Bengal Bleeds ….20th May 1971

১০,০০০ এর বেশি হিন্দুকে হত্যা করা হয় চুকনগরে…!!

একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানীদের দখলদারিত্বে গোটা বাংলাদেশ ছিল বধ্যভূমি। ৫৪ হাজার বর্গমাইল জোড়া এই বিশাল বধ্যভূমির বিশাল এক অংশ এখনো অনুদ্ঘাটিত রয়ে গেছে। ২০ মে’র চুকনগর ট্রাজেডি যা ’৭১ এর গণহত্যার একক বৃহত্তম ঘটনার অন্যতম সে ঘটনাও প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। চুকনগর গণহত্যার প্রকৃতি ছিল কিছুটা ভিন্ন। সেদিনের ঘটনা প্রবাহে দেখা যায় চুকনগরে পাকিস্তানী আক্রমণের মূল লক্ষ ছিল চুকনগরে আশ্রয় নেয়া লক্ষাধিক শরণার্থীর পুরুষ সদস্য যাদের প্রায় শত ভাগই ছিল হিন্দু। পাকিস্তানীরা বাংলার মাটি থেকে বাঙালি জাতির মূল পরিচয় মুছে দিয়ে সেখানে এক জগাখিচুড়ি পাকিস্তানী জাতি প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছিল। এই লক্ষে তারা বুদ্ধিজীবীদের পাশাপাশি বাংলাদেশের গোটা হিন্দু জাতিসত্তাকে আক্রমণের লক্ষে পরিণত করে। ’

৭০ এর নির্বাচনের ফলাফল থেকে তাদের ধারণা হয়েছিল হিন্দুরা বাংলাদেশে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ এবং ‘বাঙালি মানস’ এর পক্ষে ভোট-ব্যাংক। ব্যংকটি ভেঙ্গে দিলে গোটা পাকিস্তানে বাঙালি-চেতনা বিশ্বাসী মানুষ সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। শুরু থেকেই এই অপচিন্তা বিদ্যমান ছিল এবং বিভিন্ন পর্যায়ে হিন্দুদের দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। ’৭১ এ আমরা এর চূড়ান্ত রূপ দেখি। ’৪৭ এর পার্টিশন পর্বে পাঞ্জাবে  হিন্দু এবং শিখদের সমূলে হত্যা এবং দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিল, একাত্তরে এসে তারা পুর্ব বাংলায় ঠিক সেটাই করেছিল।

খুলনায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এখানে হিন্দু নিধন-বিতাড়নের সুত্রপাত হয় ১ এপ্রিলের মাঝরাতে। সাউথ সেন্ট্রাল রোডের চৌমাথার কাছাকাছি মহাদেব চক্রবর্তী, নকুলেশ্বর সাহার দুই পুত্র এবং আরো তিন ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা করা হয় যাদের আর্মিরা আগের রাতে আলোচনার নামে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। এরা সবাই ছিলেন নিতান্তই সাদামাটা মানুষ। এই ঘটনা হিন্দুদের মধ্যে ভয়াবহ আতংকের জন্ম দেয় এবং করণীয় সম্পর্কে তারা গত কয়েকদিন যে প্রচণ্ড অস্থিরতার মধ্যে ছিলেন তার অবসান ঘটায়। সন্ধ্যার আগেই শহরের সব হিন্দু বাড়ি পরিত্যাক্ত হয়। তারা তখনো আজন্মের পৈতৃক ভিটেমাটি ফেলে ভারতে যাওয়ার কথা ভাবেন নি, সবাই আশ্রয় নেন নিকটবর্তী গ্রামাঞ্চলের আত্মীয়স্বজন অথবা পরিচিতজনের বাড়িতে। কেননা কেউই তখন ভুলেও ভাবতে পারেননি যে, আগের রাতে ঠাণ্ডা মাথায় ৬ জনের হত্যাকাণ্ড প্রকৃতপক্ষে পূর্ব বাংলার মাটি থেকে একটা ‘এথনিক ক্লিনসিং’ বা হিন্দুদের ধ্বংস করার  প্রচেষ্টার রক্তাক্ত উদ্বোধন ছিল।

গ্রামে পালিয়ে গিয়েও  হিন্দুরা রেহাই পায়নি। ইতোমধ্যে অশান্তির চূড়ান্ত করে আর্মির ছত্রছায়ায় তথাকথিত ‘শান্তি কমিটি’ গঠিত হয়েছে। ‘রাজাকার’ নামে লেঠেল বাহিনী গঠিত হয়েছে। তারা আর্মি ও বিহারীদের নিভৃত পল্লীর পথ চিনিয়ে দিয়ে হিন্দু ও আওয়ামী লীগ প্রভাবিত গ্রাম চিহ্নিত করে দিচ্ছে। চারদিকে হত্যা, লুণ্ঠন, ছিনতাই, নারী ধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ শুরু হয়েছে। চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে লোকজন এক গ্রাম থেকে আর এক গ্রামে এবং শেষ পর্যন্ত বাঁচার তাগিদে ভারতের পথে ভিটে মাটি এবং আশ্রয় ছাড়তে বাধ্য হন।

চুকনগর ট্রাজেডির সুত্রপাত এভাবেই। মে’র তৃতীয় সপ্তাহে আর্মিরা বিহারী, রাজাকার এবং শান্তি কমিটির লোকদের নিয়ে নদীপথে দাকোপ, বঠিয়াঘাটা, রামপাল, ডুমুরিয়া, তেরখাদা, ফকিরহাট প্রভৃতি এলাকায় বিভিন্ন গ্রামে প্রাণঘাতী হামলা চালায়। এসব গ্রামে আগে থেকেই বৃহত্তর বরিশাল, ফরিদপুর এবং খুলনার বিভিন্ন এলাকার ছিন্নমূল হিন্দুরা আশ্রয় নিয়েছিল। গ্রামবাসীদের সাথে তারাও এলাকা উজাড় করে ভারতের পথে চুকনগরে উপস্থিত হয়।

বস্তুত ভদ্রা, কাজীবাছা, খড়িয়া, ঘ্যাংরাইল প্রভৃতি নদী ও শাখানদী পথে এবং কাঁচা রাস্তায় দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, তেরখাদা ও ফকিরহাট থেকে খুলনা-ডুমুরিয়া হয়ে চুকনগর ছিল সে সময়কার বিবেচনায় ভারতমুখী সর্বাধিক নিরাপদ রুট। অসংখ্য নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন ও সংকীর্ণ কাঁচা মাটির এই পথে আর্মি কনভয় চলাচল সম্ভব ছিলনা। ফলে লোক জন এই পথ বেছে নিত।

চুকনগর ছিল ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ এর মত। আটালিয়া ইউনিয়নের এই এলাকা ছিল খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার মিলন বিন্দু এবং সেই আমলের সম্মৃদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র। ভারতের পথে শ্রান্ত ক্লান্ত লোকজন বিশ্রাম, সীমান্ত পর্যন্ত পরবর্তী পথের অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেয়া এবং গাইড ও যানবাহনের সন্ধানে এখানে থামতো। কেননা এই পথের বিভিন্নস্থানে যেমন আর্মি কনভয় চলাচল করতো তেমনই ছিল দালাল লুটেরাদের ভয়। এখান থেকে ভারতে যাওয়ার মূল রুট ছিল মঙ্গলকোট-সরসকাটি-কলারোয়া হয়ে হাটা পথে। ফলে নৌকা এবং বিভিন্ন জিনিষপত্র পানির দামে বেঁচে দিয়ে তাদের হালকা হতে হত।

চুকনগরে মানুষের কাফেলা আগে থেকেই ছিল। কিন্তু মে’র তৃতীয় সপ্তাহে দাকোপ, বটিয়াঘাটা, রামপাল, ডুমুরিয়া প্রভৃতি এলাকা প্রায় একযোগে আক্রান্ত হওয়ায় গ্রাম কি গ্রাম উজাড় করে লোকজন চলে আসতে থাকে। দেবীতলা গ্রামের (বাটিয়াঘাটা) প্রফুল্ল কুমার ঢালী এক সাক্ষাৎকারে বলেন: জ্যৈষ্ঠ মাসের ২ তারিখে (১৭ মে) তাদের পাশের গ্রাম আক্রান্ত হয়, তারা বয়ারডাঙ্গায় আশ্রয় নেন। পরদিন রামপাল ও ফকিরহাট থেকেও দলে দলে হিন্দুরা বয়ারডাঙ্গায় পালিয়ে আসে। এসময় ফুলতলা ও অন্যান্য গ্রাম সহ তাদের গ্রামও আক্রান্ত হয় এবং বহু লোকজনের সাথে তার বৃদ্ধ পঙ্গু বাবাও নিহত হন। তিনি গ্রামে গিয়ে পার্শ্ববর্তী খালে বাবার লাশ ভাসতে দেখেন। ইতোমধ্যে বয়ারডাঙ্গাও আক্রান্ত হয়। দ্রুত বয়ারডাঙ্গা ফিরে মা, স্ত্রী ও মেয়েদের না পেয়ে উদভ্রান্ত হয়ে তিনি মাইলমারা গ্রামে যান, সেখানও তাদের পাননি। সেখান থেকে ভাই ও বোনদের সাথে নৌকায় ভারতের পথে ডুমুরিয়া বাজারে আসেন। ডুমুরিয়াতে তখন হাজার হাজার লোক, তাদের অনেকেই তার মত পাগলপারা হয়ে পরিবার পরিজনদের খুঁজে ফিরছে। প্রায় সব পরিবারে একই অবস্থা। পরদিন ডুমুরিয়া থেকে হাঁটা পথে তারা চুকনগরের দিকে রওনা হন। পথে আর এক দলের মাঝে হঠাৎ তার স্ত্রীকে দেখেন, কিন্তু চুকনগরে গোলাগুলির সময় আবার তাকে হারিয়ে ফেলেন। তবে তিনি ছিলেন সেই সব প্রায় ভাগ্যবানদের একজন যারা মা, বৌ, মেয়ে, ভাইবোন সবাইকে ফিরে পেয়েছিলেন, তবে এজন্য তাকে ভারতের সারাকান্দায় যাওয়া পর্যন্ত উদ্বেগের মধ্যে অপেক্ষা করতে হয় (মুক্তিযুদ্ধে খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা, সম্পাদনা- সুকুমার বিশ্বাস, পৃষ্ঠা ৭৮-৮৮)।

চুকনগরে সেদিন কত লোক লোক জমায়েত হয়েছিল তার কোন পরিসংখ্যান নেই। অনেকের ধারণা লক্ষাধিক। ওয়াজেদ মিয়া, আটলিয়া ইউনিয়নের চৌকিদার সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তখন এখানে বহু লোক বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছিল। সোমবার থেকে লোক আসা শুরু হয়। তারা মঙ্গলবারে আসে, বুধবারে আসে, বৃহস্পতিবার সকালেও আসে। একদল আসে একদল যায়। তখন আমাদের এখানে লোক গিজগিজ করছিল। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে এসে গেল আরো অনেক লোক। বটিয়াঘাটা, দাকোপে মনেহয় হিন্দু আর ছিলনা, সবাই এসে পড়ে (ঐ, পৃষ্ঠা- ১০৬)। বস্তুত সেদিন ২০ মে, বৃহষ্পতিবার আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর বাজার, চাঁদনী, ফুটবল মাঠ, স্কুল, পুটিমারী, মালতিয়া, রায়পাড়া, দাসপাড়া, তাতিপাড়া প্রভৃতি গ্রাম, পাতাখোলার বিল এবং ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীর পাড়ে ও নৌকায় অগুনতি মানুষ ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়ার জন্য গাইড এবং যানবাহনের অপেক্ষায় ছিল। পুরো এলাকাটা ছিল প্রায় এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের।

এখানে ঐদিন বেলা এগারোটার দিকে তারা ভয়াবহ আক্রমণের সন্মুখীন হন। আর্মিরা আসে সাতক্ষীরা থেকে জীপ ও ট্রাকে। তাদের সাথে সাদা পোষাকে মুখঢাকা লোকজনও আসে। কেউ তাদের সনাক্ত করার সুযোগ পায়নি। যারা তাদের সরাসরি দেখেছিলেন মালতিয়া গ্রমের বৃদ্ধ চেকন মিয়া ও সুরেন কুণ্ডু মুহূর্তেই গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েন। চেকন মিয়ার হাতে কাস্তে ছিল, তিনি চেঁচিয়ে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। সুরেন কুণ্ডুর গলার রুদ্রাক্ষের মালা তাকে চিহ্নিত করে দিয়েছিল। বেঁচে যাওয়া যেসব মহিলা অসহায়ভাবে আক্রমণকারীদের দেখেছেন তারা বহু দূরের লোক, স্থানীয় লোকদের তাদের চেনার কথা নয়। স্থানীয় লোকজন বলেছেন অবশ্যই চেনাজানা লোকজন আর্মিদের নিয়ে আসে। নইলে মালতিয়া ও বিভিন্ন গ্রামের আঁকাবাঁকা ভাঙ্গাচোরা সংকীর্ণ মাটির পথ চিনে আর্মিদের এক ভাগ পাতোখোলার বিল, ঘ্যাংরাইল নদী ও হিন্দু গ্রাম বেড় দিয়ে এসব জাগায় আশ্রয় নেয়া হাজার হাজার শরণার্থীর উপর হামলে পড়বে কিভাবে! আর্মিদের আর এক ভাগ চুকনগর মোড় ছাড়িয়ে খুলনাগামী রাস্তা ও ভদ্রার কূল জুড়ে বিবেকহীন নির্দয় ব্রাশ ফায়ার করতে করতে অগ্রসর হয়, যা স্থায়ী হয় তিন ঘন্টারও বেশী।

সহসাই চুকনগরের আকাশ বাতাস লক্ষ মানুষের আর্তনাদে অসম্ভব ভারী হয়ে উঠে। সে আর্তনাদ হানাদার পাকিস্তানীদের পৈশাচিক উল্ল¬াস ও অস্ত্রের ঝনঝনানিতে মাথাকুটে ফিরে এসেছিল সেই হতভাগ্য মানুষগুলোর কাছেই, মে ডে’র বিপদ সংকেত কোথাও পৌঁছায়নি। অসহায় মৃত্যু অথবা সবকিছু এমনকি সন্তান ফেলে ছন্নছাড়া পলায়ন ছাড়া সেদিন দ্বিতীয় কোন পথ খোলা ছিলনা চুকনগরে জমায়েত ভাগ্যবিড়ম্বিত লক্ষাধিক মানুষের জীবনে। অগুন্তি মানুষের ভীড় এবং হৈচৈ এর মধ্যে অনেকে বুঝতেই পারেনি, অনেকে বুঝতে পেরেও পালাতে পারেনিÑ পথঘাট চিনতো না, রাঁধতে অথবা খেতে বসেছিল কেউকেউ, অনেকেই ছিল পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন- তাদের একত্র করে পলায়ন সম্ভব ছিলনা। চুকনগর জেনোসাইডে কত লোক শহীদ হয়েছিল তার কোন পরিসংখান নেই। পাকিস্তানীদের ভয়ংকর নৃশংস ‘উড়া দো, জ্বালা দো, তাবা করদো’ নীতি এবং অক্ষরে অক্ষরে তার প্রয়োগ এতদূর আতংক সৃষ্টি করেছিল যে তখন স্থানীয় সরকার ও সিভিল প্রশাসন আদৌ কার্যকর ছিলনা। যারা আটলিয়া ইউনিয়নের পাতাখোলার বিল থেকে ভদ্রা নদী এবং সাতক্ষীরা রোড থেকে ঘ্যাংরাইল নদী পর্যন্ত বিস্তৃত এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধ জোড়া বধ্যভূমি থেকে লাশ সরানোর কাজে ব্যস্ত ছিল সেই ওয়াজেদ মিয়া প্রমুখ ৪০/৪২ জন লোক সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার হাজার লাশ গুনে শেষপর্যন্ত হাল ছেড়ে দেয়। এই গননার মধ্যে নদী, পুকুর, ডোবা, জলায় ভাসমান হাজার হাজার লাশ অন্তর্ভুক্ত ছিলনা। লাশ ফেলার সময় তারা বেশ কিছু সোনাদানা, টাকাপয়সা পেয়েছিল বলে জানিয়েছে। তার কিছু ইউনিয়ন কাউন্সিলে জমা দেয়, কিছু অন্যদের কাছে গচ্ছিত রাখে যা পরে আর ফেরত পায়নি (ঐ, পৃষ্ঠা ১০৯, ১১২)।

প্রাণভয়ে মানুষ সেদিন পুকুরে, ডোবায়, ভদ্রাপাড়ের বিশাল ঘন গাবগাছে, কালীমন্দিরে, কালীবাড়ির বটের শেকড়ের নিচে বড় গর্তে পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল, বাঁচেনি। বটের আড়ালে থাকা মানুষগুলোকে আর্মিরা নৌকা থেকে গুলি করে মারে, গাবগাছের মানুষগুলোকে মারে পাখি মারার মত। সর্বত্র লাশের স্তুপ। দেবীতলার প্রফুল্ল কুমার ঢালীর ভাষায়, ‘সেদিন কত লোক দেখিলাম বলা মুশকিল। আমি ওখানে কয়েক বিঘা এলাকা ঘুরিছি। সব জায়গায় শুধু লাশ আর লাশ। গায়ে গায়ে লাশ। লাশের উপরে লাশ। সব মরি পড়ি আছে। কোথাও পা দেয়ার জায়গা নাই। অনেক সময় লাশ পারায় যাইতে হইছে। নদীর পাশ দিয়াও অনেক লাশ। নদীর ভিতরেও অনেক লাশ ভাসতিছে। রক্তে চারদিক লাল হয়া গেছে। মাটি-জল সব লাল (ঐ, পৃষ্ঠা ৮৩, ৮৪)।’ হত্যাযজ্ঞের ব্যপকতা সম্পর্কে চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম, একাত্তরে ১৬ বছরের তরুণ, বলেছেন, গোলাগুলি শুরু হলে অনেকের সাথে তিনিও নৌকায় ভদ্রার ওপারে অনেক দূরে পালিয়ে যান। তিনি যখন মাঝ নদীতে এক ডুবন্ত মহিলার আর্তনাদ শুনে হাত বাড়িয়েও ভদ্রার প্রবল স্রোতের মুখে তাকে ধরে রাখতে পারেননি। গোলাগুলি থেমে গেলে বিকাল সাড়ে চারটায় চুকনগর বাজারে ফিরে আসেন। সে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য! নদীর পানি রক্তে লাল, চারদিকে শুধু লাশ হাজার হাজার লাশ, শত শত না। গুলিবিদ্ধ অনেকেই তখনো বেঁচে, অথচ সেবা নেই, চিকিৎসা নেই ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে অসহায় ভাবে। শহীদের সংখ্যা আট-দশ হাজারের কম হবেনা মোটেও। একই অভিমত শহীদ চেকন মোড়লের পুত্র মালতিয়া গ্রামের আরশাদ আলী এবং বাবু রামের পুত্র শ্যামল কান্তি বিশ্বাসের, একাত্তরে তারা এই হত্যাযজ্ঞের যন্ত্রণাবিদ্ধ প্রত্যক্ষদর্শী।

চুকনগর ট্রাজেডি ছিল বাংলাদেশে পাকিস্তানী হানাদারদের কৃত গণহত্যার একক বৃহত্তম ঘটনা। অথচ এই ঘটনার কথা অজানা থেকে গেছে দেশবাসী এবং বিশ্ববাসীর কাছে। এমনকি এত বড় ট্রাজেডির কথা ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ- দলিলপত্রেও’ বিবৃত হয়নি। এ এক অদ্ভুৎ ব্যাপার। বস্তুত ’৭১ সালে চুকনগর ছিল দুর্গম, সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার বাইরে এমন এক এলাকা যেখান থেকে, বিশেষ করে ’৭১ এর পরিস্থিতিতে, সংবাদ আদান প্রদান অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তদুপরি, ২০ মে’র শহীদদের মধ্যে ঘটনাস্থল আটলিয়া ইউনিয়নের ভিকটিম ছিল হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। ভিকটিমদের প্রায় শতভাগই ছিল দূরদূরান্তরের খুলনা, বাগেরহাট এবং বরিশালের বিভিন্ন অজ পাড়াগাঁর অতি সরল সাদাসিধা মানুষ। তারা সাংবাদিক চেনেনা, দেন দরবার জানেনা। তারা যে শুধু চুকনগরেই আক্রান্ত হয়েছে তা নয়, প্রথমে নিজ গ্রামে আক্রান্ত হয়ে আশ্রয় নেয় অপেক্ষাকৃত ভিতরের ভিন গ্রামে, সেখানেও আক্রান্ত হয়ে দল কি দল ভারতের পথে আশ্রয় নেয় চুকনগরে। সেখানে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া মানূষ আবারও আক্রান্ত হয় কলারোয়া, ঝাউডাঙ্গায়। স্বাধীনতার পর হতাবশিষ্ঠ যারা ছিল তারা যে যার গ্রামে ফিরে আসে। তারা ছিল বিচ্ছিন্ন, হতাশ। ফলে নিজেরা যেমন উদ্যোগী হয়নি, তেমনি তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য এগিয়ে আসেনি কেউ। চুকনগর ট্রাজেডি এভাবেই লোকচক্ষুর অন্তরালেই থেকে যায়। অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ পড়তে গিয়ে চুকনগর গণহত্যার বিবরণ না পেয়ে হতবাক হন।

এরই প্রেক্ষিতে গড়ে ওঠে ‘চুকনগর গণহত্যা স্মৃতি রক্ষা কমিটি’। ধীরে ধীরে লাইমলাইটে আসতে থাকে চুকনগরের গণহত্যার ব্যাপকতার বিষয়টি এবং ২০০৬ সালে সরকারী উদ্যোগে পাতাখোলা বিলের দক্ষিন প্রান্তে শহীদদের স্মরণে গড়ে ওঠে শহীদ স্মৃতিসৌধ।

চুকনগর ট্রাজেডি ছিল পাকিস্তানীদের বিবেকবর্জিত অজস্র হত্যাযজ্ঞের অন্যতম। কিন্তু পাকিস্তানী জেনারেলদের বইতে এর উল্লেখ নেই। আসলে পাকিস্তানীরা ’৭১ সালে তাদের হাতে গোটা বাংলাদেশ জুড়ে ৩০ লক্ষ মানুষের হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য অপরাধকে আদৌ স্বীকার করতে চায় না। তথাপি কোন কোন সামরিক কর্মকর্তার লেখায় এ ধরণের দু’ একটি ঘটনা কথা অকষ্মাৎ এসে গেছে। এমনই এক ঘটনার কথা লিখেছেন ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেণ্ডার’ বইতে যার কথা আগেই বলা হয়েছে। কেরানিগঞ্জের এই অপারেশন চালানো হয়েছিল যথাযথ গোয়েন্দা অনুসন্ধান ছাড়াই, এখানে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ নিহত হয়। তথাপি এ অপরাধে জন্য পাকিস্তানীরা কাউকে বিচারের সম্মুখীন করেনি। কেননা তারা আগেই ফিল্ড অফিসারদের ব্রীফ করেছিল: গো অ্যাহেড, তোমাদের কাজের জন্য কোন প্রশ্ন করা হবেনা। চুকনগর বহু দূরের নিভৃত এক গঞ্জ, সেখানকার ২০ মে’র ঘটনাও একই ফরমুর্লায় বিচার এড়িয়ে গেছে। তারা অনুসন্ধান করে দেখেনি সেখানে প্রকৃতই বিদ্রেহীরা ছিল কিনা অথবা বিদ্রোহ প্রস্তুতির কোন ব্যাপার ছিল কিনা। কি তথ্যের ভিত্তিতে তারা পরিকল্পিত ভাবে নিরীহ সাদাসিধা পুরুষদের ইতস্তত ভাবে অথবা লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করেছিল তা আজো অজানাই রয়ে গেছে। ড. মুনতাসির মামুনের বই ‘চুকনগর গণহত্যা ৭১’ এ বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে এসেছে: মেয়েরা স্বামী সন্তান হারিয়ে আর্মিদের বলেছিল, ‘আমাদের বাঁচায়ে রাখছ ক্যান্, আমাদেরও মারো, মাইরা ফ্যালাও।’ আর্মিরা তাদের মারেনি, বলেছিল- ‘নেহি, তোমলোগ ঘর যাও, আউর কোই সাচ্চা মুসলমানকো সাদি করো।’ রেস বদলে দেয়ার ধারণা সাধারণ সৈন্যদের পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ’৭১ এ ব্যাপক নারী ধর্ষণের লক্ষও ছিল তাই। তারপরেও ’৭১ এ গণহত্যা হয়নি, এমন সাফাই গাওয়ার মত লোক আছে এদেশে!

সৌজন্যেঃ https://eibela.com/article/%E0%A7%A7%E0%A7%A6,%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A7%A6-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF-%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A7%9F-%E0%A6%9A%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%97%E0%A6%B0%E0%A7%87 https://eibela.com/article/%E0%A7%A7%E0%A7%A6,%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A7%A6-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF-%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A7%9F-%E0%A6%9A%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%97%E0%A6%B0%E0%A7%87https://eibela.com/article/%E0%A7%A7%E0%A7%A6,%E0%A7%A6%E0%A7%A6%E0%A7%A6-%E0%A6%AC%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF-%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A7%87-%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE-%E0%A6%95%E0%A6%B0%E0%A6%BE-%E0%A6%B9%E0%A7%9F-%E0%A6%9A%E0%A7%81%E0%A6%95%E0%A6%A8%E0%A6%97%E0%A6%B0%E0%A7%87