স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং বিপ্লবী
শহীদ যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়- বাঘা যতীন (জন্মঃ-৭ ডিসেম্বর, ১৮৭৯ – মৃত্যুঃ- ১০ সেপ্টেম্বর, ১৯১৫)

১৯০৩ সালে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণের বাড়িতে শ্রী অরবিন্দের সাথে পরিচিত হয়ে যতীন্দ্রনাথ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। সরকারী নথিপত্রে যতীন পরিচিত হন শ্রী অরবিন্দের ডানহাত হিসাবে। অরবিন্দ ঘোষের সংস্পর্শে এসে যতীন আখড়ায় গাছে চড়া, সাঁতার কাটা ও বন্দুক ছোঁড়ার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। যুগান্তর দলে কাজ করার সময় নরেনের (এম.এন রায়) সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং অচিরেই একে-অপরের আস্থাভাজন হন। ১৯০০ সাল থেকে মূল ‘অনুশীলন সমিতি’র প্রতিষ্ঠাতাদের সংগে হাত মিলিয়ে জেলায় জেলায় যতীন পত্তন করেন গুপ্তসমিতির শাখা। ১৯০৫ সালে যুবরাজের ভারত সফরকালে কলকাতায় বিরাট শোভাযাত্রা উপলক্ষে যতীন স্থির করলেন এদেশে ইংরেজদের আচরণ প্রত্যক্ষ করাবেন যুবরাজকে। যুবরাজ দেশে ফিরে গিয়ে ১৯০৬ সালে ১০ মে দীর্ঘ আলোচনা করেন ব্রিটিশসচিব মর্লি’র সংগে এর প্রতিকার চেয়ে। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে স্বপরিবারে যতীন দেওঘরে বাস করতে থাকেন, বারীণ ঘোষের সংগে একটি বোমা কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এই কারখানার অভিজ্ঞতা নিয়ে অবিলম্বে কলকাতার মানিকতলায় বারীণ আরো বড় করে কারখানা খোলেন।
১৯০৭ সালে বিশেষ কর্ম-দায়িত্ব নিয়ে হুইলারের সচিবদের সংগে যতীন সপরিবারে দার্জিলিংয়ে স্থানান্তরিত হলেন। সমস্ত উত্তর বাংলার মতো এখানেও যতীন “অনুশীলন”-এর সক্রিয় শাখা স্থাপন করেছিলেন। ১৯০৮ সালের এপ্রিল মাসে ক্যাপ্টেন মার্ফি ও লেফটেন্যান্ট সমারভিল প্রমুখ চারজন সামরিক অফিসারের সঙ্গে যতীনের মারপিট হয় শিলিগুড়ি স্টেশনে। চারজনের চোয়াল ভেংগে ধরাশায়ী করে দেবার অপরাধে যতীনের নামে মামলা রুজ্জু হলে সারাদেশে বিপুল হর্ষ জাগে-কাগজে কাগজে এই নিয়ে লেখালেখির বহর দেখে সরকার চাপ দিয়ে মামলা প্রত্যাহার করে। ঠাট বজায় রাখতে ম্যাজিস্ট্রেট যতীনকে শাসিয়ে দেন, “এমনটি আর যেন না ঘটে!” দর্পভরে যতীন জবাব দেন: “নিজের সম্মান বা দেশবাসীর সম্মান বাঁচাতে যদি প্রয়োজন হয়, এমনটি যে আবার করব না, এ শপথ আমি করতে অপারগ।”
১৯০৬ সাল থেকে স্যার ডেনিয়েল হ্যামিলটনের সহযোগিতায় যতীন একাধিক মেধাবী ছাত্রকে বৃত্তি দিয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। শুরু হয় তারকনাথ দাসকে দিয়ে; পরপর তাঁর পিছু পিছু রওনা হন গুরনদিৎ কুমার, শ্রীশ সেন, অধর লস্কর, সত্যেন সেন, জিতেন লাহিড়ি, শৈলেন ঘোষ। …… এদের কাছে নির্দেশ ছিল, উচ্চশিক্ষার সংগে সংগে আধুনিক লড়াইয়ের কায়দা ও বিস্ফোরক প্রস্তুতের তালিম নিয়ে আসতে এবং বিদেশের সর্বত্র ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে। ১৯০৮ সালে বারীণ ঘোষের প্রথম প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে সবাই যখন হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখন গোপনে শ্রীঅরবিন্দের ঘনিষ্ঠ দুই প্রধান বিপ্লবী কানে কানে রটিয়ে দিলেন: “ওরে, হতাশ হস্‌নে! যতীন মুখার্জি হাল ধরে আছে!” এই দু’জনের নাম অন্নদা কবিরাজ ও মুন্সেফ অবিনাশ চক্রবর্তী। বাস্তবিক সভা-সমিতি যখন বেআইনি, সারাদেশ যখন ধড়-পাকড়ের আতংকে বিহ্বল, যতীন তখন স্যার ডেনিয়েলের কাছ থেকে জমি লীজ নিয়ে গোসাবা অঞ্চলে পত্তন করলেন Young Bengal Zamindari Cooperative : পলাতক কর্মীদের গ্রাসাচ্ছাদনের সংগে তিনি সোদপুরের শশীভূষণ রায় চৌধুরী’র দৃষ্টান্ত অনুযায়ী শুরু করলেন স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য নৈশ বিদ্যালয়, ছোট ছোট কুটিরশিল্পের প্রতিষ্ঠান, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা। গ্রামাঞ্চলের সংগে বিপ্লবীদের এই প্রথম প্রত্যক্ষ পরিচয় অত্যন্ত সুফল আসলো।

জেলার সুবিদিত অস্ত্র-ব্যবসায়ী নূর খাঁ’র কাছে আগ্নেয়াস্ত্র কিনে যতীন নিয়মিত বাদা অঞ্চলে গিয়ে নির্বাচিত কর্মীদের তালিম দিতেন। আলিপুর বোমা মামলার অভিযুক্ত বিপ্লবীদের ব্যয়ভার বহন, অস্ত্র সংগ্রহ ইত্যাদির জন্য অর্থের প্রয়োজন মেটানো ছাড়াও যতীন এইবার গণ-চেতনায় প্রত্যয় জাগানোর জন্য দুর্ধর্ষ কিছু স্বদেশী ডাকাতির আয়োজন করলেন। ১৯০৮ সালের ২ জুন থেকে ধাপে ধাপে এই অভিযান হয়ে উঠল ইংরেজ সরকারের বিভীষিকা। এই পর্যায়ের তুংগস্থান এসে পড়ল ১৯০৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউটর আশু বিশ্বাসের হত্যা এবং ১৯১০ সালের ২৪ জানুয়ারি ডেপুটি কমিশনার শামসুল আলমের হত্যাঃ এঁরা দু’জনে সোনায় সোহাগার মতো যথেচ্ছভাবে আলিপুর বোমার আসামীদের ঠেলে দিচ্ছিলেন মর্মান্তিক পরিণামের দিকে; মূল অভিসন্ধি ছিল শ্রীঅরবিন্দকে চরম দণ্ড দেওয়া। ২৫ জানুয়ারি প্রকাশ্য সভায় বড়লাট মিন্টো ঘোষণা করলেন: “অভিনব এক মানসিকতা আজ দেখা দিয়েছে …….. যা চায় ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করতে।”
২৭ জানুয়ারি, ১৯১০ তারিখে যতীনকে গ্রেপ্তার করা হল সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগে। শুরু হল হাওড়া ষড়যন্ত্র মামলা। দশম জাঠ বাহিনীকেই বিপ্লবীদের সংগে সহযোগিতার অপরাধে ভেঙ্গে দেওয়ার আগে প্রধান অফিসারদের ফাঁসিতে ঝোলানো হল। এক বছর ধরে এই মামলা চলতে দেখে নতুন বড়লাট হার্ডিঞ্জ অসহিষ্ণু হয়ে দাবি করলেন “একটিমাত্র অপরাধী”কে দণ্ড দিয়ে বাকি আসামীদেরকে রেহাই দেবার। “একটিমাত্র অপরাধী” হিসেবে যতীন কারাগারে বসেই খবর পেলেন যে অদূর ভবিষ্যতে জার্মানির সঙ্গে ইংল্যান্ডের লড়াই বাঁধবে।

কলকাতার পুরো দায়িত্ব অতুলকৃষ্ণ ঘোষের হাতে অর্পণ করে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যতীন উপস্থিত হলেন তাঁর পৈত্রিক ভিটা ঝিনাইদহে। সেখানে ঠিকাদারের ব্যবসা শুরু করলেন তিনি যশোর-ঝিনাইদহ রেলপথ নির্মাণ উপলক্ষে। ব্যবসার সুবাদে তিনি সাইকেলে অথবা ঘোড়ার পিঠে চড়ে জেলায় জেলায় অবিশ্রাম ঘুরে গুপ্তসমিতির শাখাগুলিকে সন্নিহিত করে তুললেন।
১৯১৩ সালে বাংলা এবং বাংলার বাইরের বিভিন্ন শাখার কর্মী ও নেতারা মিলিত হলেন বর্ধমানে বন্যাত্রাণ উপলক্ষে। উত্তর ভারত থেকে রাসবিহারী বসু এসে যতীনের সংগে আলোচনা করে নূতন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হলেনঃ অমরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে যতীনের সংগে একাধিক বৈঠকে রাসবিহারী সিদ্ধান্ত নিলেন ফোর্ট উইলিয়ামের সৈন্য-বহরের পরিচালকদের সহযোগিতায় কলকাতা থেকে পেশোয়ার অবধি বিদ্রোহের আগুন জ্বলবে ১৮৫৭ সালের দৃষ্টান্তকে সামনে রেখে।

ভারত-জার্মান ষড়যন্ত্র
১৯১৪ সালের নভেম্বর মাসে সানফ্রান্সিসকো থেকে প্রত্যাবর্তন করলেন ‘গদর’-নেতা সত্যেন সেন; সংগে এলেন বিষ্ণুগণেশ পিংলে, কর্তারসিং সরাংগা ও বিরাট একদল ‘গদর’-কর্মী। সত্যেন জানালেন যে, বার্লিনে বীরেন চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত বিপ্লবীরা খোদ কাইজারের সংগে চুক্তি সই করেছেন ভারতে অস্ত্রশস্ত্র ও অর্থ পৌঁছে দেবে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে পাঠানো কয়েকটি জাহাজ; এর দায়িত্ব নিয়েছেন ওয়াশিংটনে জার্মান রাষ্ট্রদূত ব্যার্নস্টর্ফ ও তাঁর মিলিটারী আতাশে ফন্‌পাপেন। কাইজারের সনদ নিয়ে একটি বিপ্লবী মিশন রওনা হচ্ছে কাবুল অভিমুখে; পথে তারা জার্মানীর হাতে বন্দী ব্রিটিশ সৈন্যবহরের ভারতীয় জওয়ানদের নিয়ে গড়ে তোলা বাহিনী নিয়ে কাবুল থেকে কুচকাওয়াজ করে হাজির হবে দিল্লীতে, যোগ দেবে সশস্ত্র অভ্যুত্থানে। বার্মা সীমান্তেও সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত থাকছে কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে বলে। দূরপ্রাচ্যে বিভিন্ন জার্মান দূতাবাস ও কনস্যুলেট সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত।

যতীনের চিঠি নিয়ে পিংলে ও কর্তারসিং গেলেন রাসবিহারী’র সংগে দেখা করতে। টেগার্টের রিপোর্টে দেখা যায়, এই সময়ে সত্যেন সেনকে নিয়ে যতীন কলকাতার বিভিন্ন রেজিমেন্টের অফিসারদের সংগে আলোচনায় ব্যস্ত। ভারতের এই যজ্ঞ-অনলে ইন্ধন দেবার জন্য সাজসাজ পড়ে গেল দূরপ্রাচ্যে আমেরিকায়, ইউরোপে, মধ্যপ্রাচ্যে। ভূপতি মজুমদার স্পষ্ট লিখে গিয়েছেন যে, আন্তর্জাতিক এই সহযোগিতার উদ্ভাবন করেন স্বয়ং যতীন মুখার্জি। ইতিহাসে একে অভিহিত করা হয় “ভারত-জার্মান ষড়যন্ত্র” নামে।

সমাগত ‘গদর’ কর্মীরা কাজে নামতে চান, জার্মান অস্ত্র আসার জন্য তাদেঁর তর সইছে না। যতীনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাসবিহারী দিন ধার্য্য করলেন ২১ ফেব্রুয়ারী অভ্যুত্থানের জন্য। মিঞাসির (মহীসুর), লাহোর, ফিরোজপুর, রাওয়ালপিণ্ডি, জব্বলপুর, বেনারস-সর্বত্র তেরংগা ঝাণ্ডা উড়িয়ে দেওয়া হবেঃ নীল হবে মুসলমান কর্মীদের প্রতীক; হলদে শিখ; লাল হিন্দু। কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে সমস্ত রেলপথ উড়িয়ে দেওয়া হবে, যাতে করে সরকার পক্ষ প্রত্যুত্তরের জন্য সৈন্যবাহিনী না আনাতে পারে। ইতিমধ্যে ২৬ আগস্ট ১৯১৪ সালে কলকাতার রডা কোম্পানী থেকে বিপ্লবীরা যথেষ্ট শক্তিশালী মাউজার পিস্তল সংগ্রহ করেছেন, প্রয়োজনমতো যা দূরপাল্লার রাইফেলের মতো ব্যবহার করা চলে।

রাসবিহারী’র অনুরোধে অর্থ সংগ্রহ করতে যতীন নতুন অভিযানের শরণ নিলেন- মোটরচালিত ট্যাক্সির সাহায্যে অভিনব এই ডাকাতির পদ্ধতি অবিলম্বে ফ্রান্সে দেখা যাবে, প্রখ্যাত নৈরাজ্যবাদী সর্দার “বোনো”র পরিচালনায়। পরিশীলিত, শৃংখলাবদ্ধ দুঃসাহসিক এই কীর্তির সামনে মুগ্ধ আতঙ্কে ইংরেজ সরকার হতবুদ্ধি হয়ে রইল। আর পুলকে মুগ্ধ দেশবাসী প্রত্যয় ফিরে পেল বিপ্লবীদের কর্মক্ষমতায়। ১২/২/১৯১৫, ২২/২/১৯১৫ – দুই দু’টো চোখ ধাঁধানো ডাকাতির সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল সারাদেশে। ২৪/২/১৯১৫ যতীন এক গুপ্ত বৈঠকে কর্মসূচী নির্ধারণ করছেন, এমন সময়ে এক সরকারী গোয়েন্দা সেখানে উপস্থিত দেখে নেতার ইংগিতক্রমে চিত্তপ্রিয় তাকে গুলি করেন।

থরহরিকম্পা পুলিশ রিপোর্টে অসহায় টেলিগ্রাম দেখা যায় “চড়া ইনাম ঘোষণা করেও যতীনের হদিশ মিলছে না। এখনো তিনি ছদ্মবেশে কলকাতায় বহাল তবিয়তে যাতায়াত করছেন, কিন্তু তাঁর মতো উগ্র চরিত্রের নাগাল পাবার যোগ্য চর পাওয়া দূর্লভ, বিশেষত সর্বদাই তিনি সশস্ত্র থাকেন”।

যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায় তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেনঃ “কলকাতায় Flying Squad, Armoured Car-এর সশস্ত্র পাহাড়ার ব্যবস্থা হল। বড় রাস্তাগুলিতে ড্রপ-গেট করা হল – রেললাইন বন্ধ করার যেরূপ লোহার পাল্লা খাড়া রাখা হয়, ঠিক তেমনি। থানায় সাইরেন বসানো হল। কলকাতা থেকে উত্তর ও পূর্বদিকে খাল পার হবার যত পোল আছে – চিৎপুর, টালা, বেলগেছে, মানিকতলা, নারকেলডাংগা ও হাওড়ার পোলে সশস্ত্র প্রহরী দেওয়া হল। যাকে-তাকে এবং যে-কোনও গাড়ীকে ধরে তল্লাশ করা হতে লাগল।

কোন মহৎ সাধনার পথে যতীন নেমেছেন, তা স্মরণে রেখে পুলিশের দেশী কর্মচারীরা পর্যন্ত মনেপ্রাণে যতীনের অনুরাগী হয়ে উঠলেন। ব্যতিক্রম ছিলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর সুরেশ মুখার্জি। তিনি বিপ্লবীদের জব্দ করতে বদ্ধপরিকর। বারেবারে সুরেশের ব্যবহারে বিরক্ত হয়ে একদিন যতীন বললেন, “যতক্ষণ না সুরেশকে সরানো হচ্ছে, ততক্ষণ আমি জলস্পর্শ করব না”। ২৮/২/১৯১৫ তারিখে ভোরবেলা সুরেশ সদলবলে টহলে বেরিয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বড়লাট যাবেন-তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা পাকা করতে। নিপুণহাতে সুরেশকে নিধন করে যতীনের সহকারীরা গা ঢাকা দিলেন। এদেঁর কর্মতৎপরতায় এমনকি টেগার্টও মুগ্ধ হয়ে পরবর্তীকালে স্বীকৃতি জানিয়েছেন যে, বাঙ্গালী এই বিপ্লবীদের চরিত্রের সমতুল জগতে আর কোথাও পাওয়া বিরল। এদেঁর আত্মবিশ্বাস ও দেশের কাজের জন্য সর্বস্বত্যাগের ব্রত টেগার্টকে মনে করিয়ে দিয়েছে গাঁন্ধীর কথা।

জটিল এই পরিস্থিতিতে যতীনের আর কলকাতা থাকা সমীচীন নয়, বিবেচনা করে তাঁর শিষ্য ও সহকারীরা খুঁজে পেলেন বালেশ্বর (বালাসোর)-এর আশ্রয়। ওখানকার উপকূলেই জার্মান অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রধান জাহাজটি আসার কথা। তার প্রতীক্ষায় যতীন ওখানে চার-পাঁচজন কর্মীকে নিয়ে আস্তানা গাড়লেন। স্থানীয় অভিভাবকরূপে রইলেন মনীন্দ্র চক্রবর্তী। দীর্ঘ ছ’মাস তিনি বুকের পাঁজরের মতো আগলে থেকেছেন মহানায়কের এই অজ্ঞাতবাসের আস্তানা। যতীনকে বালেশ্বরে নিরাপদ দেখে নরেন ভট্টাচার্য (এম.এন. রায়) রওনা হলেন বাটাভিয়া অভিমুখে, বীরেন চট্টোপাধ্যায়ের নির্দেশমাফিক; সেখানে হেলফেরিষ্ ভ্রাতাদের কাছে বিশদ অবগত হলেন জার্মান অস্ত্র নিয়ে জাহাজ আসার পাকা খবর; ফিরে এসে গুরুর চরণে একথলে মোহর ঢেলে দিয়ে প্রণাম করে জানালেন, জার্মান সহযোগিতার দরুণ প্রাপ্য অর্থের এটি প্রথম কিস্তি। মনীন্দ্র সবই দেখেছেন। সবই জানতেন। বিশাল ঝুঁকি নিয়ে তবু তিনি এঁদের আশ্রয় দিয়েছেন। মুগ্ধ হয়ে এঁদের সান্নিধ্য উপভোগ করেছেন। ইতিমধ্যে রাসবিহারী’র প্রচেষ্টা যেমন উত্তরাঞ্চলে ভেস্তে যায় কৃপাল সিং নামে বিশ্বাসঘাতক ‘গদর’ কর্মীর জন্য, তেমনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চেকোস্লোভাকিয়া থেকে সমাগত বিপ্লবীরা ইন্দো-জার্মান সহযোগিতার সংবাদ ফাঁস করে দেয় মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারের দপ্তরে-প্রতিদানে নিজেদের সংগ্রামের অনুকূল সহানুভূতি পাবার প্রত্যাশায়। মার্কিন গোয়েন্দা বিভাগের উদ্যোগে জার্মান সরকারের সংগে জার্মান বিভিন্ন দূতাবাসের পত্র ও তারবার্তা হস্তগত করে ব্যাপক এই আন্তর্জাতিক সংগঠনের মূল উপড়ে ফেলতে উদ্যত হল সমবেত ব্রিটিশ ও মার্কিন সুরক্ষা বিভাগ। পেনাং’এর একটি সংবাদপত্রের কাটিং থেকে যতীন খবর পেলেন যে, অস্ত্রশস্ত্রসমেত জাহাজ ধরা পড়ে গিয়েছে। মারাত্মক এই নিরাশায় তিনি ভেংগে পড়বেন ভয় ছিল সহকারীদের। পরিবর্তে তিনি হেসে উঠলেন, যেন কিছুই তেমন ঘটেনি: “দেশের সুরাহা বাইরে থেকে নয়, তা আসবে অভ্যন্তর থেকে!” রোজ বিকেলে বনভূমির নীরব আশ্রয়ে যতীন গীতার ক্লাস নিতেন। শিষ্য নলিনীকান্ত কর তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, “মনে হত যেন গৌতম মুনির কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে বেদমন্ত্র”। ক্লাসের শেষে অস্তসূর্যের আলোকে একাকী যতীন কিছুক্ষণ ধ্যান করতেন। একদিন মনীন্দ্রও বসে রইলেন। হঠাৎ যতীন অদূরবর্তী মনীন্দ্রের হাত ছুঁয়ে বলে উঠলেন: “ওই দ্যাখ! কৃষ্ণ আমাদের দিকে হাসিমুখে চেয়ে আছেন!” মনীন্দ্র সেই দৃষ্টির অভাবে প্রত্যক্ষ করলেন-যতীনের স্পর্শে এক তীব্র পুলকের স্রোত।
কলকাতা থেকে খবর এল, একের পর এক বিপ্লবীদের কেন্দ্রগুলিতে তল্লাস চালাচ্ছে পুলিশ। বালেশ্বরের সন্ধান পেতে দেরী নেই। দুর্গম ডুভিগর পর্বতশ্রেণী দিয়ে গা ঢাকা দেবার উপযোগিতা নিয়ে কেউ কেউ যখন জল্পনা-কল্পনা করছেন, যতীন দৃঢ়স্বরে জানালেন, “আর পালানো নয়। যুদ্ধ করে আমরা মরব। তাতেই দেশ জাগবে।”
উড়িষ্যার মহাফেজখানায় রক্ষিত নথিপত্র থেকে পুংখানুপুংখভাবে উদ্ধার করা গিয়েছে চারজন অনুচরসমেত কী অসমসাহসিক যুদ্ধ করলেন যতীন-বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশের মুখোমুখি।
৫-৯-১৯১৫ এ বালেশ্বরের য়ুনিভার্সাল এম্পোরিয়াম পুলিশ তছনছ করেও কিছু পেলোনা। জনা চারেক গ্রেপ্তার হলেন। চল্লো নির্মম অত্যাচার। মারের মূখে সবাই একই রকম শক্ত থাকেন না। মূখফস্কে কিছু তথ্য দিয়ে দেন। তাদের বেইমান বলা যায়না। নরেন গোসাইয়ের মত বিদেশে চাকরীর লোভে যারা রাজ সাক্ষী হতে চায়, তাদের বেতন মৃত্যু।
ত্রিশ মাইল দুরে কাপ্তিপদার জঙ্গল। এবার একদিকে পাচজন বাঙালী যুবক। অস্ত্র বলতে মাউজার পিস্তল। আর অন্যদিকে বালেশ্বর সশস্ত্র পুলিশ, নীলগিরি রাজ্য সশস্ত্র পুলিশ, ময়ুরভন্জ সশস্ত্র পুলিশ। এনফিল্ড রাইফেল ও মেশিনগান। মোটরগাড়ী, হাতি, সবই আছে। রাতে সাহেবপুঙ্গবেরা জঙ্গলে ঢুকতে সাহস পেলোনা। সঙ্গীরা যতীনকে জঙ্গলের পথ ধরে পালাতে বল্লেন। কিন্তু ভয় জিনিষটাকে পাচ বছর বয়েষেই বাংলা মায়ের এই সেরা সন্তান জয় করেছে।
৬-৯-১৯১৫, ভাদ্র মাস, গুড়িগুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ওড়িশার ঐ অঞ্চল যথেষ্ঠ বৃষ্টিপ্রবন। যতীন তালডিহার আস্তানায় এলেন। সেখানেও একই অনুরোধ, যতীন জঙ্গলের পথে চলে যান। কিন্তু তিনি রাজী নন। তার একটাই কথা, জাতি জাগবে।
এবার পাচজন যতীন, জ্যোতিষ পাল, চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী, নীরেন্দ্রচন্দ্র দাশগুপ্ত, মনোরন্জন সেনগুপ্ত জঙ্গলের পথে এগেলেন। টাকা কড়ি, আগ্নেয়াস্ত্র পুরু চামড়ার থলি ও বাক্সে।

৯ই সেপ্টেম্বর, ১৯১৫। তখনো ভোর হয়নি। ত্রিশ কোটী ভারতবাসী,কাবুল থেকে রেঙ্গুন, শ্রীনগর থেকে কন্যাকুমারী, গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। পাচজন বঙ্গসন্তানকে ঘিরে প্রায় পাচ শতাধিক নেকড়ে, কিন্তু এগোতে ভয় পাচ্ছে। ওদিকে ঝিনাইদহে, দিদি বিনোদ বালা,স্ত্রী ইন্দুবালা,নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে অভ্যস্ত। দিদির এক কথা – যেন শুনতে না হয়, সিংহ পিঞ্জরাবদ্ধ। তিন শিশুপুত্র আশালতা, তেজেন্দ্র নাথ, বীরেন্দ্র নাথ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। বিনোদবালা কেদে বালিশ ভিজিয়ে দিলে, ইন্দুবালা জেরা করেননা মনে পড়ে যায়, স্বামীর পত্রাংশ” ক্ষনিকের দুর্বলতা সকলেরই আসতে পারে, সে সময় ধৈর্য্য সহকারে দিদিকে সাহায্য করিও”। বহু জন্ম তপস্যা করলে, বাঙালীর ঘরে এত পৌরষত্ব নিয়ে এসব মহামানবরা জন্মগ্রহন করে।
আশ্চর্যকথা এটাই, এদিকে যখন বুড়ীবালামের তীরে উপরওলা বাঙালীজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ পুরুষকারের পরীক্ষা নিচ্ছেন, সেই সময়ে বিনোদবালার ডায়রীতে, ঐ একই দিনে একটা কবিতা লেখা হয়(পরে উদ্ধার হয়)যাতে ঈশ্বরের কাছে মনোবলের প্রার্থনা স্পষ্ট। এটাকে কি বলা যায়, ঘটনার সমাপতন?
গোবিন্দপুর গ্রামের কাছে, ভাদ্রের ভরা বুড়ীবালাম, সরকারি আদেশে সব নৌকা বাজেয়াপ্ত। নদী পার হয়ে বাবুরা দক্ষিণমুখো ভগুয়া গ্রামের কাছে গভীর জঙ্গলের দিকে চললেন। এ অঞ্চলের মানুষ, এতটাই পিছিয়ে যে সরকারী ঢ্যারা বিশ্বাস করলো। সাব ইন্সপেকটর চিন্তামনি সাহু সাদা পোষাকে হাজির ছিল, হঠাৎ যতীনকে জড়িয়ে ধরলো। দেশবাসীর জন্য যতীন গুলি ভরা পিস্তল রাখেন নি। একটা ঝটকা দিলেন। গুলতিতে ভরা পাথরের মত চিন্তামনি সাহু ছিটকে গেলেন। বাধা দুর হলো। সামনেই “অমৃত ” নদী। মাথায় পুটলী বেধে, ভরা বর্ষার নদী সাতরে পার হলেন পাচ বিপ্লবী।
চাষাখন্ড গ্রামের টিলায়, মজে যাওয়া, “দেশোয়া গরিয়া” জলার ধারে বসলেন পাচ বিপ্লবী। তিনদিন, পেটে দানা পড়েনি। নীরেনের একটা পা ক্ষতিগ্রস্হ। তিনি চিত্ত, মনোরঞ্জনকে অনুরোধ করলেন, তোরা দাদাকে বুঝিয়ে বল, আমার জন্য সবাই ধরা পড়ার মানে হয়না। রুখে দাড়ালেন দলনেতা, “কি এক যাত্রায় পৃথক ফল? আমরা মরলে, দেশবাসী জাগবে, এই যে গ্রামবাসী, যারা আমাদের ডাকাত ভাবছিল, হয়তো এতক্ষণে থানায় খবর পৌছে গিয়েছে (যতীনের অনুমান সঠিক ছিল), তারা অন্তত জানবে আমাদের পরিচয়। তাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, দেশটাকে স্বাধীন করতে এগিয়ে আসবে।”
এদিকে পাচজন পিস্তল ধারী আর অন্যদিকে বিপুল সেনা সমাবেশ, স্হানীয় শাসক কিলবি, রাদারফোর্ড একদিক দিয়ে আর কোলকাতা থেকে আসা সাহেবরা বিপুল সশস্ত্র সেনা, পুলিশ নিয়ে আরেক দিক থেকে। দুরপাল্লার রাইফেল। মেশিনগান।
ওদিকে চিত্তপ্রিয় দূরবীন দিয়ে দেখলেন, কিলবির নেতৃত্বে সশস্ত্র রাইফেলধারী পুলিশ এগিয়ে আসছে। অন্যদিকে রাদারফোর্ডের নেতৃত্বে আরেকদল। কিলবি দুরপাল্লার রাইফেল চালিয়ে বুঝিয়ে দিলো, “আমাদের ক্ষমতা”। সামনে দেশী সেনাদের রেখে সাদারা পিছনে। ভাঙ্গা মন নিয়ে সব্যসাচী যতীন দুহাতে মাউজার নিয়ে প্রস্তুত হলেন, দেশীয় মানুষ মারতে তার প্রান কাদে। হঠাৎ নিখুত নিশানায় যতীন মাউজার চালালেন দুহাতে, পর পর। জনাদশেক ধানক্ষেতে চিতপাৎ। রাদারফোর্ড বাহিনী পিছু হটে গেলো। সেটা কিলবি বাহিনী দেখে ধানক্ষেতে শুয়ে পড়লো। ভাদ্রের ধানক্ষেত। পাচশো সেনার অবস্হা শোচনীয়। আসলে প্রখর বুদ্ধিমান যতীনের রনক্ষেত্র নির্বাচনটা সঠিক ছিল। একাধিক উইঢিপি,টিলা ও প্রাকৃতিক পরিখা। যুদ্ধ শুরু হয় দুপুরে। সন্ধ্যা হয় হয়। জন প্রতি একশো সেনা দুরপাল্লার রাইফেল নিয়ে এক পা ও এগোতে পারেনি। এদিকে বা হাতে যতীন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। সেটা তুচ্ছ। ঐ হাতেই উনি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের গলা চেপে ধরেছিলেন।
যতীন তখন দেশীয় সেনাদের এড়িয়ে, সাদাদের টার্গেট করছেন। ফলে যেটা হচ্চে, সেটাকে ঠিক যুদ্ধ বলা যায়না। রাদারফোর্ড সেটা বুঝে দেশীয় সেনাদের এগিয়ে দিচ্ছেন। এই সময়ে চিত্তপ্রিয় ও যতীন, দুজনেই গুলিবিদ্ধ হলেন। চিত্তপ্রিয়, দাদা,বলে শেষ কথা বলে, শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলেন। যতীন, নিজের বা হাতে ও পেটে গুলি বিদ্ধ, চিত্তপ্রিয়র মাথাটা কোলে, ডান হাতে পিস্তল চালিয়ে যাচ্চেন। পঞ্চপাণ্ডবের একজন চলে গেলো। প্রতিশোধ নিতেই হবে।

যতীনের দ্বিতীয় হ্রদপিন্ড চিত্তপ্রিয় যদি অন্য কোথাও এভাবে চলে যেতেন, যতীন হয়তো চোখের জল রাখতে পারতেননা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে দুর্বলতার কোন স্হান নেই। প্রকৃত বিপ্লবীর শিক্ষা। এমন সময় জ্যোতিষ পাল আরো গুরুতর খবর দিলেন, দাদা টোটা তো প্রায় শেষ। যতীন চামড়ার থলিটা এগিয়ে দিলেন, আরো দুদিন যুদ্ধ চালানোর রসদ। এদিকে আলো প্রায় স্তিমিত। যতীন বল্লো, এ যাত্রা বোধহয়, আমাদের ঠেকাতে পারলোনা। অন্ধকার নামলেই ঐ জঙ্গলে গিয়ে ঢুকবো।
একি অবস্হা। চামড়ার ব্যাগের চাবী কৈ। ব্যাগটা প্রচন্ড পুরু ও ভারী। যতীন ব্যাগটা খোলার চেষ্টা করছেন,এমন সময়ে আরেকটা গুলি এসে বা হাতের আঙুলে লাগলো। রক্তে সারা গা ভেসে যাচ্ছে। ডান হাত এখনো সক্রিয়। মুস্কিল হলো, দেশীয় সেনাগুলো, পাল্লার মধ্যে আর শেতাঙ্গ শয়তান, সব রেন্জের বাইরে। অগত্যা। যতীন ডান হাতে নিখুত লক্ষে পিস্তল চালাচ্ছেন। প্রায় প্রতিগুলীতেই একজন না একজন আহত হচ্ছেন। কিন্তু ওনার লক্ষ হাত পা। মাথা, বুক কখনোই নয়। কারন ওরা যে এই দেশেই জন্মগ্রহন করেছে।
এদিকে জ্যোতিষের বুকের ডানদিকে একটা গুলি ফুড়ে বেরিয়ে গেলো। সারা গায়ে ক্ষত নিয়ে যতীন গুলি চালিয়ে যাচ্ছেন। নীরেন, মনোরন্জন সামনের ডোবা থেকে জল এনে সঙ্গীদের সেবা করে যাচ্ছেন। অন্ধকার দ্রুত নেমে আসছে।
যতীন ক্ষীনকন্ঠে জানালেন, নীরেন, মনোরঞ্জন, তোরা রইলি, মরার আগে দেশবাসীকে জানিয়ে যাস, আমরা ডাকাত নই, দেশবাসীকে আমাদের মহান ব্রতের কথা জানিয়ে যাস। দেশ জাগবে, আমাদের পথে।
আর কার্তুজ নেই। চামড়ার ব্যাগ ভর্তি কার্তুজ। খোলা যাচ্ছেনা। প্রায় তিন দিকেই প্রায় সাতশো সেনা, পুলিশ, হাতি, ঘোড়া, দুরে মোটরগাড়ী। মাঝখানে পাচজন বঙ্গসন্তান। দুজন নিহত, তিনজন গুরুতর আহত। বিপ্লবীরা আত্মসমর্পনের ইঙ্গিত দিলেন। আর কার্তুজ নেই।
সেনারা এগিয়ে এলো। রাদারফোর্ড অবাক হয়ে দেখলেন, এইসব পিস্তল দিয়ে পাচ শো, হাজার গজ দুরে এরা কি ভাবে নিখুত লক্ষ্যভেদ করছিল। এবার কুলি সংগ্রহ করে নীরেন ও মনোরঞ্জনের হাত বাধা হয়নি। এনারা আহতদের দেখাশোনা করছিলেন। যতীনের কথায় রাদারফোর্ড নীরেন ও মনোরঞ্জনকে যতীনের পাশে বসবার অনুমতি দেয়। মনোরঞ্জন সাগ্রহে যতীনের মাথা কোলে নিয়ে বসলেন। আর নীরেন নিলেন জ্যোতিষ পালের ভার। এবার খাটিয়া এনে দুজন গুরুতর আহত ও একজন নিহতকে খাটিয়ায় শোয়ানো হলে।
এখানে একটা কথা বলার আছে। স্বাধীনতার পর একটা তৃতীয় শ্রেনীর চলচ্চিত্র হয়, নাম, “বাঘা যতীন” এটায় বরকতুল্লার নাম পর্য্যন্ত উল্লেখ হয়নি, যিনি শিক্ষায় একেবারে উপর দিকে, টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, যার সাহায্য ও সাংগঠনিক সাহায্য ছাড়া, জার্মানী, আমেরিকাকে এই মুক্তি সংগ্রামকে সংগঠিত করা যেতোনা। সিনেমাটায় দেখানো হয়েছে, বাঘাযতীন, মৃত্যু শয্যায়, হাসপাতালে, শেতাঙ্গের হাত থেকে জল খেতে আপত্তি করছেন। চাচাবাহিনীর তৈরী এটা ডাহা মিথ্যা। সিনেমাটি পাচের দশকের শেষ দিকে। ঐ সময়ে বিপ্লবীদের দিকে সহানুভূতি নিজেদের দিকে টেনে আনার উদ্দেশ্যে, ক্ষুদিরাম (জুবেদা খাতুন অনুল্লেখিত), চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার-লুন্ঠন (যুববিদ্রোহ বলতে শয়তানদের কষ্ট হয়) বা – বাঘাযতীন। রনক্ষেত্রে রাদারফোর্ডের সৌজন্যের বিনিময়ে, যতীনও সৌজন্য দেখিয়েছিলেন। রাদারফোর্ড টুপিতে করে ডোবা থেকে রনক্ষেত্রে যতীনের জন্য জল নিয়ে এলে, যতীন তা গ্রহন করেন।
এদিকে তুমুল বৃষ্টি নামলো। বালেশ্বর হাসপাতালে অশ্বারোহী দূত মারফৎ খবর গেলো। কিলবিকে যতীন, ঐ অবস্হাতেও জানালো, “আমার ছেলেদের প্রতি যেন অবিচার না হয়, যা কিছু হয়েছে আমার নির্দেশে। সব কিছুর জন্য, আমি দায়ী। “.
রাত এগারোটা। বিশাল মিছিল বালেশ্বর সরকারি হাসপাতালের দিকে এগিয়ে চলেছে। এদিকে গ্রামবাসীরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে। কিন্তু বহু দেরী হয়ে গেছে। তারা অনুতাপ করতে শুরু করেছে। বিক্ষোভের ভয়, হাসপাতালে সেনা মোতায়েন হলো।

সশস্ত্র প্রহরী নিয়ে হাসপাতালে ঢুকলেন সার্জন খান বাহাদুর রহমান, সহকারী সার্জন গাঙ্গুলি। একজন লেডী ডাক্তার,দুজন কম্পাউন্ডার, চারজন নার্স, তিনজন কুলি, দুজন মেথর। যতীনের উর্ধাঙ্গ অবারিত। বা হাতের আঙ্গুল, দুটি মেটাকার্পাল অস্হি গ্রন্হি গুড়ো হয়ে গেছে। তলপেট ও নাভির দুদিকেই রাইফেলের বুলেট। ক্রমাগত রক্তক্ষরণ হচ্চে। ডাক্তার লিখলেন, যবনিকা পতনের আর দেরী নেই।
মহান শহীদ চিত্তপ্রিয়ের মৃতদেহ চলে গেলো মর্গে। নীরেন ও মনোরঞ্জনের প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাজতে নিয়ে যাওয়া হলো।
যতীনকে অপারেশান রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। রক্তবমি হচ্চে। কিলবি নিজের হাতে লেমনেড খাইয়ে দিলেন, কোলকাতা থেকে নির্দেশ এসেছে, বাচিয়ে রাখতেই হবে, বহু আন্তর্জাতিক যোগায়োগের মূলসুত্র বাংলা মায়ের এই সন্তান, বিশ্বের একমাত্র মানুষ যে শৈশবে পাগলা ঘোড়া থামিয়ে দেয়, কৈশোরে খালি হাতে রয়্যাল বেঙ্গল হত্যা করে। হাজার গজ দুর থেকে পিস্তল দিয়ে নিখুত লক্ষভেদ করে। এর কাছে না জানি কত খবর থাকবে।
এমন নজির ইতিপূর্বে দেখেননি বলে মেনে নিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী ইংরেজ কুশীলবেরা। ৯ সেপ্টেম্বর ১৯১৫ সালে সূর্যাস্তের সংগে অবসান হল এই যুদ্ধের। পরদিন বালেশ্বর সরকারী হাসপাতালে যতীন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
……………