রক্তপাতের সাতকাহন
—————————–
পশুদের মধ্যে সবচেয়ে সভ্য হলো মানুষ কিন্তু দিনের শেষে মানুষও পশুই মাত্র ! এর প্রমাণ ১৯৫০ এ পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী অগণিত হিন্দু মানুষজন টের পেয়েছিল। সেদিনের বাঙালি মুসলমানের এই পশুত্বের পিছনে ঠিক কোন কোন কারণগুলো কাজ করেছিল, পয়েন্ট করে বলা যায় না, তবে তার একটা প্রধান কারণ ছিল, তৎকালীন সমাজ জীবনে বাঙালি হিন্দুর থেকে সার্বিকভাবে পিছিয়ে পরা। যেমন ধরুন না কেন সেই সময়ে পাকিস্তান গভর্মেন্টের সিভিল সাপ্লাই ইন্সপেক্টর নগেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির কথা। নগেন্দ্রনাথের এই সম্মানীয় কর্মপদ হয়তো ১৯৫০ এ বাঙালি মুসলমানের চোখের বালি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কি করুণ পরিণতি হয়েছিল তার ও তার পরিবারের আসুন জেনে নিই :
নগেন্দ্রনাথ বাবু মায়ের শ্রাদ্ধ করতে সে সময় কিশোরগঞ্জ এসেছিলেন। ১২ই ফেব্রুয়ারি, ১৯৫০ কিশোরগঞ্জ থেকে ট্রেন ধরলেন তার কর্মস্থল বরিশালের বানরীপাড়া ফেরত যেতে। সঙ্গে চললেন স্ত্রী রমা চ্যাটার্জি, ছেলে অরুণ, বাচ্চা মেয়ে সাথী, দেড় বছরের পাখি আর ভাগ্নে নিখিল। ঢাকায় গোলমাল শুনে ওনারা চাঁদপুরের পথে ভৈরবের গাড়িতে উঠে বসলেন। বেলা বারোটা নাগাদ ভৈরব পৌছলেন তারপর এক ঘন্টা অপেক্ষা করে আখাউড়ার গাড়িতে চড়ে বসলেন। গাড়িতে চড়ে খবর পেলেন চাঁদপুরেও গন্ডগোল হয়েছে, তাই সত্ত্বর ট্রেন থেকে নেমে পরলেন। প্লাটফর্মে এক স্যুটেড-বুটেড মুসলমান যুবক এসে নগেন্দ্রনাথ বাবুকে জিজ্ঞাসা করল যে তারা কোথায় যাবেন ? নগেন্দ্রনাথ সব খুলে বললেন,শুনে মুসলমান যুবকটি বলল, আমিও পাকিস্তান অফিসার, আমার কামরায় উঠুন, কোন ভয় নেই আখাউড়া থেকে আমার স্টাফ দিয়ে দেবো। সরল বিশ্বাসে নগেন্দ্রনাথ বাবুরা যুবকটির কামরায় উঠলো, এবং কল্পনাও করতে পারলো না সেই স্যুটেড-বুটেড মুসলমান যুবকের পিছনে একটি আস্ত গোখরো সাপ লুকিয়ে আছে ! যেই না ট্রেন ছাড়লো, কামরায় উঠে পরলো কিছু লুঙ্গি পরা মুসলমান যুবক, মাথায় ফেট্টি বাধা। নগেন্দ্রনাথ বাবুরা ভয় পেলেন। যুবককে বললেন দেখুন আপনার ভরসাতেই কিন্তু এই কামরায় উঠেছি, শুনে যুবকটি বলল :আপনাদের আগেই বলেছি কোন ভয় নেই। মেঘনা পোলের উপরে উঠে ট্রেন আস্তে আস্তে স্লো হয়ে গেল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুসলমান যুবকটি বিশাল একটা ছুরি বার করে নগেন্দ্রনাথ বাবুর চোখে বসিয়ে দিল ! লুঙ্গি পরা মুসলমান যুবকরা ঝাঁপিয়ে পড়লো নিখিলের উপরে। কয়েকজন নগেন্দ্রকে ধরে রেখেছে আর বাকিরা দুপাশ থেকে কোপাচ্ছ বুকে, তলপেটেে, একের পর এক ছুরির কোপ ! রমা দেবী স্বামীকে বাঁচানোর জন্য ঝাঁপিয়ে পরলেন। তাকেও চাকুর কোপ খেতে হলো। ট্রেনের কামরায় লুটিয়ে পরলেন তিনি, রক্তাক্ত রমা দেবী তার চোখের সামনে দেখলেন তার স্বামীকে ট্রেন থেকে মেঘনার জলে ফেলে দেওয়া হলো। ভাগ্নে নিখিলকেও মেঘনায় ফেলা হলো। একদল নারকীয় হত্যা করতে ব্যস্ত আর অন্যদল টাকা-পয়সা গয়নাগাটি কাড়তে ব্যস্ত। কম্পার্টমেন্টের বাকি মুসলমানরা নির্লজ্জের মতো কেউ কেউ উল্লাসে জয়ধ্বনি করছে, কেউবা নিরব সমর্থনে পুরো ঘটনা দেখে চলেছে। সাত বছরের ছেলে অরুন আর দেড় বছরের মেয়ে পাখিকে মানুষের চেহারার আড়ালে, মুসলমান পশুরা মেঘনার জলে ফেলে দিল। রক্তাক্ত রমাদেবীর শাড়ি টুকু খুলে নিয়ে তাকেও নদীর জলে ফেলে দিল। হত্যালীলায় শেষ হওয়ার পর ট্রেনের ড্রাইভার আবার ট্রেন নির্দিষ্ট স্পিডে চালিয়ে নিয়ে চলে গেল। মেঘনার কালো অতল জলে ভেজা পেটিকোট ফুলে ওঠে, রমাদেবী ভেসে উঠলেন। চোখ মেলে দেখলেন অদূরে মেয়ে সাথী ভাসছে। সাঁতরে গিয়ে মেয়েকে ধরে রমাদেবী ভেসে থাকার চেষ্টা করলেন। আশপাশ দিয়ে মুসলমান মাঝিদের নৌকা বয়ে চলেছে, কেউ একবার ফিরেও তাকাচ্ছে না সাহায্যের জন্য। অবশেষে এক মুসলমান বেদে তার নৌকায় মা মেয়েকে উঠিয়ে নিল। নৌকা পাড়ে আসতে, সে আরেক নির্মম দৃশ্য, কোপানো হিন্দুরা যাদের ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল, তারা পাড়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, প্রাণ বাঁচাতে আর মুসলমানরা পাড়ে দাড়িয়ে তাদের দিকে ইটপাটকেল ছুড়ছে। যারা পাড়ে উঠতে পারছে, তাদেরকে আবার কুপিয়ে মেরে জলে ফেলে দিচ্ছে। কি নির্মম পশুত্ব একবার ভাবুন ! মুসলমান বেদে মা-মেয়েকে কোনক্রমে পাড়ে ফেলে দিয়ে নৌকা নিয়ে পালিয়ে গেল। আশ্চর্যজনকভাবে, নদীর পাড়ে বসবাসকারী এক জনৈক হিন্দু মা মেয়েকে উদ্ধার করে, কোনোক্রমে কাপড় ছিড়ে ব্যান্ডেজ করে ভৈরব বাজারে হরি পোদ্দারের গদিতে নিয়ে আসে। সেখান থেকে যতীন্দ্রনাথ রায় ও সুধাংশু কর কিশোরগঞ্জ থেকে এসে তাদের উদ্ধার করে ফেরত নিয়ে যায়।
পাঠক যাই বলুন আর তাই বলুন, বাঙালি মুসলমানের এই গৌরবময় অধ্যায়কে ছোট করবেন না কিন্তু ! তারা এগুলো করেছিল বলেই তো আজকে বলতে পারে, পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ববাংলার হিন্দুরা ভারতের এজেন্ট বা দালাল। দেশভাগের পরেও তাদের এক পা সব সময় ভারতেই ছিল আর তাই হিন্দুরা নিজেদের ভিটেমাটি ত্যাগ করে ভারতবর্ষে যায়। কথা সত্য, কি বলেন পাঠক ? লেখনি-  Rajarshi Banerjee