দ্রর রাজকন্যা তারার সঙ্গে এঁর বিবাহের প্রস্তাব আসে, কিন্তু ইনি তারার উপাসনা করতেন বলে রাজকন্যা তারাকে বিবাহ করতে রাজি হন নি, আরাধ্যা দেবীর নামের সঙ্গে প্রেয়সীর নাম একই হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায়। ফলে রাজা রেগে গিয়ে এঁকে নির্বাসন দেন বাংলার দক্ষিণপ্রান্তে জলাজায়গায়। যেখানে নির্বাসন দেওয়া হয়, সেই স্থানের নাম তাঁর নামে হয় চন্দ্রদ্বীপ। বহু পরে যা বরিশাল। সেখান থেকে পরে সিংহলে চলে যান। ইনি পাণিনির ব্যাকরণকে অতিক্রম করে নতুন যে ব্যাকরণশাস্ত্র লেখেন, তা এখনও তিব্বত, এবং কিছুটা পরিবর্তিত আকারে শ্রীলঙ্কায় ব্যবহৃত হয়, এমনকি জাভাতেও এককালে জনপ্রিয় ছিল চন্দ্রগোমিনের ব্যাকরণ। তাঁর ৩৫ টি সূত্র পাওয়া যায়, যা পরবর্তীকালের ব্যাকরণচর্চায় স্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। এছাড়া চন্দ্রগোমিনের শিষ্য-লেখ-ধর্ম চিঠির আকারে কাব্যভাষায় লেখা, ছাত্রদের বিভিন্ন বৌদ্ধ মতাদর্শ সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেখ্যে রচিত, এতে বিভিন্ন ছন্দে ১১৮ টি সংস্কৃত শ্লোক আছে। লোকানন্দ নামে একটি সংস্কৃত নাটক লিখেছিলেন তিনি, মূল গ্রন্থটি আর পাওয়া না গেলেও তিব্বতী অনুবাদটি পাওয়া যায়।

৩। শীলভদ্র।
মাৎস্যন্যায়ের সময়েই আরেক পণ্ডিত শীলভদ্রের উত্থান। সমতটের (অর্থাৎ সমুদ্রমেখলা চট্টগ্রাম) একটি ব্রাহ্মণ রাজবংশে তাঁর জন্ম। পুরো বৌদ্ধ জগতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই প্রধান আচার্য এক বিরল খ্যাতির অধিকারী হয়েছিলেন। শীলভদ্রের লেখা আর্যবুদ্ধভূমিব্যাখ্যা নামে একটি পুস্তক পাওয়া যায় তিব্বতী সংগ্রহ Bstan-Hgyur (তিব্বতী ভাষায় উচ্চারণ করা হয় – “ত্যঙ্গুর”) গ্রন্থে । শীলভদ্র ছিলেন ইউয়ান চোয়াং (হিউয়েন্থ সাং) এর শিক্ষক।

৪। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান।
সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম বাঙালির একজন। বিক্রমপুরের বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্ম ৯৮২ খ্রীষ্টাব্দে। আসল নাম ছিল  চন্দ্রগর্ভ, অতীশ (অতিশয় থেকে সম্ভবত, এটি উপাধি)  দীপঙ্করশ্রী (এই ছিল বুদ্ধাশ্রমে ওঁর নাম। সেযুগে শ্রী অন্ত নাম প্রচুর হত) জ্ঞান (এটি বৌদ্ধ পণ্ডিতের উপাধি। বৌদ্ধ মহিলা আচার্যরা জ্ঞানডাকিনী উপাধিতে ভূষিত হতেন)। তিব্বতে বুদ্ধের পরেই অতীশের স্থান। বিক্রমশীলা সহ অনেকগুলি বিখ্যাত বৌদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। শেষজীবন তিব্বতে কাটে। বজ্রযানী ছিলেন, শেষের দিকে সহজপন্থাকে সমর্থন করেন তাঁর প্রমাণ মিলেছে।

৫। চক্রপাণি দত্ত।
বীরভূম, মতান্তরে সপ্তগ্রামের ময়ূরেশ্বর গ্রামে জন্মেছেন। পালযুগের শ্রেষ্ঠতম চিকিৎসক, পালসম্রাট নয়পালের রাজবৈদ্য (১০৩৮ খ্রীষ্টাব্দে নয়পাল সিংহাসনে বসেন) এবং বাঙালি আয়ুর্বেদাচার্যদের মধ্যে অগ্রগণ্য। ওঁর ওপরে  বাঙালিউইকির প্রবন্ধ আছে, দেখে নিতে পারেন। http://www.bengaliwiki.org/doku.php?id=%E0%A6%9A%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A6%BF_%E0%A6%A6%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%A4

৬, ৭। নাঢ়া/ নাড়োপা এবং নাঢ়ী/নিগুডাকিনী।
এই নাঢ়া পণ্ডিতের ইতিহাস প্রায় বিস্মৃত, হরপ্রসাদ না লিখলে আধুনিক বাঙালি জানতেও পারত না। কিন্তু মধ্যযুগের সমস্ত জ্বলে যাওয়া লাইব্রেরি, সমস্ত জাহিলিয়া ধ্বংসকারী ইসলামের তরবারির পরেও এই নাঢ়া এমনই কিংবদন্তী যে অদ্বৈত আচার্যকে চৈতন্য নাঢ়া বলে সম্বোধন করেছেন। নাঢ়া অতীশের গুরুর গুরু ছিলেন। নাঢ়ার স্ত্রী নাঢ়ী (নিগুমা, নিগুডাকিনী নামেই অধিক পরিচিত) নাঢ়ার থেকেও বড় পণ্ডিত ছিলেন বলে খ্যাতি আছে, এবং এঁদের দুজনের শিষ্যরাই পরবর্তীকালে সহজিয়া নেড়া নেড়ী (মাথা ন্যাড়া করার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই), হরপ্রসাদ বলছেন। নাঢ়া এবং নিগুমা দুজনেই চর্যাকার ছিলেন বলে তিব্বতী সোর্স থেকে জানা যায়।

৮। লুইপাদ।
রাজপুত্র ছিলেন তিব্বতী সূত্র অনুযায়ী।  কৈবর্ত, আমার সন্দেহ। মৎস্যপ্রিয় বাঙালির সর্বকালীন ম্যাসকট। বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের আদিগুরু, সহজযানের আদি প্রবক্তাদের একজন (সরহকে আদিতম ধরলে লুই তাঁর ঠিক পরেই), চর্যা রচয়িতা। পালযুগে বাঙালির প্রথম নবজাগরণ হয় বলা চলে। লুইপাদ এবং নাথধর্মের আদিপ্রবক্তা মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ  একই লোক ছিলেন কি না, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব আছে।

৯। সন্ধ্যাকর নন্দী।
জন্ম আনুমানিক ১০৮৪ খ্রীষ্টাব্দ। পালসম্রাট রামপালের সভাকবি, রামচরিতের রচয়িতা। ওঁর রামচরিত গ্রন্থটি নেপালে খুঁজে পান হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

১০। কবি জয়দেব।
গীতগোবিন্দের রচয়িতা, রাধা ভাবনার জনক। লক্ষ্মণসেনের সভাকবি। লক্ষ্মণসেনের রাজসভায় পঞ্চরত্নের সবাই (জয়দেব বাদে বাকিরা হলেন ধোয়ী, উমাপতিধর, শরণ, গোবর্ধন আচার্য) সেরা বাঙালি মণীষার তালিকায় আসতে পারেন, স্থানাভাবে শুধু জয়দেবকে নিলাম।
যে রাধাকৃষ্ণময় বৈষ্ণবধর্ম আমাদের চৈতন্য আন্দোলনের মূলে, বা ইসকনের দৌলতে পৃথিবীজুড়ে যে বৈষ্ণবধর্ম দেখি, সেখানে কবি জয়দেবের অবদান সর্বাধিক। সহজিয়া বৈষ্ণবরা ওঁকে আদিরসিক বলেন। বর্তমানে উড়েদের নিরলস প্রয়াসে এবং বাঙালির নিরন্তর ল্যাদে জয়দেব বেহাত হয়েছেন আমাদের ইতিহাস থেকে। জয়দেবকে নিয়ে আমার লেখা একটি ইংরেজি প্রবন্ধ পাবেন এখানে http://www.scribd.com/doc/223387769/Journal-of-Bengali-Studies-Vol-3-No-1