প্লাস্টিক
সার্জারি হলো চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন একটি শাখা যার প্রধান কাজ শরীরের
বিভিন্ন অংশ পুনরুদ্ধার করা। নান্দনিক ও প্রসাধনিক প্লাস্টিক সার্জারি
সবচেয়ে বেশি সুপরিচিত হলেও প্লাস্টিক সার্জারি নিজেই অনেক প্রকারে
অন্তর্ভুক্ত।

প্লাস্টিক সার্জারি শব্দটি এসেছে plastic (reshaping or sculpting) যার উৎপত্তি গ্রীক শব্দ plastikē (the art of modelling) থেকে। ১৫৯৮ সালে প্রথম এই শব্দের প্রচলন হয় ইংরেজিতে।
প্লাস্টিক
সার্জারির ইতিহাস খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে আসতে হয় ভারতবর্ষে। খৃষ্টপূর্ব
ছয় শতকের দিকে সুশ্রুত নামে একজন ভারতীয় শল্যচিকিৎসক ছিলেন যিনি প্রথম
প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে আলোকপাত করেন। সুশ্রুতর জন্মসাল ঠিকভাবে জানা
যায়নি। তবে ধারণা করা হয় তার জন্ম হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের কাছাকাছি
সময়ে। তিনি যেখানে বাস করতেন এবং শল্যচিকিৎসার বিভিন্ন কলা কৌশল চর্চা
করতেন সে জায়গার নাম হলো কাশী, বর্তমান বেনারস। তিনি কেবল শল্যচিকিৎসকই
ছিলেন না, ছিলেন একজন শিক্ষকও। তার জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও কর্মকৌশলের বিশদ
বিবরণ রয়েছে শল্যচিকিৎসার প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ সুশ্রুত সংহিতায়। এই
গ্রন্থটিতে শল্যচিকিৎসা সম্পর্কে সুশ্রুতর ধারণা এবং বিভিন্ন কৌশল খুব
সুন্দর করে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে
যে শুধু প্লাস্টিক সার্জারির বিভিন্ন কৌশল সম্পর্কে বলা হয়েছে সেটা নয়,
সার্জারি কীভাবে শিখতে হয় তার বিভিন্ন ধরন দেওয়া হয়েছে।

সুশ্রুত
বিশ্বাস করতেন, একজন ভালো চিকিৎসক হতে হলে অবশ্যই একজন ছাত্রের মেডিসিন আর
সার্জারি উভয় বিষয়ে জ্ঞান থাকতে হবে। তা না হলে সে হয়ে যাবে এমন একটি
পাখির মতো যার কেবল একটি ডানা। তার ছাত্রদেরকে সৌশ্রুত বলা হতো। তিনি
ছাত্রদের বিভিন্ন উপায়ে তার শল্যবিদ্যার উপায় শেখাতেন, যেমনঃ বিভিন্ন সবজি
ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে।

তিনি
আরো বলেছিলেন- কেউ যদি দেহের গঠনতন্ত্র সম্পর্কে জানতে চায় তাহলে তাকে আগে
একটি মৃতদেহ সংগ্রহ করতে হবে এবং দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যবেক্ষণ
করতে হবে।

সুশ্রুত সংহিতা
অনেক বছর ধরে সংস্কৃত ভাষায় সংরক্ষিত ছিল। একটা সময় পরে মূল বইটি হারিয়ে
যায়। এখন আমরা সুশ্রুত সংহিতা সম্পর্কে যতখানি জানি সেটা ৩৫০ খ্রিস্টাব্দের
দিকে বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুবন্ধু কর্তৃক প্রণীত একটি সংস্করণ থেকে। ৭৫০
খ্রিস্টাব্দের কাছকাছি সময়ে বইটিকে আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়
কিতাব-শশুন-এ-হিন্দ এবং কিতাব-এ-সুশ্রুদ নামে। প্রথম ইউরোপিয়ান হিসেবে
বইটির ল্যাটিন অনুবাদ করেন হেসলার এবং জার্মান অনুবাদ করেন মুলার। ১৯০৭ এর
দিকে প্রথমবারের মতো কবিরাজ কুঞ্জ লাল ভীষগরত্ন তিন খণ্ডে বইটির ইংরেজি
অনুবাদ করেন।

বইটি ১৮৪
অধ্যায়ে বিভক্ত আর এখানে মানসিক অসুস্থতা, বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগের কথা
বলা হয়েছে। এছাড়াও বইটিতে শল্যচিকিৎসা সম্পর্কিত বিভিন্ন ট্রেইনিং আর
অভ্যাসের কথা বলা হয়েছে। বইটিতে প্রায় ১২০ ধরনের যন্ত্রের কথা উল্লেখ্য আছে
যা শল্যচিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 চিত্র – শল্যচিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র যার কথা সুশ্রুত বলেছেন।

প্লাস্টিক
সার্জারির অনেকগুলো ধারা খুব সুন্দর করে এই বইয়ে তিনি তুলে ধরেছেন। তার
সাথে কী কী সতর্কতা নিতে হবে আমাদের সেগুলোও বর্ণনা করেছেন। তবে সুশ্রুতর
সবচেয়ে বড় অবদান হলো রাইনোপ্লাস্টি। রাইনোপ্লাস্টি হলো ক্ষত বা দুর্ঘটনার
কারণে ক্ষতিগ্রস্ত নাককে তার আগের কাঠামোতে ফিরিয়ে আনা এবং নাকের কাজ আগের
মতো রাখা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনেক ইতিহাসবিদই মনে করেন মধ্যযুগের ইতালিতে
বিকাশ লাভ করা আধুনিক রাইনোপ্লাস্টি মূলত প্রাচীন ভারতীয় পদ্ধতিগুলোরই
পরিবর্তিত রূপ।

operation 2

চিত্র – রাইনপ্লাস্ট প্রক্রিয়া।

বিভিন্না
বিজ্ঞানীদের মধ্যে কৌতূহল জাগে যে, অ্যানেসথেশিয়ার প্রক্রিয়া ছাড়াও কীভাবে
বড় অস্ত্রোপচার করা সম্ভব। তখন সুশ্রুত বলেন- অস্ত্রোপচারের সময় অ্যালকোহল
ব্যবহার করতে পারি যা আমাদের ব্যথার অনুভুতি বুঝতে দেয় না। তিনি আরো
বলেছেন, যাদের অ্যালকোহল খাওয়ানো হবে, তারা অজ্ঞান হবে না। কিন্তু যাদের
অ্যালকোহলের মাদকীয় প্রভাব কাজ করেছে তাদের অস্ত্রোপচারের সময় কোনো ব্যথা
অনুভূতি হবে না ।

সুশ্রুত আরও
বলেন, সার্জারি হলো মেডিসেনের সর্বপ্রধান শাখা। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন
একটি শাখা যেখানে সার্জারির বিভিন্না যন্ত্রের বিভিন্নভাবে প্রয়োগ করে
রোগীর শরীরে দ্রুত এবং স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব। মানুষ যেন দীর্ঘদিন
সুন্দরভাবে এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে পারে এই জন্য শল্যচিকিৎসার অন্যতম
অবদান রয়েছে।

শল্যচিকিৎসার বিভিন্ন ভাগে সুশ্রুতর যে অবদান তার মাঝে উল্লেখযোগ্য হলোঃ

  • ১৫ ধরনের অটোপ্লাস্টি করা (কানের এক ধরনের প্লাস্টিক সার্জারি)।
  • সুঁই দিয়ে বাচ্চাদের কানের ছিদ্র করা।
  • অপারেশনের সময় অ্যালকোহল ব্যবহার করা।
  • ২০ ধরনের তীক্ষ্ণ যন্ত্র আর ১০১ ধরনের ভোঁতা যন্ত্র এবং তাদের ব্যবহার করার উপায় সম্পর্কে বলা হয়েছে।
  • ক্ষতস্থানে রক্ত জমাট বাঁধতে লিচুর ব্যবহার।
  • ৬ ধরনের ডিসলোকেশন ও ১২ ধরনের ফ্র্যাকচারের ব্যাখ্যা।

বিজ্ঞানের
অন্যান্য অনেক শাখার মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানেও প্রাচীন ভারতের যথেষ্ঠ
গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে আয়ুর্বেদ বা যোগব্যায়াম সম্পর্কে আমরা অনেক
কিছু জানতে পারলেও শল্যচিকিৎসায় তাদের অবদান সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান বেশ
সীমিত। সুশ্রুত এবং তার মতো বিজ্ঞানীদের অবদান নিয়ে গবেষণা করার অনেক সুযোগ
রয়েছে।