বাঙালির সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম কমেডিয়ান ভানু ব্যানার্জি কেন সত্যজিত রায়ের ছবিতে স্থান পান নি, আমার গতকালকের সে লেখার কয়েকটি প্রতিক্রিয়া এসেছে। এক, সত্যজিতের একটা বক্তব্য ছবি আকারে দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, অবশ্য সোর্স ছাড়াই, যেখানে সত্যজিত বলছেন, ভানুকে না নেওয়ার মানে এই নয় যে ভানুর অভিনয়ের কদর তিনি করেন না, জনপ্রিয় অভিনেতাদের দিয়ে ছোট চরিত্রে কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা আছে, এবং ভানুও এর শিকার। সেক্ষেত্রে আমার প্রতিক্রিয়াঃ

সত্যজিতের কোন্‌ লেখায় আছে? আমি জানি কাল আমার লেখাটা ফেসবুকে আসার পর থেকেই বাঙালি বিশ্বমানবরা ডেসপারেট হয়ে পড়েছেন, এবং একজন খুঁজেপেতে এটা ধরে এনেছেন। কিন্তু সত্যজিতের কোন্‌ লেখায় আছে? কোনও ইন্টারভিউ হয়ে থাকলে সেটার অথেন্টিসিটি কিঞ্চিত ভগ্ন, কারণ ইন্টারভিউয়ার নিজের মত করে একটা সুখময়, মিলনময় পংক্তি চাপাতেই পারেন রায়ের মুখে।

কিন্তু সেও বাহ্য। সত্যজিত সত্যি সত্যি এমন কিছু বলে থাকলেও আমার একটি বক্তব্যও নাকচ হয় না, সত্যজিত সম্পর্কে আমার সমালোচনার একটি বক্তব্যও নড়চড় হয় না। সত্যজিত যা বলছেন তাতে এটাই প্রমাণ হয়, ভানুর করার মত চরিত্র উনি একটাও সৃষ্টি করতে পারেন নি। তাতে তো আমার বক্তব্যই ঘুরিয়ে প্রতিষ্ঠা হয়।

দুই, কলকাতায় নাখোদা মসজিদের সামনে বিফ ফেস্টিভাল করতে চাওয়া একজন সেকুলার ছোকরা জানতে চেয়েছে, সুপ্রিয়াও তো পাননি, কেন পাননি? এবং এই বলে আমায় একখানা গালিও দিয়েছে। তা, সুপ্রিয়ার সঙ্গে ভানুর তুলনা চলে না। ভানু সেযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিনেতাদের একজন। সুপ্রিয়া কেন, বাংলা ছবির ইতিহাসে খুব কম অভিনেতাই ভানুর ধারেকাছে আসেন। এইবার লিস্ট বানানো যেতে পারে আর কে কে পান নি, কিন্তু ভানুর মাপের অভিনেতা আর কে আছেন, যাকে সত্যজিত এমন করে বাঘের মত এড়িয়ে গেছেন সারাজীবন?

তিন, আরেকটা বক্তব্য, এবং এই বক্তব্যটা খুব স্পষ্ট ভাবে কেউ না বললেও, মোটামুটিভাবে অনেকের মুখেই ধ্বনিত হয়েছে, এবং আমি কিঞ্চিৎ এগ্রি করি। এরা বলছেন, এমনও হতে পারে ব্যাপারটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়, ভানুর জন্য কোনও চরিত্র হয়ত এমনিই ভেবে উঠতে পারেন নি সত্যজিত। হতেই পারে।

কিন্তু সত্যজিত বিশ্বমানব ছিলেন, ইংরেজঘেঁষা ছিলেন। ভানু ইংরেজবিরোধী বিপ্লবী ছিলেন, জাতীয়তাবাদী বামপন্থী ছিলেন। দুজনের দুটো আলাদা জগত, এবং সেজন্যই, সত্যজিতের কাজে ভানুর ঠাঁই না হওয়াটা আমি কাকতালীয় বলতে পারছি না। কিন্তু একথা সত্যিই, সে সম্ভাবনার জন্য জায়গা ছেড়ে রাখতেই হবে। একজন auteur সারা জীবনে যে কটা কাজ করেন, তাতে সমস্ত দিকপালকে স্থান দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।

আমি শুধু বলছি, দুজনের প্রবণতা দেখুন, অত্যন্ত ভিন্ন। দুজনে একসঙ্গে কাজ না করার পেছনে এই ভিন্নতা থাকতে পারে। আগেই বলেছি, এটা আমার তত্ত্ব মাত্র। যারা বিশ্বমানবতার বিশ্বদালালিতে অন্ধ হননি এখনও, তারা স্বীকার করবেন, সত্যজিত সম্পর্কে আমার সমালোচনা এবং ভানু সম্পর্কে আমার মূল্যায়ন, দুটোতেই যথেষ্ট ওজন আছে।

সত্যজিতের সমালোচনা অনেকেই সহ্য করতে পারেন না, এ আমি আগেও দেখেছি। বাঙালির অবনমনের মূলে যে বিশ্বমানবতা আছে, সেই বিশ্বমানবতার দুজন হাই প্রিস্ট, টেগোর আর রায়। আমি ঈশ্বর গুপ্তের ভূতের বেগার খাটছি, তাই বেশ অপ্রিয়ভাবে আমায় দুজন খুব উপাদেয় লেখককে আক্রমণ করেই যেতে হয়, কি করব। সত্যজিত অত্যন্ত উপাদেয়, সুস্বাদু। কিন্তু বিশ্বমানবতার বিষ ষোলো আনা রয়েছে ওর জীবনদর্শনে, লোকটির জীবনদর্শন কমপ্রাদর।

সত্যজিতের বিপ্রতীপে ভানু ব্যানার্জি অত্যন্ত জরুরি এক ব্যক্তিত্ব, সত্যজিত ঋত্বিক বাইনারি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যও ভানু ও বাংলা চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁর দেশজ দাপট খুব কাজে আসতে পারে। ভানুকে নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ প্রবন্ধ লেখায় হাত দিয়েছি। সত্যজিতের সঙ্গে তুলনা টানা হল আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের একটা পাঁয়তাড়া।

ডিসকোর্স তৈরি হবে, আর তার কয়েকটা খুব জরুরি ফোকাল পয়েন্ট থাকবে না? কারিকুলাম তৈরি হবে, আর তার ক্যানন থাকবে না? বিশ্বমানব, বিশ্ববিপ্লবী, বিশ্বহিন্দু, সবাই তো বেজাতের মুরুব্বিদের কোলে চেপে একটা ফ্রেমওয়ার্ক বানিয়ে নিয়েছেন।

বাঙালি আইডেন্টারিয়ান ডিসকোর্সের পয়েন্ট আর কাউন্টারপয়েন্ট তৈরি করছি মশাই, বুঝেছেন? ওই আপনাদের মত ফেলুদাভক্ত আর সত্যজিতভক্ত হয়ে শালিকের, দোয়েলের দিন কাটাতে আমিও পারতাম।