শুভ নববর্ষ !

লেখাটি নানান ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য আর নিজের মনের কথা ধরে লেখা তাই কোনো তথ্যসূত্র জুড়ে দেই নি।হয়তো বাদ গিয়েছে বেশ কিছু এই ধরণের অন্য জনগোষ্ঠীর একই উৎসবের কথা তাই পাঠক নিজগুনে মার্জনা করবেন এবং পারলে তথ্য দিয়ে এটি আরো সম্পুর্ন করবেন এই কামনা করি।

পৃথিবীর ভৌগোলিক পরিধি হিসেবে সবচেয়ে বড় নববর্ষের উৎসব ইংরেজি নববর্ষ যা গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ধর্ম জাত ইত্যাদির বিচার বিহীন উৎসব ভাবতে পারেন।এতে সামিল হয় পৃথিবীর শত শত কোটি লোক এমনকি আমরা মানে এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষেরাও এতে সামিল হয়ে থাকি।

এরপরের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব চৈনিক মানুষদের,আনুমানিক ২০০ কোটির বেশি এই জাতির মানুষ মোটামুটি বসন্ত কালে নববর্ষের উৎসব করে থাকে।

তৃতীয় স্থানে প্রায় একশো কোটি মানুষের আনুমানিক ৩০ টি জনজাতির নবর্ষের উৎসব।আমরা এই অংশের মধ্যে আছি।মূলতঃ ভিয়েতনাম এর অংশ ধরে আমাদের ভারত বাংলাদেশ মায়ানমার হয়ে একদম পশ্চিমে ইরানের আর বালুচিস্থান এবং হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল যেমন নেপালে একই ভাবে নববর্ষের উৎসব হয়।খেয়াল করবেন এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে মানে ১১ থেকে ১৫র মধ্যে এই উৎসব কম বেশি এই দেশগুলোতে পালন হয়।

মনে রাখবেন, মোঘল বা অন্য সময়ে এর একটা শাসনতান্ত্রিক কাঠামোতে এলেও এর সূত্রপাত প্রায় সভ্যতার শুরু থেকেই।মজার কথা হলো এর স্থান আর মানুষগুলো আলাদা হলেও বিশেষ কোনো হেরফের নেই।আবার নামের পরিবর্তন থাকলেও সব জায়গায় এই উৎসব প্রত্যেকটি জনজাতির নিজের সত্বা হয়ে উঠেছে।
আলোচ্য এই তৃতীয় বৃহত্তম মানুষের আনন্দ উৎসবের নানান জায়গায় কি কি তার একটা রূপরেখা তালিকা ধরে দেওয়ার চেষ্টা করছি। ভৌগোলিক কোনো মানচিত্র ধরে দিচ্ছি না তাই এদিক ওদিক হতে পারে।

প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো পাকিস্থানের এবং আফগানিস্থানের অন্যতম এই নববর্ষের পালন আজ অস্তাচলে মৌলবাদের(ইসলামী)কবলে তবে আশা হারাবেন না,আবার উত্তরণ হবে মানুষের!

১.একদম পশ্চিম মানে পারস্য বা ইরান এবং বালুচিস্থান পালন করে নওরোজ ,এদের আনুমানিক লোক সংখ্যা ধরুন কোটি দশেক।ইরানের প্রায় সাড়ে আট আর বালুচ জনগোষ্ঠীর কোটি দেড়েক এবং প্রবাসী মানুষ ধরে এই আনুমানিক সংখ্যা। 
২.হিমাচলের অধিবাসী পালন করে বিষু বা বাসওয়া ,এদের আনুমানিক লোক সংখ্যা সত্তর লাখের মতো।
৩. হরিয়ানা আর পাঞ্জাবে (ভারতের অংশ ,পাকিস্তানের দিকের বসন্ত উৎসব প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে)হয় বৈশাখী উৎসব, এদের আনুমানিক লোক সংখ্যা প্রায় ছয় কোটি মানুষের।
৪.মহারাষ্ট্রে এবং গোয়াতে এই নববর্ষর নাম গুডি প্যাডওয়া,পালন করেন প্রায় সাড়ে এগারো কোটি মানুষ
৪. এরপর অন্ধ্র তেলেঙ্গানা এবং কর্নাটকে হয় উগাদী এবং বিসু ,এই পালনকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি।
৫. উড়িষ্যার হয় মহাবিষুব সংক্রান্তি, এই অঞ্চলের লোক সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটির মতো
৬.মৈথিলী সংস্কৃতির বিহার বা উত্তরপ্রদেশের এক বড় জনজাতি যাদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে চার কোটির মতোই ,পালন করে জোড়ে শীতল।
৭. নেপালের মানুষ পালন করে নয়া বর্ষ/বিসকেত যাত্রা , মোটামুটি সাড়ে তিন কোটি মানুষের উৎসব এটি।
৮. আসাম অঞ্চলে পালন করে বিহু ,এই পালনকারীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন কোটি।
৯. এরপরে আসে মায়ানমার বা আগের বার্মা , এখানে এপ্রিলের মাঝামাঝি হয় থিয়ানগাং বা নববর্ষ। মোটামুটি সাড়ে তিনকোটি নাগরিক এই উৎসবে সামিল হয়।
১০.এরপরেই সর্ব বৃহৎ একক জনজাতি হিসাবে বাঙালি গোষ্ঠীর নাম আসে।আমাদের পয়লা বৈশাখ পালন করে মোটামুটি তিরিশ কোটি মানুষ।
১১.এছাড়া এই উত্তর পূর্বে মনিপুরী জনগোষ্ঠীর চেইরাওবা তে সামিল হয় ওই প্রদেশের লাখ তিরিশেক লোক।
১২.ত্রিপুরার আঞ্চলিক উৎসব বৈসু/বৈসুক এ আনন্দ করেন লাখ পনেরো মানুষ
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের জনজাতি যেমন চাকমারা করেন বিজু/বিঝু (বিহুর একটি রূপ?) উৎসব, এতে সামিল হয় লাখ দশেক মানুষ ,একই ভাবে ম্রো রা যাদের সংখ্যা লাখ খানেকের মতো তারাও এই একই উৎসব পালন করেন।এছাড়া মারমা/রাখাইন রা করেন সাংগ্রাই বা সাংগ্রাইং।এদের জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখের মতো।
১৩ এছাড়া সুদূর শেষ প্রান্তের কেরলে হয় বিসু/পুথুবর্ষম যাতে আনন্দ করেন প্রায় চার কোটির মতো মানুষ। একই ভাবে তামিল সম্প্রদায়ের মানুষ করেন পুথান্দু।এতে প্রায় সামিল হয় সাত কোটির মতো মানুষ।এক্ষেত্রে শ্রীলংকার মানুষরা বিশেষত ওই দিকের তামিল জনজাতির কথা ও বলা যায়।সিংহলী জনগোষ্টি করে একই সময়ে আলুথ আওরুদ্ধা,আলাদা করে এদের সংখ্যা প্রায় দুই কোটির মতো।
১৪. থাইল্যান্ডে পাবেন সংকরন /সংকার্ন (সংক্রান্তি?) যাতে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষ সামিল হয় এই উৎসবে।
১৫.কম্বোডিয়ার খেমোর জনজাতি করে চাউল চ্যাম থমে(চাল মানে অন্ন খেয়াল করে ) যাতে প্রায় দেড় কোটির মতো মানুষ সামিল হয়।এছাড়া লাও জনজাতির প্রায় সত্তর লক্ষ মানুষ পালন করে পি মাই,মূল চীনের দাই সম্প্রদায় করে একই রকম মানে সংকার্ণ উৎসব যাতে সামিল হয় আশি লক্ষ মানুষ।

নববর্ষ, বৈশাখী, হালখাতা, সংক্রান্তি যে নামেই ডাকি বৈশাখের প্রথম দিনটি ভারতের অন্যতম এবং বাংলাদেশ সহ আরও কয়েকটি দেশের প্রধান জাতীয় উৎসব।এর ব্যপ্তি বিশাল এবং তাৎপর্য গভীর।উৎসবটির বড় বৈশিষ্ট্য এটি কোনো ধর্মের সূত্র থেকে উঠে আসা না,সবার উৎসব এবং সম্পূর্ণ নিজ ভূমিজাত।এই উৎসব আয়োজনে ও পালনে কোন ভেদাভেদ নেই, বৈষম্য নেই।এই উৎসব আনন্দের, বহু বর্ণের, বহু ছন্দের, বহু সুরের, বহু গানের, বহু কথার।কী পোশাকের বিচিত্রতায়, কী খাবারের আয়োজনে এই উৎসব অনন্য।
 
আগেও দেখেছি  অন্ধকারের শক্তি গীত-বাদ্যকে ভয় পায় তাই এই ধরণের নানান অনুষ্ঠানে গুলি বা বোমা হামলা চালায়।তারা চারু ও কারু শিল্পকে ভয় পায় তাই সেগুলো বিনষ্ট করার চেষ্টা করে।তারা নৃত্য-সমাবেশ ভয় পায় তাই এই হুমকি দেয়।তারা নারীর অগ্রসরতা কে ভয় পায় তাই নারীকে লাঞ্ছিত করে। তারা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ভয় পায় তাই এগুলোকে ধর্মবিরোধী বলে।অন্ধকারের শক্তি যে যে বিষয়ের মুখোমুখি হতে সাহস করে না সেই জায়গায় আরো প্রয়াস বাড়িয়ে দিন সম্মিলিতভাবে, প্রকাশ্যে। যারা এই উৎসবের গায়ে বিশেষ ধর্মের তকমা লাগিয়ে একে বাকিদের কাছে অস্পৃশ্য করতে চায় তাদেরকে দেখিয়ে দিন  এটা লোক উৎসব, এটা সব মানুষের উৎসব, এটা ধর্মের বাঁধনে বাঁধা গোষ্ঠীর উৎসব নয়।তাহলে তারা পিছু হঠতে বাধ্য হবে।নববর্ষ আমাদের গর্বিত পরিচয়, প্রাণের উৎসব।যার যতটুকু সাধ্য উৎসব পালন করুন।

মাভৈ,এই অন্ধকারের অবসান হবেই। শুভ নববর্ষ!