“মনু সমহিতা এবং বিদেশী ঐতিহাসিক জ্ঞানী গুনী ব্যাক্তি”
ডাঃ মৃনাল কান্তি দেবনাথ

মনু কে ছিলেন, ক’জন ছিলেন, কখন ছিলেন সে কথা আলোচনা করেছি। নানা মুনির নানা মত থাকতেই পারে। কিন্তু আমার পড়া কিছু সংষ্কৃত পন্ডিতের লেখায় এটুকু বুঝেছি যে, ভৃগু মুনি বৈবাষত্ব মনুর (আমাদের জম্বুদ্বীপের মনু—যে কথা আগেই আলোচনা করা হয়েছে) কাছে সর্ব শাস্ত্র জ্ঞান লাভ করেন। তিনি ১০০০০০ শ্লোকের সমহিতাকে সংক্ষিপ্ত আকারে ১০ জন ঋষিকে সেই জ্ঞান বিতরন করার আদেশ দেন। (এদের নাম ও আমি আগে লিখেছি)।

মনু সমহিতার বর্তমান সংষ্করন, বারো অধ্যায়ে সংকলিত এক বিশাল  তথ্য ভান্ডার। এর মধ্যে অর্থ নীতি, রাজ নীতি, আধ্যাত্ম্য জ্ঞান, নীতি জ্ঞান (Ethics), বিচার নীতি ( Justice system), সমাজ বিজ্ঞান ইত্যাদি, মানুষের নিত্য নৈমিত্তিক জীবনে প্রয়োজনীয় সমস্ত কিছুই আলোচনা করা আছে।

মুল শাস্ত্র মানুষের জীবনের সামগ্রিক কথাই বলতো। আমাদের দেশের সংবিধান যেমন নানা সময়ে পরবর্তিত, সংশোধিত বা অনেক কিছু সংযোজিত করা হয়েছে (তাতে ভালো হয়েছে কি খারাপ হয়েছে সে কথা সতন্ত্র) , তেমনি কয়েক হাজার বছর আগের প্রচলিত ধ্যান ধারনা, নিয়ম কানূন পরিবর্তিত এবং অনেক সময় শাসক গোষ্ঠীর বা সমাজের নিয়ন্ত্রক গোষ্টির (পড়ুন পতিত ব্রাহ্মন শ্রেনীর) স্বার্থ রক্ষাকারী সংশোধন করা হয়েছে,যার মধ্যে ‘সামাজিক বিধান’ একটি। এই সংশোধন এবং সংযোজন ‘পতিত ব্রাহ্মন- শাসক(ক্ষত্রিয়) এবং ব্যাবসাদারী শ্রেনী (বৈশ্য)’ দের এক সম্মিলিত কাজ, যা ব’কলমে আজো, এই আধুনিক যুগেও চলছে সমানে।

পৃথিবীতে এমন কোণ ধর্ম আছে, যে ধর্মে নিয়ম কানুন স্বার্থান্বেষীদের দ্বারা কলুষিত হয় নি???????? তাদের নিজে দের স্বার্থে নিয়মের পরিবর্তন করা হয় নি????? ধর্মের নামে অধর্ম করাই তো বেশীর ভাগ মানুষের এক অকর্ম (যা করা উচিত নয়) বা বিকর্ম (বিশেষ রুপে কর্ম)। প্রকৃত কর্ম আমরা ক’জনে করি?????????????

“শ্রুয়তে মনুনা গিতৌ শ্লোকৌ চরিত্র বৎসলৌ।
গৃহিতৌ ধর্মোকুশ্লৌস্তথা তচ্চরিত্রং ময়া।।
রাজাভি ধর্মোকুশ্লৌস্তথা কৃত্বোয়া পাপানি মানবা।
“নির্মলাঃ স্বর্গামায়ান্তি শান্তঃসুকৃতিনো যথা।।
সসনাদ বাপি মোক্ষসাদ বা স্থেনো পাপাদ প্রমুচ্চ্যতে।
রাজা ত্বোয়াশানান পাপস্য তদ্বাপ্নতি কিল্বিসাম ।।”

“ মানুষ অপরাধ করলে, রাজা যদি তাকে শাস্তি দেন, তাহলে পাপী তার পাপ থেকে মুক্ত হয় এবং স্বর্গে যায়। রাজা সঠিক বিচার করে পাপের অভিযোগ থেকে মুক্ত করে দিলে অভিযুক্ত আর পাপী  থাকে না। রাজা যদি বিচার করে বা না করে পাপীর শাস্তি না দেন তবে রাজা নিজেই পাপী হয়ে যান”।——– এই একটি শ্লোক যদি আমাদের বর্তমান প্রশাসক  বৃন্দ জানেন এবং প্রয়োগ করেন, তাহলে হাজার পতিত ব্রাহ্মনের হাজার চেষ্টা বিফলে যায়। 

                                                                                                    ১৭৯৪ সালে, স্যার উইলিয়াম জোন্স মনুসমহিতার ইংরাজি অনুবাদ করেন। এই প্রথম শিক্ষিত পশ্চিমি জ্ঞানী জ্ঞুনীরা জানতে এবং বুঝতে পারেন কি ভাবে, মাত্র একটি ধর্ম পুস্তক এক অতি প্রাচীন জাতির এক অতি উন্নত সভ্যতা সুশৃংখল ভাবে এক সুতায় মালার মতো ধরে রেখেছিলো।

সনাতনি চিন্তা ভাবনা প্রসুত বৈদিক সভ্যতা ভারতবর্ষের বাইরে যতোদুর (তলোয়ার ব্যবহার না করেই) পৌছেছিলো (ইরাক,ইরান থেকে শুরু করে বর্তমান ভিয়েতনাম এবং তিব্বত পেরিয়ে রাশিয়ার কৃষ্ণসাগরের কুল অবধি), সেই সমস্ত দেশের সামাজিক ,ধর্মীয়, অর্থনৈতিক নিয়ম কানুন সবই শৃংখলা বদ্ধ করে এক সুত্রে ধরে রেখেছিলো ভারতীয় চিন্তা ধারা।

জার্মান পন্ডিত  Forschammer তার বই ‘Sources and development of Burmese law’ তে লিখেছেন ১৮৮৫ সাল অবধি মনু সমহিতার নিয়ামাবলী ব্রহ্মদেশের (মায়ানমার) আইন কানুন হিসাবে চলতো।

A.Bergaigne  তার লেখা বই “Sanskrit inscription in tablets in Champa kingdom” এ বলেছেন, প্রাচীন হিন্দু ‘চম্পা দেশ” এ  (বর্তমান মধ্য ভিয়েতনামের দা-নাং অঞ্চল) ছড়িয়ে আছে মনু সমহিতার অসংখ্য সংষ্কৃত শ্লোক। (লেখক ২০১২ সালে এই চম্পা দেশ (দা নাং) ঘুরে ঘুরে এই নিদর্শন দেখেছেন এবং “চম্পা সংগ্রহ শালায়” বহু হিন্দু সভ্যতার নিদর্শ, দেব দেবীর মুর্তি নিজে দেখে এসেছেন এবং এই ফেস বুকেই তার ছবি দিয়েছে্ন। পরবর্তিতে এর একটি এলবাম দেখানোর ইচ্ছা রইলো।

পশ্চিমী ঐতিহাসিক জেমস মিল, এলফিন্সটোন, ম্যাক্স ডানকার ভারতীয় সামাজিক ইতিহাস লেখার সময় অনেক তথ্য এই মনু সমহিতা থেকে নিয়েছেন এবং এই সমহিতাকে একটী আদর্শ এবং মানব সভ্যতার একটি মুল্যবান গ্রন্থ হিসাবে উল্লেখ করেছেন।

স্যার উইলিয়াম জোন্স ছাড়াও জি সি হাটন, আরথার কোক, বার্নেল, এডয়ার্ড ডব্লিউ হপকিন্স, জর্জ বুহলার এই সমস্ত পৃথিবী বিখ্যাত মনিষি লেখক, সমাজ বিদ মনুসমহিতার ইংরাজী অনুবাদ করেছেন। ১৮৯৩ সালে ‘লুই দি মনৌ’ এবং ‘লেস লুই দি মনৌ’ নামে দু খানি ফরাসী ভাষায় অনুদিত মনু সমহিতা প্রকাশ হয়।

উপরের আলোচনা থেকে এটাই পরিষ্কার হয় যে, মনু সমহিতা বিদেশী মনিষীদের সপ্রশংস শ্রদ্ধা পেয়েছিলো। তারা এই গ্রন্থটিকে একটি মুল্যবান, প্রাসংগিক এবং সুবিচার্য্য ন্যায় নীতির আধার বলে মনে করেছিলেন। এরা কেউ অশিক্ষিত, অর্ধ শীক্ষিত, পক্ষপাতি বা দুরভী সন্ধি মুলক ঐতিহাসিক বা সমাজবিদ বলতে পারবেন না।