মাঝখান থেকে জিয়াউর রহমানদের দোষটা কোথায়? কিংবা দুই গ্রুপের মধ্যে তফাতটা কোথায়? জিয়াউর রহমানরা সাম্প্রদায়িক ছিলেন? তারা রাজাকারকে মন্ত্রী বানিয়ে ছিলেন? হিন্দু ধরে খালি পিডাইতো? আদিবাসী পাহাড়ীদের উপজাতি বলে গালি দিতো? তাগো ধরে ধরে উচ্ছেদ করত? জিয়াউর রহমানরা রাজনীতিতে ইসলাম কায়েম করেছিলো?… এই তো তাদের পাপের খতিয়ান- নাকি? এবার আসেন হিসাব মিলাই। আওয়ামী লীগের নেতারা সবাই স্বঘোষিত সাচ্চা ঈমানদার মুসলমান। জিয়াউর রহমানও মুসলমান ছিলো। তাত্ত্বিকভাবে ধরে নেই তিনিও প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বিসমিল্লাহ বলেই দিন শুরু করত। তারপর একদিন তার মনে হলো, আমরা মুসলমানরা সব কাজ বিসমিল্লাহ বলে শুরু করি, তাহলে সংবিধানটা শুরুর আগে কেন নয়? ফজলে নূর তাপসদের মত সাচ্চা মুসলমানদের ঈমান আকিদা সমুন্নিত রাখতে এইখানে জিয়াউর রহমান কি বিরাট অবদান রাখেননি? জিয়াউর রহমানকে পাকিমনা বলার আলাদা কোন বিশেষত্ব আছে কি? রাজাকারের বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিতে পারলে দোষ নাই কিন্তু মন্ত্রীসভায় একটা রাজাকারকে বসালেই সে পাকিমনা?

জিয়াউর রহমানদের ঘৃণা করেছিলাম কেন? তাদের সঙ্গে তো ব্যক্তিগত, পারিবারিক কোন সমস্যা আমাদের ছিলো না। দেশে আরো ৯৯ টা দল থাকার পরও কেন আমরা একটা বিশেষ দলকে নিজেদের পার্টি মনে করতাম? সেক্যুলার প্রগতিশীলতার জন্য। সেই সেক্যুলার প্রগতিশীলতার জন্য যারা এক সময় আওয়ামী লীগকে সমর্থন করত তারা এখন কি করবে? এই দলটি তো পুরোপুরি ডানপন্থিতে ঝুঁকে পড়েছে। আদর্শের চেয়ে যাদের কাছে দল এবং নেত্রী বড় তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যারা সেক্যুলারিজমের জন্যই একদা লীগকে সমর্থন করত, বা মন্দের ভাল হিসেবে ভোট দিতো- তারা কি করবে?

কয়েক মাস আগেও আমাকে যারা ভারতের দালাল বলছিলো, তারা আজ অবাক হয়ে দেখছে আমাকে কিছু লোক পাকিস্তানের দালালও বলছে! যারা আমার লেখা আগে থেকে পড়েন, তারা জানেন ৫ জুনের একতরফা নির্বাচনের সময়ও আওয়ামী লীগকে ভোট দিতে আমি ব্লগে ফেইসবুকে দুহাতে লিখেছিলাম। কেন আওয়ামী লীগকে নির্বাচন ছাড়াই জিতে ক্ষমতায় যেতে হবে তার ব্যাখ্যা করতাম। কারণ একটাই, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে না পারলে বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় এসে দেশকে পাকিস্তান বানিয়ে ফেলবে। দেশকে ইসলামীপ্রজাতন্ত্র করে আফগানিস্থান বানিয়ে ফেলবে। দেশের মুক্তচিন্তা, প্রগতিশীলতার কোন চিহৃ থাকবে না…।

ব্লগাররা জীবনে চরম মূল্য দিয়ে অবশেষে বুঝেছিলো সাচ্চা মুসলমান হবার প্রতিযোগীতায় আওয়ামী লীগও পিছিয়ে নেই। লেখালেখির জন্য যখন তাদেরকে ধরে ইসলামপন্থিরা হত্যা করেছিলো তখন আওয়ামী লীগ পরোক্ষভাবে ইসলামপিন্থদেরই পক্ষ নিয়েছিলো এবং খুনিদের এক ধরণের খুনের লাইসেন্স দিয়ে দিয়েছিলো। ৭২ সালের সংবিধানে ফেরত যাবার সুযোগ পেয়েও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বহাল রেখেছে। শিক্ষা ব্যবস্থাকে মৌলবাদীকরণ করেছে। দেশের রাজনীতিতে মোল্লাদের প্রভাব প্রতিষ্ঠিত করেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামীকরণে মনোযোগী হয়েছে। সর্বক্ষেত্রেই যে পাকিস্তানকে মৌলবাদী দেশ হিসেবে ঘৃণা করতাম সেই পাকিস্তানকেই ছাড়িয়ে যেতে লাগল। দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর চরম নিপীড়ন নির্যাতন হলো কখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে, কখনো রাষ্ট্র নিরব থেকে সমর্থন করে গেলো। ফজলে নূর তাপস বিচ্ছিন্ন কেউ নন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির একটা প্রডাক্ট। সেক্যুলারিজম বলতে এদেশে কিছু নেই- ছিলোও না। ‘ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের’ মুখ থেকে কি সুন্দর বের হচ্ছে- মালাউন, হিন্দু, উপজাতি…।