আশির দশকের প্রথম ভাগের কথা। বিদ্যুৎবিহীন প্রত‍্যন্ত গ্রামে আমাদের বাড়ির এক-ব্যান্ডের রেডিওটা, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছে বিস্ময়। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রের প্রচারিত নাটক, সঙ্গীতানুষ্ঠান ও সংবাদ শুনতে পাড়ার রুচিশীল যুবক ও প্রবীণ লোকদের নিয়মিত সমাবেশ।

 একঝাঁক বিশ্বমানের কন্ঠশিল্পীর উপস্থিতিতে কলকাতা তখন ধন্য। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, সুচিত্রা মিত্র,সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়,শ‍্যামল মিত্র,আরতি মুখোপাধ্যায়,চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়,সাগর সেন,আলপনা বন্দোপাধ্যায়,সতীনাথ মুখোপাধ্যায়,জগন্ময় মিত্র কতজন অমর শিল্পীর নাম বলব! এক অঞ্চলে একই সময়ে এতজন বিস্ময়কর কণ্ঠশিল্পীর উপস্থিতি,সত্যি অকল্পনীয়!

কে যেন একদিন রেডিও টিউন করে,খুলনা বেতার কেন্দ্র ধরল; শুনলাম একটা ভিন্ন ধরনের গান – “ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে”। তারুণ্যে উদ্দীপ্ত উদাত্ত কণ্ঠ।খুব ভালো লেগে গেল। আমার তখন কিশোর বয়স। রেডিও ধরা নিষেধ। তবুও সুযোগ পেলে লুকিয়ে লুকিয়ে লো সাউন্ডে ওই শিল্পীর গান শুনি – ‘চুল পাকিলেই লোকে হয় না বুড়ো’, ‘আমি ঢাকা শহর ছেড়ে চলে যাব অনেক দূরে’, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে’, ‘দুনিয়াটা মস্ত বড় খাও দাও ফুর্তি করো’ – এরকম মুষ্টিমেয় কয়েকটি গান। শিল্পীর নামটিও খুব সুন্দর, ‘এন্ড্রু কিশোর’। আমার থেকে বয়সে একটু বড় শহুরে এক সঙ্গীত বোদ্ধার কাছে শুনলাম, এন্ড্রু কিশোর হচ্ছেন বাংলাদেশের ‘কিশোর কুমার’। কিছুদিন পরে শুনলাম,এন্ড্রু কিশোর খ্রিষ্ট ধর্মালম্বী – তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে সঙ্গীত পরিবেশন করা বন্ধ করে দিয়েছেন; কারণ তাকে বলা হয়েছে যে, তার গলার ঝুলানো ধর্মীয় প্রতীক ‘ক্রুশ’ চিহ্নটা ঢেকে রেখে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে যেতে। এতে এন্ড্রু কিশোর অপমান বোধ করেন। তখন বাংলাদেশে বহু দলীয় গণতন্ত্রের নামে সামরিক শাসন চলছে; সেই সঙ্গে চলছে বাঙালি থেকে বাংলাদেশীকরনের প্রতিযোগিতা। অনেকে বলত,সেটা ছিল মূলত পাকিস্তানিকরন।
ওই সময় এন্ড্রু কিশোরের গানের পাশাপাশি সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, শাম্মী আক্তার প্রমূখ বাংলাদেশী কয়েকজন কন্ঠশিল্পীর কিছু কিছু গান ভালো লাগতো। সেই কিশোর বয়স পর্যন্তই – এরপর এন্ড্রু কিশোর সহ বাংলাদেশি কন্ঠশিল্পীদের উপর আকর্ষণ হারিয়ে ফেলি। বিগত ৩৪/৩৫ বছরে বাংলাদেশী শিল্পীদের গান শুনেছি বলে মনে পড়ে না।
ইন্টারনেটের কল‍্যানে আজ পশ্চিম বঙ্গের একটি মফস্বল শহরে বসে শুনতে পেলাম – বাংলাদেশের সেই বরেণ্য কন্ঠশিল্পী এন্ড্রু কিশোর আজ দয়ালের ডাকে সত্যি সত্যি সাড়া দিয়েছেন। আজ হোক, কাল হোক, প্রতিটি মানুষকেই দয়ালের ডাকে সাড়া দিতে হবে; তবুও এন্ড্রু কিশোরের এই মহাপ্রস্থান, বাংলা সঙ্গীতের অপূরণীয় ক্ষতি। কিশোর বয়সে ভালো লাগা এই গুণী কন্ঠশিল্পীর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।
কৃত্তিবাস ওঝা
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত
০৬-০৭-২০২০ খ্রিঃ